জাতীয়

আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এবং অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলামের বক্তব্যের প্রতিবাদ ছাত্র ইউনিয়নের

আইপিনিউজ বিডি, ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকাঃ পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সাবেক চিফ প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ তাজুল ইসলামের এমন বক্তব্য এবং ‘আমরা সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী, কেউ আদিবাসী নয়’, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের এমন মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তামজীদ হায়দার চঞ্চল এবং সাধারণ সম্পাদক শিমুল কুম্ভকার, গতকাল ১৫ আগস্ট ২০২৬, শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে বলেন, রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল ব্যক্তি ও সাবেক রাষ্ট্রীয় কৌঁসুলির এমন বক্তব্য শুধু ইতিহাস ও নৃতাত্ত্বিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে না, বরং দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার সাংবিধানিক অধিকার, স্বতন্ত্র পরিচয় ও মর্যাদা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করে। কোনো জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক পরিচয় ও অস্তিত্বকে অস্বীকার করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বা ভূখণ্ডের অখণ্ডতার প্রশ্ন তোলা একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক প্রবণতা।

নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘আদিবাসী’ শব্দটি কোনো ভূখণ্ডের ওপর রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের বিকল্প কোনো ধারণা নয়। কোনো জনগোষ্ঠীর জাতিগত বা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের স্বীকৃতি মানেই রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের ওপর রাষ্ট্রীয় অধিকার বিলুপ্ত হওয়া,এমন ধারণার কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দেশের বিভিন্ন জাতিসত্তার ন্যায্য অধিকার ও স্বাতন্ত্র্য স্বীকার দুটি বিষয় পরস্পরবিরোধী নয়। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে, ‘আমরা সবাই বাংলাদেশি’ এই রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতিগত, ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ও স্বীকৃত ও মর্যাদাপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। নাগরিকত্বের অভিন্ন পরিচয় কোনো জনগোষ্ঠীর ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয় মুছে দেওয়ার যুক্তি হতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ভূমি ও জীবনযাপনের স্বাতন্ত্র্যকে সম্মান করা একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ‘আদিবাসী’ পরিচয়কে ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে উপস্থাপন করে মানুষের ন্যায্য পরিচয় ও অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা একটি ন্যক্কারজনক ঘটনা এবং অপরাধ। পাশাপাশি যে ‘স্টুডেন্ট ফর সভরেন্টি’-এর সন্ত্রাসীদের নেতৃত্বে আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে ৫ আগস্টের পর মতিঝিলে হামলা চালিয়েছে, তাদের সাথে নিয়ে একসাথে কর্মসূচি করার মাধ্যমে সেই সন্ত্রাসী হামলাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষণ করা। সার্বভৌমত্বের কথা বলে কোনো জনগোষ্ঠীর ন্যায়সংগত আন্দোলনে হামলা করা কিংবা সেই হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা কখনই গণতান্ত্রিক রাজনীতির অংশ হতে পারে না।

নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংকটের সঙ্গে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর নানা ধরনের নিপীড়ন চালানো হচ্ছে রাষ্ট্রীয় মদদেই। সেনাশাসন, ভূমি দখল ও ভূমি থেকে উচ্ছেদ, বসতিতে হামলা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা বিভিন্ন সময়ে এসব নিপীড়ন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর চলে আসছে। এর পাশাপাশি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও স্বতন্ত্র জাতিগত পরিচয়কে অবমূল্যায়ন এবং রাষ্ট্রীয় নীতিতে তাদের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকাও সংকটকে আরও গভীর করেছে। সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে সাধারণ মানুষ সহিংসতার শিকার হয়েছেন এবং বহু পরিবারকে নিজেদের বসতভিটা ও জীবিকা হারানোর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এসব ঘটনা শুধু অতীতের বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান বাস্তবতাকে বোঝা যাবে না; বরং ভূমি, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নে দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস ও বঞ্চনার ধারাবাহিকতার মধ্যেই এগুলোকে দেখতে হবে। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন মনে করে, পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার রাজনৈতিক সদিচ্ছা প্রয়োজন।

নেতৃবৃন্দ বলেন, অবিলম্বে আদিবাসীদের নিয়ে যেই ন্যক্কারজনক বক্তব্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম দিয়েছেন তা প্রত্যাহার করে আদিবাসীদের সাংবিধানিক অধিকারসহ সকল নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে পাশাপাশি পাহাড়ের সেনাপ্রত্যাহার এবং আদিবাসীদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

Back to top button