জাতীয়

কোনকিছুই রাজনীতির বাইরে নয়, রাজনৈতিক জ্ঞান রেখেই তরুণদেরকে পথ চলতে হবেঃ ঢাবিতে ঊষাতন তালুকদার

অংসুয়ে মারমা: কোনকিছুই রাজনীতির বাইরে নয়, তাই আমাদের রাজনৈতিক জ্ঞান রাখতে হবে। রাজনৈতিক সচেতন হতে হবে এবং বিশ্বের নানান ঘটনাবলির খোঁজ রেখে চলতে হবে। গতকাল ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩ রোজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিএসসি অডিটোরিয়ামে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, ঢাকা মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত নবীন বরণ ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় প্রধান অতিথি’র বক্তব্যে একথা বলছিলেন জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও সাবেক সাংসদ ঊষাতন তালুকদার। “জুম তরুণের শেকড়ের প্রাণ, চেতনার আকুতিতে দাও শাণ” প্রতিপাদ্য নিয়ে ঢাকাস্থ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, পলিটেকনিক, নার্সিং এর ভর্তিকৃত ২০২১-২২ ও ২০২২-২৩ সেশনের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নবীণ বরণ ও সাংস্কৃতিক প্রোগ্রাম অনুষ্ঠিত হয়।

পিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক জগদীশ চাকমার সঞ্চালনা এবং সংগঠনটির সভাপতি রেং ইয়ং ম্রোর সভাপতিত্বে উক্ত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ২৯৯ নং পার্বত্য রাঙ্গামাটি আসনের সাবেক সাংসদ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ঊষাতন তালুকদার। এছাড়াও সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক তথ্য কমিশনার ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জগন্নাথ হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা, ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. ঈশানী চক্রবর্তী, পালি ও বুড্ডিস্ট স্টাডিস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জ্যোতিস্বী চাকমা এবং পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নিপন ত্রিপুরা প্রমুখ।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম লিটারেচার ও কালচারাল সোসাইটি’র শিল্পীদের জাতীয় সংগীত ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের দলীয় সংগীত পরিবেশণের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শুরু হয় ।

সাংস্কৃতিক আয়োজনে অংশ নেয়া শিল্পীদের ত্রিপুরা নৃত্য।

এরপর স্বাগত বক্তব্য রাখেন পিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার সহ-সভাপতি ছাত্রনেতা সতেজ চাকমা। স্বাগত বক্তব্যে তিনি বলেন, জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠিত হয়। পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপটেও আছে একটি নির্মম গণহত্যার কাহিনী। মূলত ১৯৮৯ সালের ৪মে লংগদু গণহত্যার প্রতিবাদে পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের সংগঠিত করে পিসিপি প্রতিষ্ঠিত হয়।আমরা দেখেছি পাহাড়ে দীর্ঘ দুই দশকের অধিক সশস্ত্র লড়াইয়ের পর পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ১৯৯৭ সালে। কিন্তু সেই চুক্তি এখনে বাস্তবায়িত হয়নি। তাই আজকের নবীন জুম্ম তরুণদেরকে শিক্ষিত হয়ে শেকড়ের বাস্তাতবতাকে অনুধাবন করে নিজেদের দায়কে বুঝে নিতে হবে। পাশাপাশি তিনি জগন্নাথ হলের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সিট সংকটের কথা প্রাধ্যক্ষের কাছে তুলে ধরেন এবং ১০ তলা বিশিষ্ট নতুন নির্মিত রবীন্দ্র ভবনে জুম্ম শিক্ষার্থীদের জন্য অন্তত ২০ টি কক্ষ বরাদ্দ দেওয়ার অনুরোধও জানান।

এদিকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঊষাতন তালুকদার আরো বলেন, পাহাড়ের মানুষের জীবনের অনিরাপত্তা, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সহ নানান কঠিন বাস্তবতায় আমাদের খাপ খাইয়ে নিতে হবে। তরুণদের নিজ নিজ যোগ্যতা অর্জন করে মাথা উচু করে দাড়িয়ে সমাজ ও জাতির প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। তরুণদের নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে, সাহসী ভুমিকা পালন করতে হবে।

