তিন দশক পূর্তি সফল করতে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সংবাদ সম্মেলন

অপূর্ব কুমার সিং, আঞ্চলিক প্রতিনিধি উত্তরবঙ্গঃ জাতীয় আদিবাসী পরিষদের ৩ দশক পূর্তি উপলক্ষে আগামী ০৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা শাহাবাগে সমাবেশ সামনে রেখে গতকাল দুপুর ১২টায় বগুড়া প্রেসক্লাবে কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজনে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
উক্ত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন, এ সময় উপস্থিত ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নরেন চন্দ্র পাহান, ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক সন্তোস সিং (বাবু), মুখপাত্র দপ্তর সম্পাদক সূভাষ চন্দ্র হেমব্রম জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটি।
এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ডা. ফিলিমন বাষ্কে সভাপতি গাইবান্ধা জেলা শাখা, রঘুনাথ এক্কা সভাপতি নাটোর জেলা শাখা সহ উত্তরবঙ্গের সকল জেলার জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদক উপস্থিত ছিলেন।
আরও উপস্থিত ছিলেন আদিবাসী যুব পরিষদ এর নেতৃত্ববৃন্দ এবং আদিবাসী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নকুল পাহান, সাধারণ সম্পাদক তরুণ মুন্ডা।
সংবাদ সম্মেলনে পঠিত লিখিত বক্তব্য ও উত্থাপিত দাবিসমূহ নিচে দেওয়া হলো-
লিখিত বক্তব্যঃ
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আগামী ০৩ সেপ্টেম্বর জাতীয় আদিবাসী পরিষদের অধিকার আদায়ের লড়াই-সংগ্রামের ৩ দশক পূর্তি পালন উপলক্ষে জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন এবং ঢাকার শাহবাগে বেলা ৩ টায় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। আপনারা জানেন সমতলের প্রায় ২০ লাখ পিছিয়ে পড়া আদিবাসী জনগোষ্ঠী আদিবাসী হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ ভূমির অধিকার চাকুরি, শিক্ষা ও মানবিক মর্যাদার দাবিতে ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছে। যখন আদিবাসীরা তাদের অধিকার আদায়ে সুসংগঠিত হচ্ছে তখন আমরা লক্ষ্য করছি শাসকগোষ্ঠীর পক্ষে ক্রীড়নক চিহ্নিত কিছু ব্যক্তি আদিবাসীদের আন্দোলন এবং লড়াই সংগ্রামকে দূর্বল করার ষড়যন্ত্র হিসাবে আদিবাসী পরিষদকে বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র নিয়ে এগুচ্ছে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের পক্ষ থেকে এরুপ অপতৎপরতার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আপনারা জানেন সমতলের আদিবাসীদের যেমন দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস আছে তেমনি আছে বঞ্চিত ও প্রতারিত হওয়ার ইতিহাস। আদিবাসীরা ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, সাঁওতাল বিদ্রোহ, পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলন, টঙ্ক আন্দোলন, হাজং বিদ্রোহসহ সমস্ত আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল তাদের জমি, সংস্কৃতি রক্ষার আকাংখা থেকে। এই আন্দোলনে যেমন তাঁরা জীবন দিয়ে অধিকার আদায় করতে চেয়েছে তেমনি এই অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে যে, শোষক, লুটপাটকারি ভূমিদস্যুরা সবসময় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় থেকেই আদিবাসীদের উপর নিপীড়ন চালায়। তাই আদিবাসীদের ন্যায়সঙ্গত আন্দোলনে সবসময় তাঁরা প্রগতিশীলদের সমর্থন ও সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আদিবাসীদের উপর সাম্প্রদায়িক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আক্রমণ ক্রমাগত বাড়ছে। সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্ম, স্বপ্নপুরীর নামে ভূমি দখল,বগুড়ার শেরপুরের আদিবাসীদের ভূমি বেদখলের জন্য হামলা, ভূমি দখল, হামলা, উচ্ছেদ নিত্যনৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নওগাঁর আলফ্রেড সরেন, দিনাজপুরের ঢুডু সরেন হত্যার বিচার এখনো হয়নি। মুক্তিযুদ্ধকালীন যার নেতৃত্বে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট আক্রমণ করেছিল সেই বীর মুক্তিযোদ্ধা বুধু উঁড়াও দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। ৭ বছর পার হয়ে গেলেও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে পুলিশের গুলিতে ৩ জন সাঁওতাল হত্যার বিচার এখনো হয়নি, সেই হামলায় ৩২ জন এখনো পঙ্গুত্ব বরণ করে মানবেতর জীবন যাপন করছে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়িয়ে আদিবাসীদের বাড়িঘরে হামলার মতো নিকৃষ্ট উদাহরণ তৈরী হয়েছে এবং অব্যাহত আছে। ইপিজেড, ইকোপার্ক করার নামে আদিবাসীদের ভুমি দখলের নানা পাঁয়তারা চলছে কখনো রাষ্টীয় পর্যায়ে কখনো ব্যক্তি পর্যায়ে এই সব কিছুর মূলে হলো আদিবাসীদের ভূমি হারানো। এ সমস্ত কিছুই চলছে শাসক গোষ্ঠীর প্রশ্রয়ে এবং প্রশাসনের সহায়তায়। ফলে আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ এবং প্রগতিশীল মানুষদের প্রতিবাদ গড়ে তোলা ছাড়া আদিবাসীদের অস্তিত্ব ও সংস্কৃতি রক্ষা করা সম্ভব নয়। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে গত ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবসেও সমতল ও পাহাড়ের আদিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ লড়াই করার শপথ উচ্চারিত হয়েছে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ,
