বান্দরবনে পাথর উত্তোলন কবে বন্ধ হবে ?

বিশেষ প্রতিবেদন: পরিবেশ ও জলবায়ু পৃথিবীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পৃথিবী ও মানুষের অস্তিত্বের জন্যও উক্ত উপাদানসমূহ সমান গুরুত্ব বহন করে। কিন্তু পৃথিবীর নানা দেশে, নানা অঞ্চলে মানুষ পরিবেশকে নির্বিচারে ধ্বংস করে চলেছে। তাছাড়া মুনাফালোভী বাজার ব্যবস্থায় উৎপাদনে প্রতিযোগিতা ও পরিবেশ ধ্বংসের কারণে আজ ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ সারা বিশ্বব্যাপী অন্যতম একটি জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের দিকে দিকে এখন পরিবেশ ও জলবায়ু সুরক্ষার জন্য সচেতনতা বাড়ছে ও কর্মকৌশল বাস্তবায়িত হচ্ছে।
এমনিতর এক বাস্তবতায় পার্বত্য বান্দরবান জেলার লামা, আলিকদম, থানচি, রুমা ও রোয়াংছড়িসহ প্রায় সাতটি উপজেলার সাঙ্গু, মাতামুহুরী নদী ও নদীর পাশ্ববর্তী ঝর্ণা, ঝিরি, খাল, ছড়া থেকে নির্বিচারে পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। খনিজ ও বন আইন এবং হাইকোর্টের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী ঠিকাদার ব্যবসায়ীচক্র এ পাথর উত্তোলন কাজে উঠেপড়ে লেগেছে। যার ফলে, পাহাড়ী নদীগুলো যেমনি প্রবাহ হারাচ্ছে তেমনি ঝিরি ও ঝর্ণাগুলো শুকিয়ে গিয়ে ঐ অঞ্চলের স্থানীয় আদিবাসীদের একমাত্র খাবার পানির উৎসসমূহ ধ্বংস করা হচ্ছে। জানা গেছে, এসব অঞ্চলে পাথর উত্তোলনের ফলে প্রায় ৪০০ ঝিরি ও ঝর্ণা নষ্ট হয়ে গেছে। সেখানকার নদীগুলো আজ পানিশূন্য। শুকিয়ে যাওয়া এইসব ঝিরি ও ঝর্ণাই স্থানীয় আদিবাসীদের একমাত্র খাবার পানির উৎস। ঝিরি ও ঝর্ণা শুকিয়ে যাওয়ার ফলে সেখানকার জীববৈচিত্র ও স্থানীয় আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা হুমকীর সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুম ব্যতিত অন্যান্য মৌসুমে পানির অভাবে সেখানে হাহাকার অবস্থা সৃষ্টি হয়।
জানা যায়, বান্দরবানের এসব অঞ্চল থেকে পাথর উত্তোলন বন্ধের নির্দেশ চেয়ে কয়েকমাস আগে হাইকোর্টে রিট দায়ের করে স্থানীয় নাগরিক মং সৈপ্রু খাইয়ামসহ আইন, পরিবেশ ও আদিবাসী অধিকার সচেতন ৬টি সংগঠন- বাংলাদেশ এনভায়রনমেন্টাল ল’ইয়ারস এসোসিয়েশন (বেলা), বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, কাপেং ফাউন্ডেশন, নিজেরা করি, এ্যসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম এন্ড ডেভেলপমেন্ট (এএলআরডি)। এসব সংগঠনগুলো রিট দায়ের করলে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ মহামান্য হাইকোর্ট পাথর উত্তোলন বন্ধে একটি নির্দেশ দেয়। এক মাসের মধ্যে পরিবেশ মন্ত্রণালয় সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বান্দরবান জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ মামলার ১০ বিবাদীকে এ আদেশ বাস্তবায়ন করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। এই রিটের শুনানি নিয়ে আদালত রুলসহ অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেন। কিন্তু মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশনার পর প্রায় কয়েকমাস অতিবাহিত হলেও সে অঞ্চল থেকে কিছুতেই পাথর উত্তোলন বন্ধ না হয়ে বরং আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী অসাধু গোষ্ঠী নির্বিচারে পরিবেশ বিধ্বংসী এ কাজটি সুনিপুনভাবে করে চলেছে। সংবেদনশীল ও বিতর্কিত এই ইস্যুটিকে ধামাচাপা দেওয়ার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে লোকদেখানো কিছু অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে পরিবেশবিনাশী এ সমস্যা থেকে মুক্তি কখনই সম্ভব নয়। ক্ষমতাসীন প্রভাবশালী ঠিকাদার ব্যবসায়ী গোষ্ঠী স্থানীয় প্রশাসন, বনবিভাগ ও সরকারি দলের নেতাদের ম্যানেজ করে এই গর্হিত কাজগুলো করছে বলে অভিযোগ ও জনশ্রুতি রয়েছে। তাই ঐ এলাকার সাংসদ ও প্রশাসনের কঠোর অবস্থানই বান্দরবানের পাথর, নদী, ঝিরি, ঝর্ণা, ছড়া, মানুষ তথা হুমকীতে থাকা জীববৈচিত্রকে বাঁচাতে পারে !


