ইস্পাত কারখানার দখলে পথঘাট, অবরুদ্ধ ত্রিপুরাপাড়া
আইপিনিউজ বিডি, ৬ জুলাই, ২০২৬, চট্টগ্রামঃ চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার একটি ত্রিপুরা অধ্যুষিত পাড়া ইস্পাত কারখানার সম্প্রসারণের ফলে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠে এসেছে আজকের পত্রিকার এক প্রতিবেদনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারখানার চারপাশে দেয়াল নির্মাণ, যাতায়াতের পথ সংকুচিত হওয়া এবং পরিবেশগত নানা সমস্যার কারণে স্থানীয় বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কারখানার সম্প্রসারণের পর থেকে তাদের স্বাভাবিক চলাচল, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে ধুলাবালি, শব্দদূষণ ও পরিবেশগত ঝুঁকিও বেড়েছে বলে তারা দাবি করেছেন।
আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে জানা গেছে, ত্রিপুরাপাড়ায় যাওয়ার প্রধান সড়কের একেবারে গা ঘেঁষে জিপিএইচ ইস্পাত কারখানার একটি ১০ তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে, স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, কৌশলে সড়কের অংশ ব্যবহার করে কারখানার সীমানা প্রাচীরও নির্মাণ করা হয়েছে।
এছাড়া, ওই সড়কের ওপর জিপিএইচ ইস্পাতের একটি চেকপোস্ট স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছেন চারজন কর্মী। ত্রিপুরাপাড়ায় যাতায়াত করতে চাইলে অনেক সময় ওই চেকপোস্টে নিরাপত্তাকর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয় বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
নিরাপত্তাকর্মীরা জানান, ওই রাস্তায় চলাচলকারী গ্রামের বাসিন্দাদের জন্য বিশেষ টোকেন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। টোকেন দেখালে তবেই চেকপোস্ট পার হয়ে ত্রিপুরাপাড়ায় যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়।
তবে ত্রিপুরাপাড়ার লোকজন বলছেন, তাঁরা টোকেন দেখিয়ে পার হতে পারলেও বাইরে থেকে তাঁদের স্বজনদের আসা-যাওয়ায় ঝামেলা হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করে তাঁরা বলছেন, ত্রিপুরাপাড়া যেন অবরুদ্ধ।
গতকাল (রোববার) এ বিষয়ে সীতাকুণ্ড উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বিষয়টি প্রথম জানতে পারেন তারা। এরপর উপজেলা প্রশাসনের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ত্রিপুরাপাড়ার রাস্তাটি বন্ধ থাকার সত্যতা পায়। পরে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের সরদারদের সঙ্গে আলোচনা করা হয় এবং তাঁদেরকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দাখিলের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এখনো পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে, সুলতানা মন্দির ত্রিপুরাপাড়ার প্রবীণ বাসিন্দা বিকারাম ত্রিপুরা (৬০) বলেন, তাদের পাড়ায় বর্তমানে ৩১টি পরিবারের দুই শতাধিক মানুষ বসবাস করছেন। তাঁর দাবি অনুযায়ী, ২০১৯ সালে জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষ কারখানা সম্প্রসারণের সময় ওই এলাকার যাতায়াতের রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
বিকারাম ত্রিপুরা আরও জানান, বর্তমানে চলাচল সীমিত হয়ে পড়ায় পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগে ব্যাপক ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে অন্যত্র থাকা আত্মীয়স্বজন বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান ও পারিবারিক আয়োজনে অংশ নিতে গেলে নানা ধরনের প্রশ্ন ও হয়রানির মুখে পড়তে হয় বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ত্রিপুরাপাড়ার রাস্তা জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষ বন্ধ করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন আদিবাসী ফোরাম সীতাকুণ্ড ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্র ত্রিপুরা। তিনি বলেন, পাড়ার শিশুদের জন্য কোনো খেলার জায়গা নেই এবং স্কুলে যেতে হলেও ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হয়। তাঁর অভিযোগ, চারপাশে স্ক্র্যাপ ইয়ার্ড গড়ে ওঠায় এলাকাটি এখন পরিবেশ দূষণেরও শিকার হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জিপিএইচ ইস্পাতের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল বলেন, সংশ্লিষ্ট জমিগুলো তারা আইনগতভাবে ক্রয় করেছেন এবং স্থানীয় ত্রিপুরাপাড়ার বাসিন্দাদের সেখানে বসবাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ করা হয়নি, বরং নিরাপত্তার কারণে চলাচল কিছুটা সীমিত করা হয়েছে।
চেকপোস্ট স্থাপনের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি ও লোহার সামগ্রী থাকার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে ত্রিপুরাপাড়ার বাসিন্দাদের অবরুদ্ধ করে রাখা এবং জিপিএইচ ইস্পাত কর্তৃপক্ষের এসব দাবির বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ এসেছে। তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সাখাওয়াত জামিল সৈকত বলেন, “ত্রিপুরাগণ আমাদের সম্মানিত নাগরিক। তাদের চলাচলের পথ বন্ধ করার কোনো অধিকার কারও নেই। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


