গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মে আদিবাসী সাঁওতাল হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাংচুর, নির্যাতনের বিচার ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি

গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মে আদিবাসী সাঁওতাল হত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, ভাংচুর, নির্যাতনের বিচার ও ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি
গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের চুক্তিভিত্তিক অধিগ্রহণকৃত জমি মূল মালিক/উত্তরাধিকারী আদিবাসী ও বাঙ্গালীদের কাছে ফিরিয়ে দেবার দাবিতে ৬ নভেম্বর ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটের সাগর-রুনি মিলনায়তনে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, এএলআরডি ও কাপেং ফাউন্ডেশন এ ৫টি সংগঠনের যৌথ উদ্যোগে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভপতি রবীন্দ্রনাথ সরেনের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেসবাহ কামাল, এএলআরডি’র নির্বাহী পরিচালক শামসূল হুদা, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, বাংলাদেশ ওয়ার্কাস পার্টি রংপুর জেলা কমিটির সাধারন সম্পাদক অশোক সরকার, সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি’র সাধারন সম্পাদক জাফরুল ইসলাম প্রধান, কাপেং ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক হিরন মিত্র চাকমা ও আদিবাসী নারী নেত্রী অলিভিয়া হেম্ব্রম প্রমূখ। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য খোকন সুইটেন মুরমু।
অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, দেশীয় ও আন্তজাতিক ভাবে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফামের ঘটনায় তীব্র নিন্দার ঝড় ওঠা সত্বেও রাষ্ট আজ পযন্ত এই ঘটনা আমলে নেয়নি। রাষ্ট্রের উচিত অবিলম্বে আদিবাসীদের জমি ফেরত দেওয়া। সেই সাথে ঘটনার মূলহোতা সাবেক সাংসদ অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদসহ ৬ নভেম্বরের ঘটনায় জড়িত সন্ত্রাসী ও পুলিশ সদস্যদের গ্রেপ্তার করা। রাষ্ট্রের উচিত আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি এবং সে সাথে তাদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া। তিনি আরও বলেন, গাইবান্ধার বাগদাফার্মে আদিবাসী ও বাঙালিদের ওপর বেআইনীভাবে গুলিবর্ষণ, হত্যা, উচ্ছেদ ও অগ্নিকান্ড সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই হত্যাকারীরা এদেশে যতদিন বিচারহীনভাবে থাকবে, ততদিন পর্যন্ত এদেশটি হত্যাকারীর দেশ হিসেবে পরিচয় বহন করবে। কিন্তু আমরা এদেশকে হত্যাকারীর দেশ হিসেবে দেখতে চাই না। এদেশকে আমরা মুক্তিযুদ্ধের দেশ হিসেবেই দেখতে চাই।
শামসূল হুদা বলেন, সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মের জমি রিকুইজিশ করা হয়েছিল অধিগ্রহন নয়। কিন্তু সরকারের কিছু আমলা ও স্বার্থান্বেষী মহল আজ বলার চেষ্ঠা করছে সরকার জমি অধিগ্রহন করেছিল। রিকুইজিশন করা জমিতে সাহেবগঞ্জ বাগদা ফার্মে গাইবান্ধা জেলা পরিষদ কর্তৃক ইপিজেড স্থাপনের দাবি অনৈতিক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে যেখানে বলেছেন, কোন ভারী শিল্পের জন্য দুই-তিন ফসলী জমি কখনো অধিগ্রহণ করা হবে না। সেখানে গাইবান্ধা জেলা পরিষদ কর্তৃক বাগদাফার্মের ১৮৪২.৩০ একর জমিতে ইপিজেড স্থাপনের দাবি এক গভীর ষড়যন্ত্র। আদিবাসীরা আজ নিজভূমে পরবাসী। ২০০৪ সালে রংপুর চিনিকল যেখানে লে-অফ ঘোষণা করা হয়েছে তাহলে সেখানকার মিল কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বসিয়ে রেখে বেতন প্রদান সরকারের জন্য বিশাল অংকের আর্থিক ক্ষতিরই নামান্তর। অবিলম্বে এসব কর্মকর্তা কর্মচারীদের সেখান থেকে প্রত্যাহার করে নিতে হবে। তিনি আরো বলেন, দেশে আজ বিচারহীনতার সংস্কৃতি মহামারি আকার ধারণ করেছে। বাগদাফার্মের আদিবাসীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি সারা বাংলাদেশে ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়বে।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, রাষ্ট্রের উচিত সাহেবগঞ্জ ফার্মের আদিবাসীদের যৌক্তিক দাবি মেনে নেওয়া। স্বাধীন বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনে আদিবাসীদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও আদিবাসীদের জন্য স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠনের জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পাটির পক্ষে আট দফা দাবির প্রতি একাত্বতা ঘোষণা করেন। তিনি সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভ’মি কমিশন গঠনসহ আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করার দাবি জানান।
সঞ্জীব দ্রং বলেন, গাইবান্ধার সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্মের জমি যারা অবৈধভাবে লিজ নেয় সরকারের পুলিশ বাহিনী তাদের পাহাড়া দেয়। অথচ জমির মূল মালিক আদিবাসী সাঁওতাল ও বাঙালি কৃষকের আজ ন্যায্য দাবির জন্য সরকারের সেই পেটোয়া পুলিশ বাহিনীর দ্বারাই খুন হতে হচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আদিবাসীরা আজ বড় অসহায়। আদিবাসীরা সবসময় দেশের উন্নয়নের মাপকাঠির বাইরে থেকে যাচ্ছে। তারা আর সরকারের দৃষ্টিতে নেই। বাগদা ফাম এলাকায় সাঁওতালরা তাদের ভ’মি অধিকারের জন্য লড়াই করে চলেছেন। এ বিষয়ে সরকার ও আদিবাসীদেও মধ্যে আরো আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। তিনি বলেন, আর কত মিডিয়া এই ঘটনাকে তোলে ধরলে সরকার সাঁওতালদের ভ’মি ফিরিয়ে দিতে উদ্যোগী হবেন!