নৃত্য পরিবেশনায় ঢাবি জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের দুই শিল্পী।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পিসিপি কেন্দ্রীয় কমিটির সংগ্রামী সভাপতি নিপন ত্রিপুরা ৫ দশকের অধিক সামরিক শাসন এবং শত বাধা-বিপত্তি ও বঞ্চনা পেরিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হওয়া আদিবাসী শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানান এবং এম এন লারমার উক্তি “শিক্ষিত হও, গ্রামে ফিরে চলো” মতো পাহাড়ের তরুণ সমাজকে শিক্ষিত হয়ে নিজেদের শেকড় পাহাড়ের জন্য এগিয়ে আসার আহবান জানান।
তিনি বলেন, পাহাড়ের তরুণদের শুধুমাত্র পাঠ্যপুস্তকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবেনা। বরং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা ও মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ঘটিয়ে অন্যায়, অবিচার, শোষণ-নিপীরণ ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হতে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করতে হবে এবং সাহসী পদক্ষেপ নিতে হবে। ”

বক্তব্যে তিনি জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রামেন্দু শেখর দেওয়ানের অবদান উল্লেখ করে বলেন, তিনি (রামেন্দ্র শেখর দেওয়ান) পাহাড়ের মানুষেরআত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেকে উৎসর্গ করে গেছেন। পাহাড়ের তরুণ সমাজকেও নিজেদের শেকড়কে না ভুলে দেশ ও জাতির কল্যাণে এগিয়ে আসতে হবে।

গান পরিবেশন করছেন ঢাবি’র জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের দুই শিল্পী।

বিশেষ অতিথি’র বক্তব্যে ঢাবি’র পালি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জ্যোতিস্বী চাকমা বলেন,”পাহাড়ের তরুণদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভালো মানুষ হতে হবে। স্মার্ট হতে হবে৷ স্মার্টনেস মানে পোশাকের স্মার্টনেস নয়, বরং বাস্তব জীবনে যে যত বেশি সমস্যা সমাধান করতে পারবে ততবেশি স্মার্ট। এজন্য পাহাড়ের বাস্তবতায় আমাদের চিন্তা, মনন ও কাজে পাহাড়ী তরুণ সমাজকে স্মার্ট হতে হবে এবং নিজের চিন্তায় শুধু মগ্ন না থেকে অপরকে সহযোগিতার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।”

ড. ঈশানী চক্রবর্তী বলেন নবীনদের নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। এ সময়টা তোমাদের সারাজীবন মনে থাকবে। আমরাও খুব খুশী যে, তোমাদের স্মৃতির অংশীদার হলাম। শত বাধা পেরিয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে। এ যাত্রায় মিশ্র অনুভুতি থাকে। সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিবেশে থাকে ভয়, চ্যালেন্জ, নতুন অভিজ্ঞতা। সেগুলো শঙ্কা তৈরি করলেও অপার আনন্দও বটে। আনন্দ হলো স্বাধীনতা। পরিবারের নানান শৃঙ্খলা পেরিয়ে নিজের মত চলা, একলা চলার জন্য প্রস্তুতির সময় এ বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। এখানে অপার স্বাধীনতা আছে৷ নিজের দায়িত্ব নিজেকে নিতে হবে। ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টা থাকতে হবে। সফ্ট স্কিলের সাথে পরিচিত হতে হবে। টেকনলজি জ্ঞান রাখতে হবে এবং বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলার এ যুক্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। প্রতিষ্ঠান যে সুযোগ দিবে সেগুলো কাজে লাগাবে। এবং চোখ ভরা স্বপ্ন, বুক ভরা আকাঙ্খা থাকবে হবে তবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে নিজ নিজ জাতিদের জন্য অবশ্যই ভাবতে হবে, নিজেদের দায়িত্ববোধ যেন ভুলে না যায়।”

