এম এন লারমার ৮৪ তম জন্মবার্ষিকীকে আদিবাসী ছাত্র যুবদের আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত

মেহনতি ও গণমানুষের নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য বিপ্লবী মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এমএন লারমা)’র ৮৪তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আদিবাসী ছাত্র ও যুব সংগঠনসমূহের উদ্যোগে আজ ১৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ঢাকার বাংলামটরের বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আলোচনা সভায় আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ড. জোবাইদা নাসরীন, লেখক ও সাংবাদিক নজরুল কবীর, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক হরেন্দ্রনাথ সিং, বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং পরিবেশ বার্তার সম্পাদক ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল,বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি অতুলন দাস,হিল উইমেন্স ফেডারেশন ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক রিয়া চাকমা এবং পার্বত্য চট্রগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ সাধারণ সম্পাদক রুমেন চাকমা প্রমুখ।
পার্বত্য চট্রগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক জগদীশ চাকমার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি অনন্ত বিকাশ ধামাই।
আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক চ্যং ইয়ং ম্রো ।
আলোচনা সভায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র জীবন সংগ্রাম নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সাবেক সভাপতি ছাত্রনেতা সুলভ চাকমা বলেন, “বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যদিও একটি অনুচ্চারিত নাম। কিন্তু তার লড়াই সংগ্রাম ও জীবনাদর্শ বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব তিনি সকল শোষিত, নিপীড়িত ও মেহনতি মানুষের অধিকারের কথা বলিষ্ঠ ভাবে উচ্চারণ করেছিলেন। এমনকি উনার পিতা, পিতামহ ও পরিবারের সদস্যরা পার্বত্য চট্রগ্রামের জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য লড়াই সংগ্রাম করেছিলেন, আত্মত্যাগ করেছিলেন। একজন প্রাজ্ঞ সংসদ সদস্য হিসেবে সংবিধান রচনার সময় তিনি তার জ্ঞান, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা কিংবা যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে সংবিধানকে আরো বেশি গণমুখী ও জনবান্ধব করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।“
পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় নেতা দীপায়ন খীসা বলেন, ‘’মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবন মাত্র ৪৩ বছরের, এত সংক্ষিপ্ত পরিসরের একটা জীবন এতটা বর্ণাঢ্য হতে পারে সেটা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবন ব্যাতীত খুব একটা দেখা যায়না। তিনি ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত হয়েছেন। সমাজ বদলের জন্য মানুষকে সংগঠিত করেছেন। গণপরিষদে লড়েছেন। শেখ মুজিবুর রহমান, নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, ফণীভূষণ প্রমুখ ব্যক্তিদের সাথে সাথে লারমা সংসদে উজ্জ্বল হয়ে নিজস্বতার ছাপ রেখেছিলেন। লারমা নারীদের কথা চিন্তা করেছেন কিংবা এই আদর্শ লালন করে বলেই জুম পাহাড়ে নারী গেরিলা বাহিনী সৃষ্টী করতে সক্ষম হয়েছেন।
লেখক ও সাংবাদিক নজরুল কবীর বলেন, ‘’মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সমগ্র নিপীড়িত মানুষের মুক্তি চেয়েছিলেন। তিনি সকল মানুষের মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। যারা এই মুক্তির লড়াইকে থামিয়ে দিতে চেয়েছিলো তিনি তাদেরকে চিহ্নিত করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন। পার্বত্য চট্রগ্রাম চুক্তি কারোর দয়ার দান ছিলোনা। অনেক জুম্ম জনগণের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই চুক্তি। আর এই আন্দোলন তথা জুম্ম জাতির লড়াই শুরু করেছিলেন এম এন লারমা। চিন্তা ও দর্শনে অনেক এগিয়ে ছিলেন এম এন লারমা। তিনি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার জন্য রাজনীতি করেছিলেন। ভোগবাদী সমাজের বিরুদ্ধে আজীবন লড়াই করেছিলেন।
তিনি একজন সাংসদ হিসেবে বাংলাদেশ বিনির্মাণে সাম্রাজ্যবাদী, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে তৎকালীন সংসদে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন।
আদিবাসী ছাত্র-যুবদেরকে এম এন লারমা’র এই জীবনাদর্শকে অবশ্যই পড়াশোনা করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ডঃ জোবাইদা নাসরিন কণা বলেন, “তিনি কেবল জুম্ম জনগণের সংগ্রামের প্রতীকই নয়, তিনি এই ভূ-খণ্ডের অধিকার বঞ্চিত সকল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিজেকে নিবেদিত করেছিলেন। এম এন লারমা কর্মজীবনের শুরুতে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেঁছে নিয়েছিলেন। সাধারণ জনগণের নিকট আন্দোলনের বীজ রোপণ করেছিলেন।“
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কেন্দ্রীয় ছাত্র ও যুব বিষয়ক সম্পাদক হরেন্দ্রনাথ সিং বলেন, ’’ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা খুবই মৌলিক একটি প্রশ্ন তুলে ধরেছিলেন। যদিও তাঁর জন্ম হয়েছিলো আদিবাসী অঞ্চলে কিন্তু তিনি সকলের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ছিলেন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার আদর্শকে লালন করার মধ্য দিয়ে আমরা অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাব।
বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ উজ্জ্বল বলেন, ’’মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে কেবল জুম্ম জনগণের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হলে সেটা প্রকৃতপক্ষে তাঁর অবদানকে খাটো করা হয়। তিনি প্রকৃতপক্ষে এই অঞ্চলের একজন বিশ্বমানের নেতা। এম এন লারমার জীবনদর্শনকে সর্বক্ষেত্রে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা থাকতে হবে।
বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী’র সভাপতি অতুলন দাস বলেন, “সাধারণভাবে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাকে কেবল জুম্ম জনগণের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রকৃতপক্ষে একজন জাতীয় নেতা ছিলেন। যে ক’জন ব্যক্তির চিন্তাধারা ও জীবন ব্যক্তিগতভাবে আমাকে অনেক বেশী অনুপ্রাণিত করে তাঁর মধ্যে এম এন লারমা একজন। এম এন লারমা সাম্যের পক্ষে লড়াই করেছেন। সকলের জন্য সংগ্রাম করেছেন।“
পার্বত্য চট্রগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ সাধারণ সম্পাদক রুমেন চাকমা বলেন, “মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সংগ্রাম ছিল প্রগতির পক্ষে। তিনি সামন্তীয় নেতৃত্বের অধীন অথর্ব হয়ে থাকা সমাজকে জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হন। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সমগ্র জীবনটাই আত্মত্যাগের যা থেকে অধিকারকামী তরুণরা আজও প্রেরণা নেয়।“
হিল উইমেন্স ফেডারেশন ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক রিয়া চাকমা বলেন, “মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা একটি আলোক-প্রদীপ। তিনি পার্বত্য চট্রগ্রামে শিক্ষা আন্দোলনের অগ্রদূত ছিলেন । তিনি জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংসদে কথা বলেছিলেন। তিনি নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় সোচ্চার ছিলেন।“
আলোচনা সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের দপ্তর সম্পাদক নিটোল চাকমা, আদিবাসী যুব ফোরামের সাংগঠনিক সম্পাদক টনি চিরান, পার্বত্য চট্রগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি নিপন ত্রিপুরা ও বিভিন্ন আদিবাসী ছাত্র-যুব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।


