নারী দিবসে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির আহ্বান
আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুই অগ্রণী নারী সংগঠন হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি পাহাড়ের নারী সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছে। এই বিবৃতিটি আইপিনিউজ এর পাঠকদের জন্য প্রকাশ হলঃ
আজ ৮ মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জানাই সংগ্রামী শুভেচ্ছা ও বিপ্লবী অভিনন্দন। ‘নারীর প্রতি বৈষম্য, জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক নিপীড়নের বিরুদ্ধে নারীর সমঅধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং শ্রেণীহীন ও শোষণমুক্ত সমাজ নির্মাণের সংগ্রামে এই দিনটি প্রেরণার উৎস।
উল্লেখ্য, ১৮৫৭ সালে নিউইয়র্ক শহরে কাজের অমানবিক অবস্থা ও বৈষম্যমূলক মজুরীর প্রতিবাদে পোশাক কারখানার নারী শ্রমিকদের ডাকা ধর্মঘটের স্মরণে এই দিবসটিকে বেছে নেয়া হয়। ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ, মজুরি বৈষম্য, কর্মঘণ্টা ১২ ঘন্টা থেকে ৮ ঘন্টায় কমানো এবং কর্মক্ষেত্রে বৈরী পরিবেশের প্রতিবাদ করেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের সুতা কারখানার একদল শ্রমজীবী নারী। মালিকপক্ষ, তাদের উপর দমন-পীড়ন চালায়। গ্রেফতার হন অসংখ্য নারী শ্রমিক। ফলে আন্দোলন আরও জোরদার হয়। শ্রমজীবী নারীদের আন্দোলন পরবর্তীতে বিশ্বের দেশে দেশে অব্যাহতভাবে নারী সমাজের জাগরণ ও তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জাগায়। বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করে নারী সমাজ দাবি আদায়ের লক্ষ্য ক্রমেই জোটবদ্ধ হতে থাকে। বৈষম্যপীড়িত নারী শ্রমিকরাও তাদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের লক্ষ্যে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বিক্ষোভ আর প্রতিবাদের ঝড় তোলে। এই উত্তাল পরিস্থিতিতে ১৯১০ সালের আগস্ট মাসে ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনে সমাজতন্ত্রী নারীদের ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন’ অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে সমাজতন্ত্রী নেত্রী ক্লারা জেটকিন ৮ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ পালনের প্রস্তাব দেন। তার প্রস্তাব অনুযায়ী ৮ মার্চ নারী দিবস পালিত হতে থাকে। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। তখন থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে ৮ মার্চ ‘আন্তজার্তিক নারী দিবস’ হিসেবে পালিত হয়ে আসছে।

মানব সমাজের সামগ্রিক বিকাশে নারীদের ক্ষেত্রবিশেষে অধিক অবদান থাকলেও আমাদের দেশে নারী সমাজ জাতিগত, ভাষাগত, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। একবিংশ শতাব্দীতে পদার্পণ করেও সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। অথচ সংবিধানের ২৮ (১) অনুচ্ছেদে বলা আছে – কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ-নারী-পুরুষ ভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। সংবিধানের এই ধারাটি বাস্তবায়িত হলে সমাজে নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা নিশ্চিত করা যেত। কিন্তু উক্ত ধারা বাস্তবায়িত না হওয়ার কারণে পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে এখনও শোষণ, বঞ্চনা, অবহেলা, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হয়ে চলেছে। বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর নারীরা প্রতিনিয়ত মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং জাতিগত আগ্রাসন, সহিংসতা ও বৈষম্যের শিকার হতে বাধ্য হচ্ছে।
প্রতি বছরের ন্যায় জাতিসংঘ এবছরও আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে- “উরমরঃঅখখ: ওহহড়াধঃরড়হ ধহফ ঞবপযহড়ষড়মু ভড়ৎ এবহফবৎ ঊয়ঁধষরঃু” জাতিসংঘ মনে করে, ডিজিটাল সংক্রান্ত উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা নাগরিকদের মধ্যে নারী অধিকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বর্তমানে প্রযুক্তি ও ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা বৈষম্যমূলক হওয়ায় এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জনে নারী সমাজ ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। তাই অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈষম্যহীন প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থা নারী পুরুষের সমতাভিত্তিক একটি স্থিতিশীল ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘ ইহার সদস্যসভূক্ত দেশসমূহের প্রতি উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল শিক্ষা ব্যবস্থায় নারী পুরুষের সমতা ভিত্তিক নীতিমালা গ্রহণ এবং বাস্তবায়নে আহবান জানান। জাতিসংঘের এই প্রতিপাদ্য বিষয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম নারী সমাজের বিদ্যমান বাস্তবতার আলোকে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবসে প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে -“নারী পুরুষের সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠাকল্পে ডিজিটাল নীতি, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার ও দক্ষতা অপরিহার্য”।