ড. মিহির লাল সাহা নিজেকে জগন্নাথ হলের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের পরিচয় দিয়ে বলেন, প্রিয় শিক্ষার্থীদের যেকোন সমস্যা সমাধানে তিনি সর্বদা পাশে থাকবেন এবং নবনির্মিত রবীন্দ্র ভবনে আদিবাসী শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সিট বরাদ্দের মাধ্যমে জুম্ম শিক্ষার্থীদের আবাসন সংকট নিরসনের প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে অধ্যয়ন করে সুন্দর ফুল হতে হবে। এমন ফুল হওয়া যাবেনা যেখানে কেউ কাছে যায় না, সবাই এড়িয়ে যায়। তার পাশাপাশি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের যেকোন পরিবেশে টিকে থাকার মানসিকতা রেখে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন এই শিক্ষক।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে ড. সাদেকা হালিম বলেন, পাহাড়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানের দেয়া প্রত্যেকটি সুযোগের সদ্যবহার করতে হবে। প্রত্যেক মানুষের তাঁর নিজের আত্মপরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে এবং আদিবাসীরা যেন তাঁদের নিজ নিজ আত্মপরিচয় মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে তার মানসিকতাও থাকতে হবে। আদিবাসী শিক্ষার্থীদের একাডেমিক শিক্ষার পাশাপাশি বন, ভুমি, নারীর প্রতি বৈষম্য বিলোপ সনদ বিষয়ক জ্ঞান জানা হবে এবং রাজনৈতিকভাবে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যে সলিডারিটি বাড়াতে হবে। অধিকতর পিছিয়ে পড়া ম্রো, খিয়াং,বম,চাক,লুসাইদের সুযোগ দিতে হবে।

সভাপতি বক্তব্যে ছাত্রনেতা রেং ইয়ং ম্রে বলেন, নবীনদেরকে পাহাড়ের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার নিয়ে সচেতন হতে হবে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার লাভের একটা অংশ পার্বত্য চুক্তি। তিনি নবীণদের পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনের জন্য এগিয়ে আসা এবং শিক্ষিত হয়ে পাহাড়ের শেকড়ের প্রতি তরুণ সমাজের ঐতিহাসিক দায়িত্ব সেটি পালন করার আহবানও জানান আদিবাসীদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে এবং নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যে যার অবস্থান থেকে এগিয়ে এসে সংগ্রাম করতে হবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও সাবেক সাংসদ ঊষাতন তালুকদারের কাছ থেকে অভিনন্দন পত্র গ্রহন করছেন প্রথম বর্ষের নেবাই খুমি এবং ক্রাইনুচিং মারমা।

উক্ত অোয়োজনে নবীণদের উদ্দেশ্যে মানপত্র পাঠ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩য় বর্ষের শিক্ষার্থী অর্পা খীসা। বক্তাদের নির্ধারিত বক্তব্য শেষে ২০২১-২২ এবং ২০২২-২৩ সেশনের শিক্ষার্থীদের ক্রেস্ট ও ফুল দিয়ে নবীণ বরণের শুভেচ্ছা জানানো হয়। এছাড়াও নবীণদের পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২১-২২ সেশনের ক্রইনুচিং মারমা এবং ২০২২-২৩ সেশনের নেবাই খুমী সামথাং।

এরপর সাংস্কৃতিক পর্বে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ঐতিহ্য চাকমা ও তৃতীয় বর্ষের জয়া চাকমার সঞ্চালনায় সাংস্কৃতিক পর্বে অংশ নেয় নবীণ শিক্ষার্থী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম লিটারেচার ও কালচারাল সোসাইটির সদস্যবৃন্দ। জমকালো সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রোগ্রামটি সমাপ্ত হয় এবং এতে ঢাকা শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নতুন ভর্তি হওয়া প্রায় ২০০ নবীন শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন।

Back to top button