আঞ্চলিক সংবাদ

ভুয়া দলিলের মাধ্যমে এক বিধবা মান্দি আদিবাসীর জমি দখলের চেষ্টা

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী নয়াবিল ইউনিয়নের ডালুকোনা দাওধারা গ্রামের জাসপিনা নেংমিঞ্জার জমি ভুয়া দলিল করে জবরদখলের চেষ্টা করছে একই এলাকার আব্দুল মান্নান ওরফে কেওরা দেওয়ানী। জমির পরিমাণ ৪৬ শতাংশ।

সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নয়াবিল ইউনিয়নের ডালুকোনা মৌজার বর্তমান ২৪ নং খতিয়ানে ও ১১৪ নং দাগে ৪৬ শতক জমির প্রকৃত রেকর্ডীয় মালিক ছিলেন প্রবাসু কোচ। ষাটের দশকে প্রথমে গ্রাম্যভাবে ও পরবর্তীতে ১৯৬৩ সালের ৪ জুলাই প্রবাসু কোচ ওই জমি স্থানীয় তাজিমনি সাংমাকে রেজিস্ট্রি দলিলে বিক্রি করে দিয়ে ভারতে চলে যান।

উত্তাধিকারসূত্রে ওই জমি পান তাজিমনি সাংমার কন্যা জসিন্তা সাংমা ওরফে আশুমণি সাংমা। ১৯৯৯ সালের ১২ এপ্রিল জসিন্তা সাংমা ওই জমি তার আপন ভাগ্নি জসপিনা নেংমিনজাকে সাব–রেজিস্ট্রি করে লিখে দেন।

নিজেদের ভোগদখলে থাকায় সহজ সরল মান্দি আদিবাসী তাজিমনি, জসিন্তা ও জসপিনা তাদের দখলীকৃত জমি নিজেদের নামে রেকর্ড বা নামখারিজ করা নিয়ে কখনো ভাবেননি। আর এই সরলতাকে পুঁজি করে গোপনে সুযোগ নেন প্রতিবেশি আব্দুল মান্নান।

গোপনে ছক আঁকতে থাকেন আব্দুল মান্নান, জমি বিক্রির পর ১৯৬৪ সালে ভারতে চলে যাওয়া প্রবাসু কোচের স্থলে ভুয়া প্রবাসু কোচ বানিয়ে ২০১১ সালের ৬ জানুয়ারি একই জমি দাওধারা গ্রামের চরিত্র চন্দ্র সরকারের নামে লিখে নেন। পরে চরিত্র সরকার ওরফে চরিত্র হাজং এর কাছ থেকে ওই জমি ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট নিজ নামে লিখে নেন আব্দুল মান্নান। এরই ধারাবাহিকতায়, বিষয়টি গোপন রেখে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তার সাথে যোগসজশ করে গত বছরের (২০২২) ১১ ডিসেম্বর ওই জমির নামখারিজও সম্পন্ন করেন আব্দুল মান্নান। এক পর্যায়ে বিষয়টি প্রকাশ হয়ে পড়লে চলতি বছর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কার্যালয়ে ওই খারিজ বাতিল করতে আবেদন করেন জসপিনা নেংমিনজা।

মি. লুইস নেংমিঞ্জা, চেয়ারম্যান, নালিতাবাড়ি ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন ও আদিবাসী নেতা বলেন, আদিবাসীদের জমি রেজিস্ট্রি করতে স্থানীয় ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্রের প্রয়োজন হয়। এই প্রত্যয়নপত্র প্রদানসাপেক্ষে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) দেওয়া একটি নম্বর দলিলে উল্লেখ করতে হয়। কিন্তু আব্দুল মান্নানের কথিত দলিলে এমন কোন নম্বর বা ট্রাইবাল চেয়ারম্যানের প্রত্যয়নপত্র নেই।

ভুক্তভোগী জসপিনা নেংমিঞ্জার ছেলে রাসেল নেংমিঞ্জা বলেন, ওই জমিতে কয়েকদিন আগে মাত্র আমরা আকাশমণি গাছের চারা রোপণ করেছি। একদিন সকালে দেখি জমির একপাশে আব্দুল মান্নান ঘরের মতো একটি স্থাপনা তুলে রেখেছে। তিনি জমি জবরদখল হবার আশংকা প্রকাশ করেন এবং বলেন যে, এর সঠিক সুরাহা হওয়া উচিত।

প্রতিবেশী প্রদীপ ম্রং বলেন, আমি গত ৩৫ বছর যাবত দেখছি এ জমির ভোগদখল জসপিনা নেংমিঞ্জার। কিন্তু হঠাৎ কয়েকদিন আগে রাতের অন্ধকারে ঘর তুলেছেন আব্দুল মান্নান। সে এই জমির প্রকৃত মালিক না।

চরিত্র চন্দ্র সরকার বলেন,আমি বুঝতেই পারি নাই যে, আমাকে এমন ভুয়া মালিক বানিয়ে মান্নান এমন প্রতারণা করছে। জমির রেকর্ডীয় প্রথম মালিক প্রবাসু কোচকে আমি চিনি না। আব্দুল মান্নান নিজে উদ্যোগ নিয়ে প্রবাসু কোচ বানিয়ে সাব রেজিস্ট্রার অফিসে নিয়ে আমাকে জমি দলিল করে দিয়েছে। পরে আমি ওই জমি আব্দুল মান্নানকে লিখে দিয়েছি।

জবরদখলকারী অভিযুক্ত আব্দুল মান্নান বলেন, এই জমি আমার। আমি চরিত্র সরকারের কাছ থেকে জমি কিনে নিয়েছি। চরিত্র চন্দ্র সরকার আমাকে জমি রেজিস্ট্রি করে দিয়েছে। যা আমি নামখারিজ করেছি এবং দখলে যাওয়ার চেষ্টা করছি। চরিত্র সরকার কার কাছ থেকে কিনে নিয়েছেন সেটা আমার দেখার বিষয় না। তবে জমির মূল্য, দলিলে উল্লেখিত সাক্ষ্য ও জবর দখল নিয়ে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

এমতাবস্থায় এই পরিস্থিতির প্রতিকার চেয়ে উপজেলা ভূমি অফিসে নামজারী বাতিলের আবেদন ও থানায় অভিযোগ দাখিল করেছেন বিধবা জসপিনা নেংমিঞ্জা। এলাকাবাসীও এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের উদ্যোগ প্রত্যাশা করছেন।

Back to top button