UNPFII-এর ২৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম এর সভাপতি টনি চিরান স্থায়ী ফোরামের ছয়টি নির্ধারিত ক্ষেত্রের ওপর ভাষণ দিয়েছেন।

আইপিনিউজ, ২৭ এপ্রিল ২০২৬, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম (BIYF) -এর সভাপতি টনি চিরান ২৪ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে (নিউইয়র্ক সময় দুপুর প্রায় ১২:৪৫ মিনিটে) জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরাম (UNPFII) -এর ২৫তম অধিবেশনে এজেন্ডা আইটেম ৪-এর উপর বক্তব্য প্রদান করেন। উক্ত এজেন্ডা ছিল: “স্থায়ী ফোরামের ছয়টি নির্ধারিত ক্ষেত্র (অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, সংস্কৃতি, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবাধিকার) নিয়ে আলোচনা, যা জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র (UNDRIP) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০-এর প্রেক্ষাপটে বিবেচিত।”
UNPFII -এর ২৫তম অধিবেশন ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে শুরু হয়েছে এবং এটি ১ মে ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
এছাড়াও, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (PCJSS) -এর তিনজন প্রতিনিধি চঞ্চনা চাকমা, অগাস্টিনা চাকমা এবং প্রীতি বিন্দু চাকমা এই অধিবেশনে অংশগ্রহণ করছেন। একইসাথে এশিয়া ইন্ডিজেনাস পিপলস প্যাক্ট (AIPP) -এর মহাসচিব পল্লব চাকমা এবং আদিবাসী অধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্রক্রিয়া (EMRIP) -এর ড. বিনোতাময় ধামাই বাংলাদেশের আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব করে অংশ নিচ্ছেন।
তার বক্তব্যে টনি চিরান বলেন, “আমরা স্থায়ী ফোরামের পক্ষ থেকে উপনিবেশবাদ ও সশস্ত্র সংঘাতের প্রভাব নিয়ে আদিবাসী জনগণের অধিকার সম্পর্কিত সময়োপযোগী ও বিস্তৃত গবেষণাকে সাধুবাদ জানাই। এই কাজ জবাবদিহিতা ও ন্যায়বিচারের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশের নবনির্বাচিত সরকারের পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসী নারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই, বিশেষ করে সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনের বিষয়টি। এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনব্যবস্থার দিকে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং আদিবাসী জনগণের সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শের মাধ্যমে এটিকে স্থায়ীভাবে নিশ্চিত করা উচিত। তবে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের উভয় অঞ্চলে আদিবাসীরা এখনও ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য, ভূমি বঞ্চনা, সহিংসতা, হয়রানি, হত্যা, ধর্ষণ, প্রান্তিকীকরণ এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন, যেখানে ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।”
মাননীয়া চেয়ার, সমতল অঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসীদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ ধারাবাহিকভাবে ভূমি দখল, সহিংসতা, জোরপূর্বক উচ্ছেদ, এবং তাদের পরিচয় ও প্রথাগত ভূমির অধিকার আইনি স্বীকৃতির অভাব ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন। কিন্তু তাদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রয়োগ, পৃথক বিভাগ বা মন্ত্রণালয় কিছুই যথাযথভাবে বিদ্যমান নেই; আছে মাত্র কয়েকটি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, যেগুলোর সক্ষমতাও অত্যন্ত সীমিত।
অন্যদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান সামরিকীকরণ এবং ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়ন নিরাপত্তাহীনতা ও অবিশ্বাসকে আরও জোরদার করছে। এসব চ্যালেঞ্জ স্থায়ী ফোরামের নির্ধারিত ছয়টি ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলছে। ভূমির অধিকার ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন অসম্ভব। জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক পরিচয়কে ক্ষয় করে এবং আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত অভিভাবকত্ব উপেক্ষিত হলে পরিবেশগত অবক্ষয় বেড়ে যায়। একইসঙ্গে, সংস্কৃতিসংবেদনশীল শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় প্রবেশাধিকারে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে। আদিবাসীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন অব্যাহত রয়েছে, যা প্রায়ই কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আসে না।
এই বাস্তবতাগুলো জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র (UNDRIP) -এর মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী, বিশেষ করে আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, পূর্বানুমতি ও অবগত সম্মতি ( Free, Prior and Informed Consent), এবং ভূমি ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণের অধিকার। একইসঙ্গে, এটি ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন এজেন্ডার “কাউকে পিছিয়ে না রাখা” অঙ্গীকারকেও ক্ষুণ্ন করছে।
অতএব, আমরা বাংলাদেশ সরকার ও UNPFII- এর প্রতি নিম্নলিখিত সুপারিশ ও জোর দাবি জানাচ্ছি—
১. সমতলের আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমির অধিকার সুরক্ষা ও তাদের উন্নয়নের জন্য একটি পৃথক ভূমি কমিশন এবং একটি স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা; পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (১৯৯৭)-এর পূর্ণাঙ্গ ও সময়বদ্ধ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা, বিশেষ করে কার্যকর ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
২. পার্বত্য চট্টগ্রামের সামরিকীকরণ হ্রাসের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা এবং সমতল ও পার্বত্য উভয় অঞ্চলে আদিবাসীদের পৈতৃক ভূমিতে তথাকথিত উন্নয়নের নামে আগ্রাসন বন্ধ করা।
৩. ভূমি দখল প্রতিরোধে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন ও ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করা, এবং বিশেষ করে আদিবাসী যুব, নারী ও কিশোরীদের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
৪. সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের—বিশেষ করে নারী ও যুবদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।
৫. সংস্কৃতিসংবেদনশীল, সহজপ্রাপ্য এবং বৈষম্যহীন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা।
৬. টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জন এবং জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক ঘোষণাপত্র (UNDRIP) বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার, জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ এবং আদিবাসী সংগঠনগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও সহযোগিতা জোরদার করা।
