পার্বত্য চট্টগ্রামে এইচএসসি ফলাফলের বিপর্যয়: শিক্ষক সংকট, শিক্ষার দুর্বল অবকাঠামো ও সরকারি উদাসীনতার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই
বেবিলন চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের এবারের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার ফলাফল অত্যন্ত হতাশাজনক। এ বছরের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পরীক্ষার পাসের হার মাত্র ৩১.৯৮%। মোট ৫,৩৫৯ জন পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলেও পাস করেছে মাত্র ১৭১৪ জন আর জিপিএ পেয়েছে মাত্র ১৫ জন। এই ফলাফল কেবল শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা কিংবা পরীক্ষার খাতায় ভালো নম্বর না পাওয়ার বিষয় নয়; বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সংকট, বৈষম্য ও অবহেলার একটি প্রতিফলন। বছরের পর বছর ধরে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা নানা সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শিক্ষা অর্জনের চেষ্টা করলেও তাদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়নি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো শিক্ষক সংকট। বিশেষ করে প্রত্যন্ত পাহাড়ী এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষকের অভাব এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা শিক্ষার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিজ্ঞান, গণিত ও ইংরেজির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাব শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতিকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। শুধু শিক্ষক সংকটই নয়, পর্যাপ্ত শিক্ষার সুযোগ ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবও এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে রাখছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষা উপকরণের সংকট, বিজ্ঞানাগার ও গ্রন্থাগারের অপ্রতুলতা এবং আবাসিক সুবিধার অভাব অনেক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনকে কঠিন করে তুলেছে। শহর ও প্রত্যন্ত পাহাড়ী এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার যে বৈষম্য রয়েছে, তা শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও প্রভাব ফেলছে।
এর পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষার সীমাবদ্ধতা একটি গুরুত্বপূর্ণ ও দীর্ঘদিনের সমস্যা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খিয়াং, খুমি, পাংখোয়া, চাক ও লুসাইসহ বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর শিশুদের নিজ নিজ মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার বাস্তবতা রয়েছে। কিন্তু শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে তাদের মাতৃভাষার যথাযথ ব্যবহার ও বিকাশের সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরে কয়েকটি ভাষায় মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার উদ্যোগ থাকলেও তা সব জনগোষ্ঠীর জন্য সমানভাবে কার্যকর ও পর্যাপ্ত নয়। অনেক ক্ষেত্রে মাতৃভাষায় পাঠ্যপুস্তক, প্রশিক্ষিত শিক্ষক এবং প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণের অভাব রয়েছে।
ফলে মাতৃভাষায় কথা বলা ও চিন্তা করতে অভ্যস্ত অনেক শিশুকে শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই সম্পূর্ণ ভিন্ন ভাষা তথা বাংলায় পড়াশোনা করতে হয়। বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার প্রধান মাধ্যম হলেও যেসব শিশুর মাতৃভাষা বাংলা নয়, তাদের জন্য শুরুতেই ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। অনেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের ভাষা বুঝতে, শিক্ষকের বক্তব্য অনুসরণ করতে এবং নিজের চিন্তা ও অনুভূতি প্রকাশ করতে সমস্যার মুখোমুখি হয়। প্রাথমিক স্তরে এই ভাষাগত দূরত্ব যথাযথভাবে দূর করা না গেলে তা পরবর্তী শ্রেণিগুলোতেও শেখার ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত এসে অনেক শিক্ষার্থীকে বিষয়বস্তুর পাশাপাশি ভাষাগত জটিলতার সঙ্গেও লড়াই করতে হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা খাতের এই সংকটের দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারেরও এড়ানোর সুযোগ নেই। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে যে ঘাটতি রয়ে গেছে, তা নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। একটি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বারবার পিছিয়ে পড়লেও যদি তার কাঠামোগত কারণগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তাহলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব নয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষার সুযোগের এই বৈষম্য পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে সংকুচিত করছে। উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে তারা আরও পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ শিক্ষা কোনো বিশেষ অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর জন্য সীমাবদ্ধ সুযোগ নয়; এটি প্রত্যেক নাগরিকের মৌলিক অধিকার। পাহাড়ের শিক্ষার্থীদেরও সমান মর্যাদা ও সুযোগ নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এ অবস্থায় পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটকে বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা পরিকল্পনা। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত শিক্ষক নিয়োগ, বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো উন্নয়ন, বিজ্ঞানাগার ও গ্রন্থাগার স্থাপন, শিক্ষার্থীদের আবাসন ও বৃত্তির সুযোগ বৃদ্ধি এবং নিয়মিত শিক্ষার মান মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এবারের এইচএসসি ফলাফল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য একটি সতর্কবার্তা। পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতার দায় তাদের একার ওপর চাপিয়ে না দিয়ে শিক্ষাব্যবস্থার বিদ্যমান দুর্বলতা ও বৈষম্যের দায় স্বীকার করতে হবে। কারণ, শিক্ষার্থীদের মেধার অভাব নয়, বরং সুযোগের অভাবই অনেক সময় তাদের সম্ভাবনাকে বিকশিত হতে বাধা দেয়।
পাহাড়ের শিক্ষার্থীরা করুণা নয়, সমান শিক্ষার অধিকার ও মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ চায়। তাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে হলে অবিলম্বে শিক্ষক সংকট নিরসন, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলা ও বৈষম্য দূর করার কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। অন্যথায় প্রতিবছর ফলাফলের পর হতাশা প্রকাশ করা ছাড়া আমাদের অর্জন কিছুই হবে না।
বেবিলন চাকমা, যুগ্ন সম্পাদক, আইপিনিউজ বিডি