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্যমতে, ২০২২ সালে ১২ জন জুম্ম নারীর উপর শারীরিক ও যৌন সহিংসতা ঘটনা ঘটেছে। মানুষের জন্য ফাউডেশনের ২০১৯ সালের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ৪৫ শতাংশেরও বেশি নারী কর্মক্ষেত্রে বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বহু ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ৬১ শতাংশ জানিয়েছেন যে তারা বাজার এলাকায়, ৪৫ শতাংশ মাঠে, ৬ শতাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, ৩ শতাংশ কর্মস্থলে সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছেন। আবার ৩৩ শতাংশ নারী শরীরিক নির্যাতন, ৩৮ শতাংশ মানসিক নির্যাতন, ১৯ শতাংশ অর্থনৈতিক নিপীড়ন এবং ৫ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বস্তুত, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় এবং চুক্তির আলোকে আঞ্চলিক পরিষদ ও পার্বত্য জেলা পরিষদসমূহ কার্যকর না হওয়ায়, উল্টো চুক্তি বিরোধী ষড়যন্ত্র জোরদার হওয়ার কারণে চুক্তি স্বাক্ষরের পরেও বিশেষত সেটেলার বাঙালি ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা বহু জুম্ম নারী যৌন নিপীড়ন, নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার হয়েছে। গভীর উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এসব অপরাধের যথাযথ বিচার হয়নি এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা হয়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর চির অবহেলিত ও বঞ্চিত জুম্ম জনগণ আশা করেছিল পার্বত্য চুক্তির যথাযথ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের বিশেষ শাসনতান্ত্রিক অধিকার পুন:প্রতিষ্ঠিত হবে। ফ্যাসীবাদী নিপীড়ন-নির্যাতনের অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘ দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘাত বন্ধ হবে। জুম্ম জনগণ আর বিনা বিচারে নিপীড়ন-নির্যাতন, অবৈধ গ্রেফতার, জেল-জুলুম, খুন, হয়রানি, সহিংসতার শিকার হবে না। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের নাগরিকদের মতো জুম্ম জনগণও নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা পাবে। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় জুম্ম জনগণ তথা পার্বত্যবাসী এখনো লাভ করেনি সেই গণতান্ত্রিক শাসন ও নিরাপদ জীবন। বলা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতি আজ চরম সংকটজনক হয়ে উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের এহেন অনিশ্চিত ও নাজুক পরিস্থিতিতে জুম্ম নারীর সমঅধিকার ও সমমর্যাদা যেমনি প্রতিনিয়ত ভ‚লুন্ঠিত হয়ে চলেছে, তেমনি তাদের নিরাপত্তাহীন জীবন অতিবাহিত করতে বাধ্য হচ্ছে। সর্বোপরি জুম্ম নারীর জাতীয় অস্তিত্ব আজ চরম হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। জুম্ম নারীর নিরাপত্তা, সমঅধিকার ও সমমর্যাদা নিশ্চিতকল্পে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন অত্যন্ত জরুরি। বহু রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাক্ষরিত এই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দেশের বৃহত্তর স্বার্থে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সময়সূচি ভিত্তিক পরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করা অপরিহার্য। তাই দেশের গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল ব্যক্তি, সংগঠন ও রাজনৈতিক দলসমূহের চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে অধিকতর সামিল হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, প্রগতিশীল সমাজ গঠনে নারীর সৃজনশীল প্রতিভা ও সংগ্রামী ভূমিকা অবশ্যই অপরিহার্য । পুরুষের পাশাপাশি নারী জাতির সমঅধিকার ও সমমর্যাদা সুনিশ্চিত করতে না পারলে কোন দেশ বা জাতিকে সকল প্রকারের জাতিগত ও শ্রেণীগত অন্যায় শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত করা অসম্ভব। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম জাতির উপর জাতিগত নিপীড়ন ও সহিংসতা, জুম্ম নারীর মুক্তি ও নিরাপত্তা, সর্বোপরি সমঅধিকার ও সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠায় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে হিল উইমেন্স ফেডারেশন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির আহŸান- আসুন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে বৃহত্তর আন্দোলনে সামিল হই।


