৫০ পেরোলো জনসংহতি সমিতিঃ দলটির ৫১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে যা বলছেন বিশিষ্টজনরা
বিশেষ প্রতিবেদনঃ আজ ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গঠিত রাজনৈতিক সংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’র ৫১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ সংগঠনের নেতৃত্বেই শুরু হয় জুম্ম জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা তথা স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন। দীর্ঘ ২৪ বছরের লড়াই সংগ্রামের পর জনসংহতি সমিতির সাথে বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রতিনিয়ত জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ে সচেষ্ট এই সংগঠন গত ৫০ বছর ধরে পাহাড়ের মানুষের মনে অনন্য এক জায়গা করে নিয়েছে। সুদীর্ঘ ৫০ বছরের লড়াই সংগ্রামে দলটিকে পেরোতে হয়েছে নানা চড়াই-উৎরাই। উত্তাল আশির দশকে দলটি পড়েছে ভাঙ্গনের মুখে। দেশি-বিদেশি চক্রান্তে ও ষড়যন্ত্রে শহীদ হতে হয় দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’কে। দলের ভেতর থেকেই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত গিরি-প্রকাশ-দেবেন-পলাশ চক্রের অশুভ প্রয়াসে আট সহযোদ্ধাকে নিয়ে ১৯৮৩ সালের ১০ নভেম্বর শহীদ হন এই নেতা। পরে বাঁধে গৃহযুদ্ধ। এতে নেতৃত্বের হাল ধরেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র ছোটভাই জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয়(সন্তু) লারমা। তিনিই এখনো নেতৃত্ব দিচ্ছেন ৫০ পেরোনো এই দলটিকে। বিভিন্ন সরকারের সাথে ধারাবাহিক ২৬ বার বৈঠকের পর ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিরও অন্যতম স্বাক্ষরদাতা তিনি। এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়েই দলটি সশস্ত্র আন্দোলন থেকে নিয়মতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসে। এদিকে বহুল আলোচিত এক এগারোর সময় পুনরায় ভাঙ্গনের মুখে পড়ে দলটি। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও এখনো জনসংহতি সমিতিই পাহাড়ের জুম্ম জনগণের আশা আকাঙ্খার প্রতীক হয়ে পথ চলছে।

এদিকে জনসংহতি সমিতির লড়াইয়ের ৫০ বছরে অন্যতম অর্জন হিসেবে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরে সরকারকে বাধ্য করা। যদিওবা এই চুক্তি স্বাক্ষরের ২৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তার মৌলিক বিষয়গুলো এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে জনসংহতি সমিতিকে এখনো পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের সংগ্রাম করতে হচ্ছে । এই আন্দোলনেও দলটিকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে নানা প্রতিকূলতা। শাসকগোষ্ঠীর ক্রমাগত মিথ্যা মামলা, হামলা, ধরপাকর সহ নানা কারণে এলাকাছাড়া ও আত্মগোপনে আছেন শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই। এমনি বাস্তবতায় দলটি পালন করছে তার প্রতিষ্ঠার ৫১ বছর। এদিকে আইপিনিউজ এর সাথে একান্ত আলাপনে ৫১তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে জনসংহতি সমিতিকে নানাভাবে মূল্যায়ন করেছেন বিশিষ্ট জনরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ড. মেসবাহ কামাল আইপিনিউজকে বলেন, ‘জনসংহতি সমিতি পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের শুধু নয়, পুরো দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার জন্য একটি অগ্রণী সংগঠন। আমাদের রাজনীতিতে যখন আদর্শ চ্যুতির মহোৎসব চলছে, সে সময়ে আদর্শভিত্তিক একটি রাজনৈতিক সংগঠন হয়ে পথ চলেছে জনসংহতি সমিতি।’
তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ বহু জাতির মানুষের দেশ। একটি গণতান্ত্রিক দেশ করার জন্য সকল জাতির সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। সকল ধর্মের মানুষের সমান অধিকার প্রয়োজন। সকল ভাষার মানুষের সমান অধিকার প্রয়োজন। এই বাস্তব সত্যের প্রতি জনসংহতি সমিতি গোটা রাষ্ট্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে জনসংহতি সমিতি তার জন্ম লগ্ন থেকেই নিয়োজিত। তবে এই পথ চলা সহজ ছিল না উল্লেখ করে এই আদিবাসী গবেষক আরো বলেন, জনসংহতি সমিতিকে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে, রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং আমাদের রাষ্ট্রনেতাদের অনেকের একপেশে এবং কর্তৃত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গি তার কারণ। সারা বাংলাদেশের মুক্তমনা মানুষদের, প্রগতিশীল মানুষদের জনসংহতি সমিতির পাশে দাঁড়ানো উচিত বলেও মনে করেন ড. মেসবাহ কামাল।
বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ মুঠোআলাপে আইপিনিউজকে বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহৃতি সমিতি প্রতিষ্ঠার ৫০ বছর পূর্তি হচ্ছে। একটি সংগঠনের জন্য ৫০ বছর কম সময় নয় আবার বেশি সময়ও নয়। এটি নির্ভর করে সংগঠনের অর্জন কি হয়েছে তার ওপর। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণ করেছে। এক ধরনের আশাভঙ্গের কারণ থেকেই এই সংগঠনের জন্ম হয়েছে।’

মহিউদ্দিন আহমেদ আরো বলেন, ‘আমি যতদূর জানি, জন্মের পর তাদের যে প্রধান লক্ষ্য ছিল সেটা হচ্ছে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনধারা এগুলো সংরক্ষণ করা। নিরাপদে সম্মান নিয়ে এদেশের নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য একটি সাংবিধানিক সুরক্ষার দাবি নিয়েই এই সংগঠনের পথচলা। কিন্তু তারা সেটি এখনো সেটি পায়নি। এর পরবর্তীতে এর সাথে আরো অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘তাদের প্রধান দাবিটি ছিল বাংলাদেশের সংবিধানের অধীনে এক ধরনের স্বায়ত্তশাসন অথবা সাংবিধানিক গ্যারান্টি। যেখানে তারা তাদের নৃতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যগুলো নিয়ে বেড়ে উঠবে। অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সাথে এক ধরনের মিত্রতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে। কিন্তু সেটি হয়নি এবং এর পরবর্তীতে আমরা দেখেছি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি সশস্ত্রধারায় গেছে এবং প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। যুদ্ধ মানেই তো ধ্বংস। পার্বত্য চট্টগ্রামের পুরো বিষয়টা নিয়ে জনসংহতি সমিতি পর্যালোচনামূলক মূল্যায়ন করে একটা দিক-নির্দেশনা দিতে পারে। মনে রাখতে হবে এটা কিন্তু শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা না, সমস্যাটা পুরো দেশের।’
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘আমি খুব খুশি এবং আনন্দিত যে, পাহাড়ি এবং আদিবাসী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি সংগঠন ৫০ বছর পেরিয়ে এখনো সক্রিয় রয়েছে। একটি পাহাড়ি এবং আদিবাসী সংগঠনকে আমাদের দেশে অনেক কঠিন লড়াই করতে হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের চাপ এবং বিভিন্ন ধরনের প্রতিকূলতা ও বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে টিকে থাকতে হয়। জনসংহতি সমিতি ৫০ বছর পেরিয়ে এখনো সক্রিয় রয়েছে এবং নিপীড়িত মানুষের কথা বলছে সেটি হচ্ছে অনেক বড় ব্যাপার।

