পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস্ এর প্রতিনিধি দলের ভূমি সমস্যায় জর্জরিত রাখাইনদের পাড়া পরিদর্শন:

আইপিনিউজ বিডি, ১৪ জুন, ঢাকাঃ সিটিজেনস্ ফর হিউম্যান রাইটস নামের প্লাটফর্মের প্রতিনিধিরা গত ১২-১৪ জুন পর্যন্ত এক পর্যবেক্ষণে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা উপজেলায় ভূমি সমস্যায় জর্জরিত রাখাইনদের পাড়া পরিদর্শন করেন। উক্ত প্রতিনিধি দলের সদস্যরা হচ্ছেন নাগরিক উদ্যোগ এর প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ, রান এর নির্বাহী পরিচালক রফিকুল আলম, গবেষক ড. ঈশিতা দস্তিদার, মানবিকার কর্মী দীপায়ন খীসা, ল্যান্ড ইজ লাইফ (Land is Life) এর এশিয়া প্রোগ্রাম ডিরেক্টর সতেজ চাকমা প্রমুখ।

শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন:
ঢাকা থেকে পরিদর্শনে যাওয়া উক্ত প্রতিনিধি দলটি গত ১২ জুন বিকাল ৫টার সময় কুয়াকাটার শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারে স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দ ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সাথে মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহার পরিচালনা কমিটির সভাপতি উ চো রাখাইন, বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এর সভাপতি মং চৌ থিন তালুকদার ও শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারের বিহার অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু ও কারিতাস বাংলাদেশ এর প্রতিনিধি মং ম্য রাখাইন।
উক্ত মতবিনিময় সভায় ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু বিখ্যাত শ্রীমঙ্গল বিহারের ভূমির দুর্দশার কথা জানিয়ে প্রতিনিধি দলকে বলেন, ১৯৪৩ সালে ব্রিটিশ আমলে ২ একর ৪৪ শতাংশ জায়গায় শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধ বিহারটি প্রতিষ্ঠা হয়। ১৯৬২ বেরিবাঁধ নির্মাণের সময় বিহারের অনেক জায়গা নেয়া হয়। এরপর থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) আমাদের বিহারের জমি নেয়ার জন্য পায়তারা করছে। বর্তমানে বিহারের দখলে জমি রয়েছে মাত্র ৬৫ শতাংশ। আমাদের নিজস্ব ভূমি সংরক্ষণ করা না হলে বিহারের ঐতিহ্য হুমকির মধ্যে পড়বে।
ইন্দ্রবংশ ভিক্ষু আরো বলেন, পটুয়াখালী জেলায় একমাত্র এ বিহারটি সীমা বিহার। এই বিহারেই রয়েছে একমাত্র সীমাঘর। যে সীমাঘরটি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জীবনাচরণ এবং উপসম্পাদা গ্রহনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পাউবো যদি আমাদের বিহারের জায়গাটি নিয়ে নেয় তবে এই সীমাঘরটিও আর থাকবে না। ফলে এটা আমাদের ধর্মীয় জীবন যাপনের জন্যও বিরাট ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
মিশ্রিপাড়া বৌদ্ধ বিহার পরিদর্শন:
মিশ্রিপাড়ার প্রাচীন বৌদ্ধ বিহারটির জায়গা অনেক প্রভাবশালী বাঙালি দখলের চেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিহারের অধ্যক্ষ উত্তমা মহাথেরো জানান, এই বিহারের জায়গার পরিমাণ ২ একরের বেশি হলেও অনেক জায়গা এখনো রেকর্ডভূক্ত হয়নি।
রাখাইন বুদ্ধিস্ট ওয়েলফেয়ার এসোশিয়েশন পটুয়াখালী জেলার সাধারণ সম্পাদক মং হ্লা সেইন রাখাইন বলেন, এখানে রেজিস্টার অফিসের কিছু অসৎ কর্মচারীর মাধ্যমে বাঙালিরা আমাদের জমি দখল করে নিয়েছে। যেখানে আদিবাসীরা ২ একর জমি বিক্রি করে সেখানে তারা ৫ একর জমি নিয়ে নেয়। আর আদালতের রায় থাকা সত্ত্বেও আমরা অনেক জমি উদ্ধার করতে পারছি না ।
নয়াপাড়া শশ্মানের বেদখল হওয়া জায়গা পরিদর্শন:
কুয়াকাটা উপজেলায় নয়াপাড়া গ্রামের রাখাইন আদিবাসীদের শশ্মানভূমির জায়গা বেদখল করে গাছ লাগিয়েছেন বাবুল আখতার নামের এক বাঙালি পরিবার। ঐ পরিবারের পাঁচ ভাই তাদের বাবা ইমদাদ হোসেন এর জায়গায় রয়েছেন এবং সে জায়গাটি ৪০-৫০ বছর আগে তাদের দাদা আব্দুল হামিদ মিয়া রাখাইনদের কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন বলে জানান বাবুল। কিন্তু রাখাইন শশ্মানের গাছ লাগানো জায়গাটি তাদের পরিবারের কিনা নিশিচত নয় বলে জানান তিনি।

