জাতীয়বিশেষ প্রতিবেদন

বহুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন অনুসরণের আহ্বানঃ ঢাকায় সেমিনারে বক্তারা

আইপিনিউজ বিডি, ৩ অক্টোবর ২০২৬, ঢাকাঃ আজ ৩ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার ঢাকায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ‘গণঅভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষা ও মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সাংবিধানিক বহুত্ববাদ’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সেমিনারে আইপিনিউজ বিডির উপদেষ্টা সম্পাদক সতেজ চাকমার সঞ্চালনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, কবি ও সাংবাদিক সোহরাব হাসান, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বখতিয়ার আহমেদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস্য দীপায়ন খীসা, কবি, প্রাবন্ধিক ও সম্পাদক সাখাওয়াত টিপু এবং বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা।

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনায় পাভেল পার্থ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শ্রমজীবী মানুষের অংশগ্রহণের পাশাপাশি দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া গ্রাফিতি জনআকাঙ্ক্ষার দৃশ্যমান প্রকাশ হয়ে উঠেছিল। তবে সময়ের সঙ্গে শ্রমজীবী, আদিবাসী, শিশু ও নিম্নবর্গের অভিজ্ঞতা ও ইতিহাস মূলধারার বয়ানে ক্রমশ অদৃশ্য হয়ে পড়ছে। গ্রাফিতি মুছে ফেলা বা ছিঁড়ে ফেলার মধ্য দিয়ে গণঅভ্যুত্থানের বহুমাত্রিক জনআকাঙ্ক্ষাকেও আড়াল করা হয়েছে। জুলাইকে শুধু সরকার বা শাসন পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে না দেখে দীর্ঘদিনের বৈষম্য, উপনিবেশিক কাঠামো ও কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে চলমান প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানানো হয়েছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, কাপ্তাই বাঁধ, মধুপুর, ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন গণপ্রতিরোধের ধারাবাহিকতার সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যোগসূত্র তুলে ধরেন।
তিনি আরও বলেন, কল্পনা চাকমার নিখোঁজের ঘটনা, আদিবাসী নিপীড়ন ও বিচারহীনতার বিষয়ও বিভিন্ন গ্রাফিতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ‘কল্পনা চাকমা কোথায়’, ‘জাস্টিস ফর কল্পনা চাকমা’ ও ‘ইনডিজেনাস লাইভস ম্যাটার’-এর মতো বার্তার মাধ্যমে অধিকার ও স্বীকৃতির দাবি সামনে এসেছে। একই সঙ্গে ‘পাহাড়ে কবে মুক্তি মিলবে’ বা ‘পরাধীন পাহাড়’-এর মতো গ্রাফিতি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রশ্নকে সামনে এনেছে।

পাভেল পার্থ আরও বলেন, এসব দৃশ্যমান প্রতিবাদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক দর্শনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। লারমার দর্শনের কেন্দ্রে ছিল রাষ্ট্রের প্রতিটি জাতিসত্তা, শ্রেণি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমান মর্যাদা, অধিকার ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। তিনি এমন একটি রাষ্ট্রের কথা বলেছিলেন, যেখানে কোনো একটি জাতি বা গোষ্ঠীর পরিচয় অন্য জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না এবং রাষ্ট্রের নাগরিকত্বের ভিত্তি হবে সাম্য, ন্যায় ও মর্যাদা।

সারা হোসেন বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তিনি জাতীয় সংসদে নারীর অধিকার নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এবং শুধু নারীর অধিকার নয়, সকল মেহনতি মানুষের অধিকারের কথাও তুলে ধরেছেন। আজকের জুলাই সনদে বহুত্ববাদের কথা বলা হলেও বৈষম্য কীভাবে দূর করা হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্টভাবে কিছু বলা হয়নি। বৈষম্য নিরসনে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সেটিও পরিষ্কার করা হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ঐকমত্য কমিশনের কার্যক্রমেও আদিবাসীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়নি। সংবিধানে নারী-পুরুষ, ধনী-গরিব ও সংখ্যাগরিষ্ঠ-সংখ্যালঘুর মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য কীভাবে দূর করা হবে, সে বিষয়ে যে ধরনের সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রয়োজন, জুলাই সনদে তা প্রতিফলিত হয়নি। তাই সত্যিকার অর্থে বহুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করতে হলে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শনকে নতুন করে গুরুত্ব দেওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। এ বিষয়ে আমাদের সোচ্চার হতে হবে, কথা বলতে হবে এবং দাবি তুলতে হবে। কোনোভাবেই হতাশ হওয়া যাবে না।

বখতিয়ার আহমেদ বলেন, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শনকে রাষ্ট্র স্বীকার করে এবং ধারণ করে এগোতে পারলে আজকের রাষ্ট্র একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারত। কিন্তু অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জনআকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে এখনো সন্দেহ থেকে যায়। পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্যবাদী বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, তার পেছনে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু সেই সময় রাষ্ট্র তাঁর বক্তব্য ও দাবিগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে শোনেনি। তিনি কেবল একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল বা জনগোষ্ঠীর অধিকারের কথা বলেননি; তিনি দেশের অধিকারহীন জনগোষ্ঠী, বিভিন্ন জাতিসত্তা এবং মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলেছেন।

