স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক বাছাই কমিটি চাইলেন অংশীজনরা

আইপিনিউজ বিডি, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ঢাকাঃ স্বাধীন, কার্যকর ও নিরপেক্ষ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনে কমিশনের বাছাই কমিটিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্বাধীন করার দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।
প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর খসড়া নিয়ে ২৪ আগস্ট সোমবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ দাবি উঠে আসে। বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এ সভার আয়োজন করে।
সভায় প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন দিক, বিশেষ করে কমিশনের স্বাধীনতা, কার্যকারিতা, জবাবদিহিতা, গঠন ও বাছাই কমিটি, আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, তদন্ত, নিষ্পত্তি এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় এর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়। সভায় খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬-এর ওপর ব্লাস্টের পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয় এবং প্রস্তাবিত আইনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংযোজনের বিষয়ে মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ করা হয়।
প্রস্তাবিত খসড়ায় কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন আনা হলেও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগ রয়ে গেছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ বা নির্দেশের অজুহাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় এড়ানোর সুযোগ রোধে গুরুত্বপূর্ণ বিধানটি বাদ দেওয়া হয়েছে। শৃঙ্খলা বাহিনী বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কিছু ইতিবাচক সংশোধন আনা হলেও প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এবং ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। পরিদর্শনের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদনের নতুন শর্ত কমিশনের স্বাধীন তদন্ত ও পরিদর্শন ক্ষমতার সঙ্গে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে।
একইসঙ্গে, কমিশনকে নিজস্ব প্রবিধান ও চাকরির শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হলেও সাংগঠনিক কাঠামো এবং প্রেষণে নিয়োগে সরকারের নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে সীমিত করতে পারে। এছাড়া NPM-এর মর্যাদা ‘Division’ থেকে ‘Unit’-এ নামানো, সামরিক আটককেন্দ্রকে পরিদর্শনযোগ্য স্থানের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং পৃথক ও সুরক্ষিত বাজেটের পরিবর্তে সাধারণ বরাদ্দের ওপর নির্ভরশীলতা NPM-এর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা দুর্বল করতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমান বাছাই কমিটির আট সদস্যের মধ্যে ছয়জনই সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত। এ ধরনের কাঠামোর মাধ্যমে একটি স্বাধীন মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
মানবাধিকারকর্মী ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য নূর খান লিটন বলেন, তদন্তের আগে যদি সরকারের অনুমতির প্রয়োজন হয়, তাহলে সেই তদন্ত কতটা স্বাধীন থাকবে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। গুম, খুনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় কমিশনকে কোনো ধরনের সরকারি অনুমতির ওপর নির্ভরশীল না রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও তিনি তুলে ধরেন।
সপ্রানের গবেষণা পরিচালক মো. জারিফ রহমান বলেন, আমরা যদি আমাদের প্রেক্ষাপটে ফিরে যাই, আমরা দেখতে পাই, গত ১৫ বছরে রাষ্ট্র ও নাগরিকের যে দূরত্ব, তা একটি প্রধান অস্ত্র। যার ফলে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দ্বারা এসব গুম, খুন সংঘটিত হয়েছে। আমরা যদি ১৯তম ধারার ১ উপধারায় দেখতে পাই, যেন কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে না। আগের আমাদের যে ক্ষত, তা যেন এই ধারা বয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতিবেদন দাখিলের কোনো সময়সীমা বেঁধে দেওয়া নেই, এমনকি প্রতিবেদনের পরবর্তী কার্যক্রমের জন্যও কোনো সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি। যে বাহিনীর কাছ থেকে আমরা রিপোর্ট চাচ্ছি, তার নিজের কোনো সংস্কার আমরা করিনি। এখন থেকে আমরা কীভাবে সূক্ষ্ম ও সুষ্ঠু তদন্ত প্রতিবেদন পেতে পারি?”—এ প্রশ্ন রেখে যান বক্তা।
