আদিবাসী নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি বিশ্ব আদিবাসী দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি

আইপিনিউজ বিডি, ১৭ আগস্ট, ২০২৬, ঢাকাঃ আজ ১৭ আগস্ট ২০২৬ বিকাল ৪:০০ টায় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক – এর যৌথ উদ্যোগে বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপন উপলক্ষে আদিবাসী নারীদের সাথে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের ঢাকাস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের আনোয়ারা বেগম-মুনিরা খান মিলনায়তনে। সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম, এএলআরডির উপনির্বাহী পরিচালক রওশন জাহান মনি, দ্য হাঙ্গার প্রজেক্ট বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর প্রশান্ত ত্রিপুরা এবং মানবাধিকারকর্মী ও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের সদস্য দীপায়ন খীসা। সভায় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সমন্বয়ক ফাল্গুনী ত্রিপুরা। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। সভা সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড অফিসার সিননোমে মারমা (সিনো)।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে মালেকা বানু বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাহাড় ও সমতল মিলিয়ে ৫৪টিরও বেশি আদিবাসী জনগোষ্ঠী বসবাস করছে। আদিবাসী নারীরা নিজেদের সাজসজ্জা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। তবে তারা একই সঙ্গে নানা ধরনের লাঞ্ছনা, বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। নিজেদের মাতৃভাষা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকেও তারা বঞ্চিত।
তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি হিসেবে বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালিত হলেও বাংলাদেশে এখনো দিবসটির রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। তিনি বাংলাদেশেও বিশ্ব আদিবাসী দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান। একই সঙ্গে বিভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে মতবিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
রওশন জাহান মনি বলেন, একটি দেশ কতটা সভ্য, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সে দেশের নারীরা কতটা নিরাপদ তার ওপর। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজের বাস্তবতা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন। ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনসহ ঐতিহ্যগত ব্যবস্থাগুলোকে বিবেচনায় রেখে হেডম্যান, কারবারি এবং নারী-পুরুষের ভূমিকা কীভাবে সমতাভিত্তিকভাবে কাজে লাগানো যায়, সে বিষয়ে এএলআরডি কাজ করছে।
তিনি বলেন, যোগ্যতা ও দক্ষতার দিক থেকে আদিবাসী নারীরা অনেক দূর এগিয়ে গেছেন। শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, সমতলের আদিবাসী নারীরাও বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। মাতৃভাষা ও ভাষাগত অধিকার নিয়ে যে দাবিগুলো উঠে এসেছে, সেগুলো বাস্তবায়নে ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আদিবাসী নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নারী নির্যাতনের পেছনে ভূমি-সংক্রান্ত সমস্যা একটি বড় কারণ। একই সঙ্গে বম জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বিচার ছাড়াই আটক রাখার ঘটনায় তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন এবং দ্রুত তাদের জামিন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
দীপায়ন খীসা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে নারী হেডম্যান ও নারী কারবারির সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু রাষ্ট্র ও সরকারের নীতিমালা ও কার্যক্রম এখনো যথেষ্ট নারীবান্ধব নয়। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় সব নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, পাহাড়ের নারীরা ঐতিহ্যগতভাবে সমাজে স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে চলাফেরা করতে পারলেও জীবিকার তাগিদে বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির শিকার হচ্ছেন। কর্মসংস্থান ও জীবিকার প্রয়োজনে চলাচলের সময় দুর্ঘটনায় অনেক নারী প্রাণ হারাচ্ছেন। আদিবাসী নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ও বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ককে আরও সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রস্তাব দেন তিনি।
প্রশান্ত ত্রিপুরা বলেন, বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সরকারের আমলেই আদিবাসীদের স্বীকৃতির প্রশ্নে এক ধরনের অনীহা দেখা গেছে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগে রাজনৈতিক দলগুলো নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও পরবর্তীতে আদিবাসীদের অধিকার ও স্বীকৃতির বিষয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ খুবই সীমিত থাকে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র আদিবাসীদের যেন তিনটি ‘ম’-এর মধ্যে দেখতে চায়—মঞ্চ, মেলা ও মিউজিয়াম। কিন্তু ভূমি, রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে রাষ্ট্রের ভূমিকা অনেকটাই নীরব। শুধু আদিবাসীদের নয়, অ-আদিবাসীদের ভূমিও একটি গোষ্ঠী প্রতিনিয়ত দখল করে নিচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আদিবাসী নারীর অধিকার শুধু আদিবাসী নারীদের বিষয় নয়; এটি আদিবাসী পুরুষ, মূলধারার নারী-পুরুষসহ সবার অধিকার, সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন। বাংলাদেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর নিজস্ব ভাষাগুলোরও এখনো যথাযথ রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি নেই। তিনি আদিবাসী ভাষা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষায় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, বাংলাদেশে সমতা ও সমঅধিকারের আন্দোলন এগিয়ে নিতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের বাধার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও বর্তমান বাস্তবতায় নারীদের পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, উন্নয়নের নামে পার্বত্য চট্টগ্রামে বন উজাড় করা হচ্ছে, যার ফলে পরিবেশ ও ভূমির ওপর চাপ বাড়ছে। একইভাবে সমতলেও বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের নামে ভূমি দখল ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় নারী ও আদিবাসী নারীদের অধিকারকে বৃহত্তর সমঅধিকার আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেখতে হবে।
মুক্ত আলোচনায় মনিরা ত্রিপুরা বলেন, আদিবাসী নারীদের ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক বলা হয়। তিনি বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বিভিন্ন শাখার কার্যক্রমে আদিবাসী নারীদের আরও সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। মূলধারার বিভিন্ন পর্যায়ে আদিবাসী ও আদিবাসী নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে রাষ্ট্রের কাছে তাদের ন্যায্য দাবি তুলে ধরা আরও সহজ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
শান্তিদেবী তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে এগিয়ে গেলেও ভূমি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষার ক্ষেত্রে তারা সবচেয়ে বেশি সংকট ও লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ কীভাবে রাষ্ট্রের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরতে পারে, সে বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সভায় বক্তারা আদিবাসী নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত, ভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষা, মাতৃভাষার স্বীকৃতি, নারীর রাজনৈতিক ও সামাজিক অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং বিশ্ব আদিবাসী দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।