আদিবাসীদের ঐক্য বিনষ্ট করা এবং সাধারণ আদিবাসীদেরকে হতাশ করার চেষ্টা চলছে। সম্প্রতি কতিপয় মুখচিহ্নিত ব্যক্তি জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নামে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবগত না করে অগণতান্ত্রিক ও অগঠনতান্ত্রিক পক্রিয়ায় জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভা আহবান করে। তারা আদিবাসী পরিষদ কে বিভক্ত করা ও আন্দোলন সংগ্রামকে দূর্বল করার এক ঘৃন্য অপচেষ্টায় লিপ্ত আছে। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি হিসাবে সুস্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই তথাকথিত স্বার্থান্বেষী মহলের অপচেষ্টা সফল হবে না। সকল আদিবাসী জনগোষ্ঠী জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় এবং জেলা, উপজেলা,পর্যায়ে ষড়যন্ত্রকারীদের প্রত্যাখান করেছে। তথাপিও ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র এখনো বন্ধ হয়নি। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নাম ব্যবহার করে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। সেই কারনে ষড়যন্ত্রকারী-অপতৎপরতাকারীদের কোন ধরনের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে সকল আদিবাসীদের আদিবাসী পরিষদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধ থাকবার জন্য সভাপতি হিসাবে আহবান জানাই। আগামী ০৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা শাহবাগের সমাবেশ সফল করার মধ্য দিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা উপযুক্ত জবাব পাবে। মনে রাখতে হবে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ কোন ব্যক্তির পকেট সংগঠন না।অতীতেও ছিল না, ভবিষ্যতেও হবে না। যারা জাতীয় আদিবাসী পরিষদের গঠনতন্ত্র বিরোধী কার্যক্রমে যুক্ত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
প্রিয় সাংবাদিক বন্ধুগণ, আপনারা জানেন, আওয়ামী সরকার ২০০৮ সালে আদিবাসীদের দাবিপূরণের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিলেও অদ্যবধি তা পূরণ হয়নি। স্বধীনতার ৫২ বছরে আদিবাসীদের জীবনে স্বস্তির চাইতে শংকা বেড়েছে বহুগুন। ভাষার জন্য জীবন দেয়ার কথা যখন বাংগালীরা গর্বের সাথে বলে তখন নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতি বিপন্ন হতে দেখে আদিবাসীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বনভূমি উজাড়, প্রকৃতি ধ্বংস আর আদিবাসীদের উৎখাত সমানতালেই চলছে শিক্ষার অধিকার এবং শিক্ষা অর্জনের সক্ষমতা দুটোই কমছে। পাঠ্যপুস্তকেও আদিবাসীদের জীবন ও সংস্কৃতির অবমাননার চিত্র দেখা যায়। কর্ম সংস্থানের সুযোগ কম। আয় বৈষম্য প্রকট। জীবিকার জন্য পেশা নির্বাচনের সুযোগ কম। নাগরিক অধিকারেও বৈষম্যের চিত্র। পুষ্টিহীনতার ছাপ তাদের শরীরে। স্বাধীনতার ৫২ বছরে প্রন্তিক জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্র মূল স্রোতে আনতে চায় নি বরং আরো প্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক তা বুঝা যায় সমাজের দুর্বল অংশের প্রতি দায়ীত্বপালন থেকে। সমাজের এক অংশকে পিছনে রেখে উন্নয়ন একটা প্রহসন মাত্র। উন্নয়নের ডামাডোল আর আদিবাসীদের উচ্ছেদ আতংক একসাথে চলতে পারে না। আমরা মনে করি আদিবাসীদের অধিকার গণতান্ত্রিক অধিকার। মানবাধিকারের কথা বললে আদিবাসীদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতেই হবে। গণতন্ত্রের লড়াই এবং আদিবাসীদের মাটি ও মর্যাদার লড়াই এক সাথেই চালাতে হবে। আমরা জাতীয় আদিবাসী পরিষদের পক্ষ থেকে ৫ দফা দাবি নিয়ে ধারাবাহিক আন্দোলন সংগ্রাম করছি। ৫ দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত সমতলের সকল আদিবাসীদের সাথে নিয়ে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ লড়াই-সংগ্রাম অব্যাহত রাখবে।
দাবি সমূহঃ
★ সকল আদিবাসীদের আদিবাসী হিসাবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিতে হবে।
★ সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।
★ সরকারি চাকুরীতে আদিবাসীদের কোটা ৫% নিশ্চিত কর এবং উচ্চ শিক্ষায় আদিবাসীদের কোটা বাস্তবায়ন কর।
★ গাইবান্ধা জেলার সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের তিন সাঁওতাল হত্যার বিচার চাই।রাজশাহীর গোদাগারীতে সেচের পানি না পাওয়ায় অভিনাত মার্ডি ও রবি মার্ডির আত্মহত্যার প্ররোচনাকারীদের বিচার চাই।
★ সারাদেশে আদিবাসীদের উপর নির্যাতন, হত্যা,ধর্ষণ,অপহরণ,জমি জবর দখল,মিথ্যা মামলা,লুটপাট পুলিশী হয়রানি আদিবাসীদের নামে বরাদ্দকৃত টাকা আত্মসাৎ, ভূমি অফিসের ঘুষ- দূর্নীতি বন্ধ করতে হবে।
★পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনতিবিলম্বে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন কর।