সভাপতির বক্তব্যে রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন, গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের উপর আক্রমন ১৯৭১ সালের হামলাকেও হার মানিয়েছে। উত্তরবঙ্গের আদিবাসীরা ভূমি থেকে উচ্ছেদের নিমিত্তে প্রতিনিয়তই হামলা, মামলা, নির্যাতন ও খুনের শিকার। বাগদাফার্মের উপর রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশী হামলার পর উল্টো আদিবাসীদের নামে ৯টি মিথ্যা মামলা প্রমান করে প্রশাসন আদিবাসী বান্ধব নয়। এবং ঘটনার প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হবার পর মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশ থাকা সত্বেও পিবিআই কর্তৃক তদন্ত রির্পোট পেশ না করা আদিবাসীদের প্রতি চরম বৈষম্যেরই প্রতিফলন। বাগদাফার্মে আদিবাসীদের সকল প্রকার দাবি মেনে নিয়ে তাদেরকে বাপ-দাদার জমিতে পূনর্বাসন করতে হবে দাবি জানান।
মো: জাফরুল ইসলাম প্রধান বলেন, গত ৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে সাহেবগঞ্জ-বাগদাফার্মের আদিবাসী ও বাঙালিদের উপর রংপুর মহিমাগঞ্জ চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও পুলিশের হামলা, মামলা, লুটপাট, খুন, উচ্ছেদ, অগ্নিসংযোগ ও হয়রানির ঘটনা স্বাধীন রাষ্ট্রের সংবিধান, মানবিকতা ও আইন সবকিছু লংঘন করেছে। ঘটনার পর প্রায় তিন বছর অতিবাহিত হয়েছে কিন্তু দুঃখের বিষয় আদিবাসীরা আজও বিচার পায়নি। বাগদাফার্মের জমির উত্তরাধিকারীরাও এদেশের নাগরিক এবং তারা ন্যায্য দাবির জন্য লড়াই করছে। আদিবাসী ও বাঙালি জনগণ ততদিন পর্যন্তই লড়াই সংগ্রাম করে যাবে যতদিন না তাদেরকে বাপদাদার সম্পত্তি পূনর্বাসন করা হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, ৬ নভেম্বরের হামলাকারিদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও শাস্তি প্রদান এবং আদিবাসী বাঙ্গালী কৃষকদের বিরুদ্ধে রংপুর চিনিকল কর্তৃপক্ষ ও গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের সকল প্রকার মিথ্যা মামলা অবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে ৮দফা দাবি তোলে ধরা হয়। সে দাবিগুলো হলো:
২৮ জুলাই ২০১৯ পিবিআই কর্তৃক পেশকৃত প্রহসনমূলক চার্জশীট বাতিল করতে হবে এবং অবিলম্বে সাঁওতাল হত্যাকান্ডের মূলহোতা সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদসহ অভিযুক্তদের বিচার করতে হবে;
গোবিন্দগঞ্জের সাহেবগঞ্জ বাগদাফার্ম-এর রিক্যুইজিশন (জবয়ঁরংরঃরড়হ) করা ১৮৪২.৩০ একর সম্পত্তি আদিবাসীদের ফেরত দিতে হবে। সেই লক্ষে অবিলম্বে সংগ্রামরত স্থানীয় সাঁওতাল ও বাগদাফার্ম ভূমি উদ্ধার কমিটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আদিবাসী ও বাঙ্গালী পরিবারের কাছে স্থায়ী বন্দোবস্ত প্রদানের প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে;
আদিবাসী সাঁওতাল পল্লীতে ভাংচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং গুলি করে নিহত ও গুরুতর আহত করার সাথে জড়িত উস্কানিদাতা ও পুলিশ বাহিনীর সদস্য এবং সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সেই সাথে নিহত ও আহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে;
৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ আদিবাসী-বাঙালিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। আদিবাসী বাঙালি নারী-পুরুষের উপর স্থানীয় সন্ত্রাসীদের জুলুম ও পুলিশী হয়রানি বন্ধ করতে হবে;
১৯৪৮ সালের The East Bengal (Emergency) Requisition of Property Act 1948 (No. VIII of 1948) মোতাবেক যে কার্যের জন্য (ইক্ষুচাষ) মূল মালিকদের কাছ থেকে ভূমি গ্রহণ হয় তা না করা হলে খেসারতসহ পূর্বমালিকদের ফেরতের বিধান বাস্তবায়ন করতে হবে;
২০০৪ সালে সুগার মিল বন্ধের পর প্রভাবশালীদের মাঝে লিজের নামে যে অর্থআত্মসাৎ ও দুর্নীতি হয়েছে সেই দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে;
৬ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে উচ্ছেদকৃত সাঁওতাল আদিবাসী ও বাঙালি পরিবারের জন্য তাদের নিজ ভূমিতে পূর্ণবাসন করতে হবে এবং তাদের জন্য ঘরবাড়ি, স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও আবাসনের সকল ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে;
সমতলের আদিবাসীদের ভূমি সংকট নিরসনে পৃথক ও স্বাধীন ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদ এই দাবির সাথে একাত্বতা ঘোষণা করে উত্তরবঙ্গের রংপুর, দিনাজপুর, রাজশাহী, নাটোর, গাইবান্ধা ও ঠাকুরগাঁও জেলায় একযোগে মানববন্ধন ও সমাবেশ করেছে।