তিনি আরও বলেন, আজকের বাংলাদেশে যে বহুত্ববাদের কথা বলা হচ্ছে, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সেই কথাই ১৯৭২ সালেই বলেছিলেন। তাই তাঁর চিন্তা ও দর্শনকে আজকের বাস্তবতায় নতুন করে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রের প্রান্তসীমায় গেলে রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। সুতরাং রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। জনগণকে দেখার ক্ষেত্রে শুধু গোয়েন্দা তথ্য বা গোয়েন্দা-নির্ভর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর না করে জনগণের অভিজ্ঞতা, মতামত ও অধিকারকে গুরুত্ব দিতে হবে। রাষ্ট্রকে জনগণের ওপর আস্থা রাখতে হবে এবং জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ তৈরি করতে হবে।”

সোহরাব হাসান বলেন, আমরা যখন বহুত্ববাদের কথা বলি, অনেক সময় তা শুধু মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। তা না হলে আজও কেন বিমানবন্দরে পাপ্তবয়স্ক নারীদের অবিবাহিত পরিচয়ের কারণে বিদেশযাত্রায় আটকে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটবে। যেসব কমিশন গঠন করা হয়েছে, সেসব কমিশনে ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নেই। এ ধরনের পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই প্রকৃত বহুত্ববাদ বলা যায় না। বাংলাদেশের সংবিধানে একদিকে সাম্য ও সমতার কথা বলা হয়েছে, অন্যদিকে বৈষম্যের সুযোগও রয়ে গেছে। এর একটি উদাহরণ হলো, সংবিধানে আদিবাসীদের বাঙালি হিসেবে পরিচিত করার বিষয়টি। অথচ একটি জাতির পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়।

তিনি আরও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীরা নিজেদের এলাকায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছেন। অথচ পার্বত্য চুক্তির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল সেখানকার আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভাষা সংরক্ষণ করা। কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছিলেন একজন মানবতাবাদী চিন্তক। তিনি সাম্য, সমতা ও মানুষের অধিকারের দর্শনে বিশ্বাস করতেন। তাঁর চিন্তা ও দর্শন আজও বহুত্ববাদী ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

দীপায়ন খীসা বলেন, আমি জুলাই সনদটি দেখেছি। সেখানে বাংলাদেশকে একটি বহুজাতি, বহুধর্মী ও বহুভাষী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে সেই বহুত্ববাদ কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, সে বিষয়ে আরও সুস্পষ্ট আলোচনা প্রয়োজন।বর্তমানে সালাউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে সংবিধান সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ভারতের মেঘালয় রাজ্যে ছিলেন। মেঘালয় ভারতের একটি বিশেষ সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রাজ্য এবং এটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল। ফলে সেখানে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে আদিবাসীদের অধিকার ও পরিচয়ের বিষয়গুলো তাঁর জানার কথা। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার পর দেশের আদিবাসী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পরিচয়ের প্রশ্নটি যেন উপেক্ষিত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করে দেওয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের নয়। অথচ দুঃখজনকভাবে, বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর পরিচয় নির্ধারণের ক্ষেত্রেও অনেক সময় রাষ্ট্রীয় ও গোয়েন্দা কাঠামোর প্রভাব দেখা যায়। একটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় তার নিজেরাই নির্ধারণ করবে রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই পরিচয়কে স্বীকৃতি দেওয়া ও সম্মান করা। আমি মনে করি, বাংলাদেশ যতদিন রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে, ততদিন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংবিধান দর্শন নিয়ে আলোচনা চলবে। বাংলাদেশে যখনই সংবিধান, সাম্য, বহুত্ববাদ ও বৈষম্যহীন সমাজ নিয়ে আলোচনা হবে, তখনই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শনকে স্মরণ করতে হবে।

ফাল্গুনী ত্রিপুরা বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সম্পর্কে শুনে আসছি। তিনি গরিব, মেহনতি মানুষ, বেদে, জেলে ও নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময়ও তিনি সংসদে এসব মানুষের অধিকার ও ন্যায্যতার প্রশ্নে তাঁর কণ্ঠ সোচ্চার রেখেছিলেন। তাঁর দর্শনে নারী-পুরুষ, কৃষক-শ্রমিকসহ সমাজের সকল মানুষের অধিকার ও সমতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত ছিল। সর্বশেষ ২৪ শের যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, সেখানেও জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা ছিল, তার পুরোপুরি প্রতিফলন ঘটেনি। আজকের বাংলাদেশে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলো নানাভাবে নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তাদের অধিকার বিভিন্নভাবে সংকুচিত হয়ে আসছে। অথচ সরকার একদিকে ‘রেইনবো নেশন’-এর কথা বলছে, অন্যদিকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। একটি সত্যিকারের বহুত্ববাদী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে কথার পাশাপাশি আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা ও পরিচয়ের স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে।

সাখাওয়াত টিপু বলেন, পাহাড়ের সঙ্গে আমারও একটি নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। পাহাড়ে বেড়ে ওঠা এবং পাহাড় ও সমুদ্রের যে অপূর্ব মেলবন্ধন, সেই পরিবেশেই আমি চট্টগ্রামে বড় হয়েছি। তাই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শনের সঙ্গে আমার একটি গভীর সম্পর্ক অনুভব করি। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার দর্শন আজকের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। একটি রাষ্ট্রের সব জনগোষ্ঠী ভালো না থাকলে সেই রাষ্ট্রও প্রকৃত অর্থে ভালো থাকতে পারে না। রাষ্ট্রের প্রকৃত চরিত্র তখনই বোঝা যায়, যখন সেই রাষ্ট্রের সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষও নিরাপদে, শান্তিতে ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে।

Back to top button