তিনি বলেন, ‘জনসংহতি সমিতির আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে যারা প্রাণ উৎসর্গ করেছেন আমি তাদের স্মরণ করছি। এখনো যারা কাজ করছেন এবং এখনো যারা লড়াই সংগ্রামে আছেন তাদেরকে আমি অভিনন্দন জানাই। মানুষেরভালোবাসা ও শুভেচ্ছা নিয়ে ৫০ পেরিয়ে সংগঠনটি যেন শত বছরের দিকে ধাবিত হয়। জনসংহতি সমিতির নেতৃবৃন্দের সবচেয়ে বড় গুণ ছিল তাদের মানুষের প্রতি ভালোবাসার গুণ। মানুষের প্রতি ভালোবাসা, এটিই তাদের বড় সবচেয়ে বড় শক্তি এবং তাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। শাসক গোষ্ঠী এখনো এই চুক্তি পূর্ণাঙ্গ রূপে বাস্তবায়ন করেনি, তাই এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য,পাহাড়ি এবং আদিবাসী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য, বঞ্চিত পাহাড়ি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য, আগামী দিনের পাহাড়ি তরুণ-শিশুদের স্বপ্ন রচনার জন্য এই সংগঠনকে কাজ করতে হবে। এই সংগঠনকে অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে।’

বান্দরবান বন-ভূমি রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি জুমলিয়ান আমলাই বম আইপিনিউজকে বলেন, ‘জনসংহতি সমিতির ৫০ বছর পূর্তি হলো। তারা যে নীতি আদর্শ নিয়ে আছে তা অব্যাহত রাখতে হবে। মাঝখানে অনেক কঠিন সময় পার করলেও তারা এখন পর্যন্ত টিকে আছে। অনেক বছর আগে আমিও এই সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলাম। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগণের জন্য, তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তারা লড়াই করে যাচ্ছে। তাদের লড়াই এখনো অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখবে বলে আমি আশা করি।’
এদিকে পাহাড়ের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. মং সানু চৌধুরী বলেন, ‘যে উদ্দেশ্য লক্ষ্য নিয়ে জেএসএস প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, সেই লক্ষ্য উদ্দেশ্য এখনো অর্জন করতে পারেনি। যদিও ৯৭ সালে যে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার ফলে কিছু অর্জিত হয়েছে। কিন্তু আপামর জনসাধারণের যে দাবি এবং শুরুতে যে দাবিগুলো নিয়ে জেএসএস প্রতিষ্ঠা হয়েছিল তার অনেক কিছুই এখনো পূরণ হয়নি।’
বান্দরবানের মানবাধিকার কর্মী লেলুং খুমি বলেন, ‘জেএসএসের যে রাজনৈতিক মতাদর্শ, নীতি, দর্শন, অস্তিত্বের আন্দোলন , সব কিছুর সাথে আমি একমত। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশের আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে কথা বলা, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার , বেঁচে থাকার অধিকার , মানবাধিকার রক্ষা করা থেকে শুরু করে জে এসএস যে অবদান রেখে চলছে তা অতুলনীয়। সংগঠনটি রাজনৈতিকভাবে হোক, বিভিন্ন ধরণের মানবাধিকার আন্দোলনের মাধ্যমে হোক প্রতিবাদ অব্যাহত রেখেছে। জেএসএস নেতৃবৃন্দ স্থানীয়, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের আদিবাসী অস্তিত্ব অধিকার আন্দোলনে যে ভূমিকা রাখছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। সেই ৭০ এর দশক থেকে, এমনকি এখন পর্যন্ত আদিবাসীদের বর্তমান যে অবস্থা আছে এটা আদৌ এই অবস্থা থাকতো কিনা সন্দেহ। জেএসএস এর ৫০তম বর্ষপূর্তিতে আমি সংহতি জানাই এবং রাজনৈতিক যে মতাদর্শ এবং আদিবাসী অধিকার আন্দোলনে যে ধারাবাহিকতা এবং প্রচেষ্টা তা অব্যাহত থাকুক এই কামনা করি।
উল্লেখ্য, মহান বিপ্লবী নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা ও প্রগতিশীল সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটিতে গঠন করা হয় এই জনসংহতি সমিতি। সেই থেকে সংগঠনটি এখন পর্যন্ত জনগণের অস্তিত্ব রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে এই সংগঠনটি। বিরেন্দ্র কিশোর রোয়ািজা ছিলেন এই সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি এবং সাবেক সাংসদ ও জুম্ম জনগণের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে এই সংগঠনটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন প্রণতি বিকাশ চাকমা।