মুক্ত আলোচনায় অপর এক বক্তা বলেন, “এই কমিশনে যেন কোনো কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট না আসে। আইনটি যেন একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণামূলক আইন।” আরেক বক্তা বলেন, “ঢাকার বাইরে থেকে আসা বিচারপ্রার্থীদের জন্য যাওয়া-আসা এবং থাকার ব্যবস্থা থাকলে সুবিধা হতো। সেক্ষেত্রে তহবিল সাহায্য করবে বলে তিনি মনে করে
ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (YPSA) এর ইনক্লুশন অ্যাডভাইজার ভাষ্কর ভট্টাচার্য বলেন, মানবাধিকারের কোনো নির্দেশনা যদি না মানা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?এই খসড়াটি হচ্ছে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর অতিনির্ভরতার একটি প্রতিচ্ছবি।
বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা বলেন, ২০২৪ সালের পরও আইনে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ শব্দের ব্যবহার কতটা যুক্তিসংগত, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০০৯ সালের আইনে বলা হয়েছে, কমপক্ষে একজন নারী ও একজন আদিবাসী ব্যক্তি থাকবেন। কিন্তু ২০২৬ সালে এটিকে আবার অনেকগুলো মানদণ্ড পূরণের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে, যা যুক্তিসংগত নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি কমিশনের বাছাই ও সদস্য মনোনয়নে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার দাবি জানান।
লেখক ও গবেষক অনুপম দেবাশীষ রায় বলেন, পাঁচ সদস্যের মধ্যে তিনজন উপস্থিত থাকলেই কোরাম পূর্ণ হওয়ার বিধান থাকলে নারী ও আদিবাসী সদস্য অনুপস্থিত থাকলেও কমিশনের কার্যক্রম চলতে পারে। এতে প্রতিনিধিত্বশীলতার উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হবে, সে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আইনজীবী ও ব্লাস্টের প্যানেল আইনজীবী ড. কাজী জাহেদ ইকবাল বলেন, কোনো মামলা আদালতে পাঠানোর পর কমিশনের প্রতিবেদনের অবস্থান কী হবে, তা খসড়া আইনে আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অন্যথায় এ নিয়ে ভবিষ্যতে আইনি বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী খান খালিদ আদনান বলেন, বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির সঙ্গে যুক্ত হলেও প্রস্তাবিত বাছাই কমিটিতে আন্তর্জাতিক আইন সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি না থাকা হতাশাজনক।
গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী নওশীন নূর বলেন, বাছাই কমিটি কীভাবে গঠিত হচ্ছে, তা থেকেই কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে। তিনি কমিশনকে ‘a watchdog without a tooth’ হওয়ার ঝুঁকি থেকে রক্ষা করার ওপর গুরুত্ব দেন।
লেখক ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান বলেন, যে রাষ্ট্রে প্রতিটি মানুষের অধিকার থাকবে না, সে রাষ্ট্রে কোনো কমিশনই নিজের কাজ রাষ্ট্রের জন্য করতে পারবে না। অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে ২৬৬ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়, যার মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি মামলার কোনো সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি নেই। আমরা কি এগুলো নিয়ে মানবাধিকার কমিশনে যেতে পারব?”
সভায় অংশ নেওয়া বক্তারা কমিশনে স্বার্থের সংঘাত এড়ানো, অভিযোগকারীদের জন্য সহজলভ্য ব্যবস্থা তৈরি, ঢাকার বাইরে থেকে আসা বিচারপ্রার্থীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা এবং কমিশনের তদন্ত ও সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণেরও দাবি জানান।
সমাপনী বক্তব্যে ব্লাস্টের অনারারি নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, “আমরা সুচিন্তিত এবং একটি নিরপেক্ষ মানবাধিকার কমিশন চাই।” তিনি বলেন, “২০০৯ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত আমরা যা দেখে এসেছি, তার ওপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী আইন আমরা চাই। আয়নাঘর দেখার পরও কী করে আইনে বলা থাকতে পারে যে, সামরিক বাহিনীর কোনো সেল সম্পর্কে আমরা জানতে পারব না?”—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি। তিনি আরও বলেন, “আমাদের সকলের অধিকার এখানে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বাংলাদেশে বসবাসরত সকলে এর সুফল পান। আমরা ড্রাফট আইনে স্বাগত জানাতে পারি, কিন্তু আমরা এর মধ্যে নির্দিষ্ট পরিবর্তন চাই, যার মাধ্যমে আমরা একটি স্বচ্ছ আইন ও স্বচ্ছ বিচার পেতে পারি।” সমাপনী বক্তব্যে আরও বলা হয়, “আমরা বুঝতে পারছি, কাজগুলো সহজ হবে না। তাই মানবাধিকার কমিশন-সংক্রান্ত সকল আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে একত্রিত হয়ে একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হবে আমাদের। এত কষ্টের পর যদি আমরা ২০০৯ সালের একটি আইনই ফিরে পাই, তাহলে তো আমরা আর এগোতে পারছি না। আমরা ২০০৯ থেকে দুই ধাপ নয়, অনেক বেশি এগোতে চাই।
মতবিনিময় সভাটি সঞ্চালনা করেন ব্লাস্টের উপদেষ্টা আহমাদ ইব্রাহীম।


