জেএসএসের সাথে বাবা’র সম্পৃক্ততাই ৩৪তম বিসিএসের গেজেটে নাম আসেনি শোভন চাকমা’র
আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): রাঙামাটি জেলার দুর্গম জুরাছড়ি উপজেলার বনযোগীছড়া গ্রামের ছেলে শোভন চাকমা। ২০১৬ সালে ৩৪তম বিসিএসের ফলাফল প্রকাশিত হলে সহকারী পুলিশ সুপার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন তিনি। এ খবরে দুর্গম জুরাছড়ি ছাড়িয়ে আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে। কিন্তু এ আনন্দ থমকে গিয়েছিল অজানা এক কারণে। কারণ সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও অজানা কারণে চূড়ান্ত গেজেটে তখন নাম আসেনি এই শোভন চাকমা’র।
শোভন চাকমা ছিলেন বাংলাদেশ সৃষ্টির পর জুরাছড়ি উপজেলা থেকে প্রথম পুলিশ ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত ব্যক্তি। কিন্তু কে জানত শোভন চাকমার যোগদান আটকে দেওয়া হবে। চূড়ান্ত গেজেটে শোভনের নাম না আসায় নানা প্রশ্ন জন্ম নেয় পাহাড়ে। সুপারিশপ্রাপ্ত বন্ধুরা যখন কর্মস্থলে যোগ দেয় তখন বন্ধু–বান্ধব স্বজনদের কাছে নানা প্রশ্নের উত্তর দিতে হয় শোভনকে।
এদিকে গেজেটে নাম না আসার কারণ জানতে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে যান শোভন। যেখানে গিয়ে জানতে পারেন রাঙ্গামাটি জেলার আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি দীপংকর তালুকদার চাননি শোভন চাকমার নাম গেজেটে আসুক। তিনিই মূলত আটকে দিয়েছিলেন।
এরপরে হতাশ হয়ে কিছুদিন রাঙামাটিতে স্থানীয় একটি এনজিওতে কনসালটেন্সি করেন শোভন। পরে একপ্রকার অভিমান করে উচ্চশিক্ষার জন্য অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশে ২০১৮ সালে দেশ ছাড়েন শোভন। বর্তমানে সেখানেই অবস্থান করছেন তিনি।
গত ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গত ১৪ আগস্ট ১৪ বছর ধরে বিসিএস বঞ্চিতদের তালিকা প্রকাশ করে। আর এতে তালিকায় শোভনের নাম উঠে আসে।
এ খবরে নতুন করে আবারও উচ্ছ্বাস বাড়ে পাহাড়ে। অভিনন্দন জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিনন্দন বার্তায় ছড়িয়ে দেয় পাহাড়ের মানুষ। কিন্তু এ আনন্দের মাঝে শোভন জানান, তিনি এ পদে যোগদান করবেন না।
শোভন বলেন, ‘আমার জীবন থেকে ৮টি বছর চলে গেছে। ৮ বছর আগে যে গতি নিয়ে আমার দেশের সেবা করার কথা ছিল সেখানে আমি এখন আরেকটি দেশকে নিজের দেশ বানিয়েছি। অস্ট্রেলিয়া সরকার আমাকে নাগরিকত্ব দিয়েছে। আমার সবটুকু পরিশ্রম চিন্তা–চেতনা আমার বর্তমান দেশকে নিয়েই। আমার নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করায় আমি সংশ্লিষ্টদের ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। তবে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি যোগদান করব না।’
‘আমি চাই এরপর যে সরকার আসুক না কেন কোনো প্রকার চাকরিতে যেন আমার মতো কাউকে বঞ্চিত করা না হয়। দেশের সেবা করার যে স্পিরিট সেটি যেন নষ্ট করে দেওয়া না হয়।’— বলেন শোভন।
বঞ্চনার কারণ জানতে চাইলে শোভন আরও বলেন, ‘আমি হাসিনা সরকারের রাজনীতির প্রতিহিংসার শিকার হয়েছি। গোয়ন্দাদের কাছে তথ্য পাওয়ার পর আমি রাঙামাটি সংসদ সদস্য দীপংকর তালুকদারের কাছে যাই। কিন্তু দীপংকর তালুকদার আমাকে সহযোগিতা বা পথ দেখানোর পরিবর্তে অপমান করেন। আমাকে যে অপমান করেছে সেটা সেদিন উপস্থিত অনেকে দেখেছে। কুরুচিপূর্ণ বাক্য ব্যবহার করে সন্তু লারমার বাড়িতে পড়ে থাকতে পরামর্শ দিয়েছিলেন দীপংকর তালুকদার। আমি খুব অপমানিত হয়েছি।’
শোভন বলেন, ‘আমার বাবা জেএসএস রাজনীতি করেন। এটা ছিল আমার অপরাধ। অথচ আওয়ামী লীগ সরকার জেএসএসের সাথে সমঝোতায় এসে পার্বত্য চুক্তি করেছিল। চুক্তি মতে রাষ্ট্রীয় সুবিধা পেলে আমার পাওয়ার কথা। সেখানে আমাকে বঞ্চিত করা হলো। আমার বাবা কোনো রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত ছিল না।’
‘হাসিনা সরকার আমাকে নিয়োগ দিলে আমি হয়তো তার বিরোধী হতাম না বরং অনুগত্য হতাম। আমার মতো আরও ২৫৯ জনকে বিরোধী পক্ষ বানিয়েছিল হাসিনা সরকার। অথচ এদেরকে ঘিরে আজ হাজার হাজার হাসিনার বিরোধী পক্ষ তৈরি হয়েছে। কারণ আমাদের সাথে অন্যায় করা হয়েছে। আমাদের মেধা ও শ্রমের অবমূল্যায়ন করেছে হাসিনা সরকার।’— বলেন শোভন।
শোভন চাকমা ২০০৪ সালে জুরাছড়ি ভুবনজয় সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম অমরগণী এমইএস কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ২০১১ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লোকপ্রশাসন বিভাগে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।২০১৬ সালে ৩৪তম বিসিএসের সহকারী পুলিশ সুপার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। কিন্তু চূড়ান্ত গেজেটে নাম আসেনি তাঁর। যদিও গত ১৪ আগষ্ট, ২০২৪ এ প্রকাশিত এক গেজেটে তাঁর নাম আসে। কিন্তু তিনি যোগদান করবেন না। জনসংহতি সমিতির রাজনীতিতে যুক্ত বাবার এই ছেলে এখন অষ্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমিয়েছেন। ভিন্নমতকে দমনের এটি একটি রাষ্ট্রীয় কৌশল বলে মনে করছেন অনেকেই।