প্রতিনিধি দলের উপস্থিতিতে দখলদার বাবুল আখতার ও জমির মালিক রাখাইনরা নিজেরা মিলে জায়গাটি মেপে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান।
পায়রা বন্দর কর্তৃক উচ্ছেদকৃত ৬ পরিবারের পুনর্বাসন জায়গা পরিদর্শন:
২০২১ সালে পায়রা বন্দর কর্তৃক উচ্ছেদকৃত ছ-আনি পাড়া গ্রামের ছয়টি রাখাইন পরিবারকে এখনও পুনর্বাসন করা হয়নি। এখন তারা বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসবাস করছেন। উচ্ছেদ হওয়া পরিবারের প্রতিনিধি চিং দামো রাখাইন বলেন, প্রাথমিক উচ্ছেদ নোটিশ পাওয়ার পর আমরা আপত্তি জানিয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের কথা শোনা হয়নি। গ্রামের পুকুর, গাছ ও ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ৯৬ লক্ষ টাকা ৬ পরিবারকে দেয়া হয়। তখন বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে এক সভায় বলেছিলেন স্থায়ী পুনর্বাসনের আগ পর্যন্ত মাসিক ৫০০০ টাকা হারে প্রত্যেক পরিবারকে বাড়ি ভাড়া সহায়তা দেয়া হবে। কিন্তু ছয় মাস দেয়ার পর আর দেয়া হয়নি। এখনো ঘর তুলে জায়গা দলিল করে বুঝিয়ে দেয়া হয়নি।
২০২৫ সালের ৮ অক্টোবর পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রকল্প পরিচালক ক্যাপ্টেন মুহাম্মদ নাজমুল হক স্বাক্ষরিত এক চিঠি মূলে জানা যায়, উচ্ছেদ হওয়া ঐ ছয়টি পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য কলাপাড়ার সোনাপাড়া মৌজার মৃত চক্রাও রাখাইন পরিবারের থেকে ৪০ শতাংশ জমি কেনা হবে।
৬ পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য কেনা জায়গাটিতে গিয়ে প্রতিনিধিদল দেখতে পান জায়গাটি ডিমার্কেশন করা হলেও মাটি ভরাট ও ঘর বানানো বাকী আছে। পরিদর্শনকালে প্রতিনিধিদল জানতে পারেন চলতি জুন মাসে পুর্নবাসন প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে, কিন্তু এরপর উচ্ছেদকৃত রাখাইনদের কি হবে তা কেউ স্পষ্ট ভাবে বলতে পারেননি।
পরে স্থানীয় আদিবাসী নেতৃবৃন্দকে সাথে নিয়ে প্রতিনিধিদল কুয়াকাটা পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর সাথে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন।
প্রতিনিধ দল পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা ও সমাধানের প্রস্তাব প্রশাসকের কাছে উত্থাপন করেন। পাশাপাশি বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের আদিবাসী ফোরাম সভাপতি মং চৌথিন তালুকদার ৫ দফা দাবি তুলে ধরেন। সেগুলো নিম্নরূপ:
১। কলাপাড়ায় রাখাইনদের জন্য শশ্মানের জায়গা বরাদ্দ দেওয়া।
২। রাখাইন কালচারাল একাডেমি দ্রুত সংস্কার ও চালু করা। রাখাইন মাতৃভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষায় পদক্ষেপ গ্রহন করা।
৩। রাখাইনদের বেদখল হওয়া ভূমি, শশ্মান পুনরুদ্ধার ও হয়রানিমূলক মামলা নিষ্পত্তি করা।
৪। রাখাইন তাতের বিকাশে প্রশিক্ষণ, বিনিয়োগ ও বাজারজাতকরণে সহযোগিতা করা।
৫। পায়রা বন্দরের কারণে ছ-আনি পাড়া থেকে উদ্বাস্তু ৬ পরিবারের পুনর্বাসনের জন্য দ্রুত আনুষ্ঠানিক চুক্তির মাধ্যমে ঘর তৈরি ও নতুন ভূমির মালিকানা হস্তান্তর করা।
প্রতিনিধিবৃন্দের সাথে আলোচনার পর কলাপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইয়াসিন সাদিক উত্থাপিত দাবির সাথে একমত পোষণ করে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান।

তিনি আরো উয়ানা, রাখাইনদের ভূমি রক্ষায় প্রশাসন আন্তরিক। দেখা গেছে জাল দলিলের মাধ্যমে তাদের ভূমিগুলো দখলের চেষ্টা করা হয়। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী এ কাজে যুক্ত থাকেন। কালচারাল একাডেমি দ্রুত চালু করা৷ রাখাইন তাত সহায়তা ও পর্যটকদের জন্য একটি রাখাইন রেস্তোরাঁ চালুর কথাও জানান তিনি।
প্রতিনিধি দলটি আজ ১৪ জুন ছ-আনি পাড়ার উদ্বাস্তু রাখাইন আদিবাসীদের পুনর্বাসনের জন্য পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের সাথেও দেখা করেছেন।


