মানবেন্দ্র নারায়ন লারমার সংগ্রাম এখনও শেষ হয়ে যায়নিঃ জিকো চাকমা

আসছে ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫২ বছর পূর্ণ হবে। স্বাধীনতার ৫২ বছরের ইতিহাসে অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়েছে এ দেশের। কখনো গণতান্ত্রিক উপায়ে আবার কখনো রক্তাক্ত সেনা অভ্যুত্থানের মধ্যে দিয়ে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। এই ৫২ বছর ধরে যারা এদেশকে শাসন করে গেছেন, কোনো শাসকই প্রকৃতপক্ষে এদেশের সাধারণ মানুষের বেঁচে থাকার নূন্যতম অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে দেয়নি। বিপরীতে ক্ষমতাবানরা হয়েছে আরো অধিকতর ক্ষমতাশালী এবং গরীবরা হয়েছে আরো গরীব। নিজেদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে দেশের সংবিধানকে কাঁটাছেড়া করেছে অসংখ্যবার। রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সব দলই তাদের প্রয়োজনে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে বিভিন্ন সময়ে। যার ফলে সন্ত্রাস, দূর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের হীন তৎপরতা এদেশ থেকে দূর করা যায়নি। স্বাধীনতার ৫২ বছর অতিক্রান্ত হতে চললেও এদেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তি আসেনি, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। ঠিক এই সময়টাতে এদেশের সাধারণ মানুষগুলোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে, দেশ থেকে সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, দূর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের হীন তৎপরতাকে রুখে দিতে জুম জনপদের প্রিয় নেতা তথা অসাম্প্রদায়িক, গনতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল ব্যক্তিত্ব মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার লড়াই ও সংগ্রামকে পাঠ করা, তার আদর্শকে ধারণ করে সামনে এগিয়ে যাওয়া এদেশের তরুণ প্রজন্মের একটা কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা। ডাক নাম ছিল মঞ্জু। ১৯৩৯ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার নানিয়ারচর থানার মহাপুরম গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৬০ এর দশকে পাকিস্তান সরকার কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করার উদ্যোগ নিলে তরুণ লারমা জুম্ম জনগণের ভিটেমাটি ডুবিয়ে দিয়ে তাদের উচ্ছেদ করার রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হতে হয় তাকে। পরবর্তীতে গণপরিষদের সদস্য ও স্বাধীন বাংলাদেশে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিপীড়িত জুম্ম জনগণের মুক্তির লক্ষ্যে গড়ে তুলেছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ঘুনে ধরা সমাজ ব্যবস্থার প্রচলিত সকল ধ্যান-ধারণাকে বদলে দিয়ে সমাজে প্রগতিশীল দর্শনের সফল অনুশীলনে তিনি ছিলেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ব্যক্তি হিসেবে এদেশের ক্ষুদ্র একটা জাতিগোষ্ঠীর বংশোদ্ভূত ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি কখনো জাতিগত সংকীর্ণ পরিসরে আবদ্ধ থাকেননি। ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবরে খসড়া সংবিধানের ওপর কথা বলতে গিয়ে এম এন লারমা একাই সেদিন লড়াই করে গিয়েছিলেন। তরুণ আওয়ামী লীগের এমপিরা সেদিন তার প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে তাকে উপহাসও করেছিলেন চরমভাবে। কথা বলতে গিয়ে বার বার বাঁধার সম্মুখীন হয়েছিলেন। সংসদে কথার খেই হারিয়ে ফেলছিলেন বার বার।তবুও তিনি থামেননি। জাত্যভিমান, দাম্ভিকতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদী চিন্তায় ভরপুর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের তৎকালীন তরুণ এমপিরা এম এন লারমার সমস্ত যৌক্তিক আবেদন নিবেদনকে সেদিন প্রত্যাখান করেছিল। এটা ছিল তার ভয়ঙ্কর একটা অভিজ্ঞতা। সংবিধানে এদেশের আদিবাসীদের ওপর বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে তিনি সেদিন প্রতিবাদ করেছিলেন। বলেছিলেন, “বাংলাদেশের নাগরিকত্বের যে সংজ্ঞা তা ভালোভাবে বিবেচনা করে যথোপযুক্তভাবে গ্রহণ করা উচিত। আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বসবাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙালিদের সঙ্গে লেখাপড়া শিখে আসছে। বাংলাদেশের সাথে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ-দাদা, চৌদ্দপুরুষ কেউ বলে নাই- আমি বাঙালি। আমার সদস্য-সদস্যা ভাইবোনদের কাছে আমার আবেদন, আমি জানি না, আজ আমাদের এই সংবিধানে আমাদেরকে কেন বাঙালি হিসেবে পরিচিত করতে চায়।”
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সংসদীয় জীবনে সাংসদ হিসেবে যে প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা, দেশপ্রেম, সততা, গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক নীতি-আদর্শের প্রতিফলন দেখিয়েছিলেন, সেটা বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। তার প্রত্যেকটা বক্তব্য আজোও অনেক প্রাসঙ্গিক। ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর খসড়া সংবিধানের ওপর সামগ্রিক আলোচনায় তিনি বলেছিলেন, “আমার বিবেক, আমার মনের অভিব্যক্তি বলছে, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের মনের কথা পুরোপুরি এই খসড়া সংবিধানে নাই। আজ আমি দেখতে পাচ্ছি পদ্মা, মেঘনা, ধলেশ্বরী, বুড়িগঙ্গা, মাথাভাঙ্গা, শঙ্খ, মাতামুহুরি, কর্ণফুলী, যমুনা, কুশিয়ারা প্রভৃতি নদীতে রোদ-বৃষ্টি মাথায় করে যারা দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বৎসরের পর বৎসর ধরে নিজেদের জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে নৌকা বেয়ে, দাড় টেনে চলেছেন, রোদ বৃষ্টি মাথায় করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যারা শক্ত মাটি চষে সোনার ফসল ফলিয়ে চলেছেন, তাদেরই মনের কথা এ সংবিধানে লেখা হয়নি। আজকে যারা রাস্তায় রাস্তায় রিক্সা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করে চলেছেন, তাদের মনের কথা এই সংবিধানে লেখা হয়নি।” সত্যিকার অর্থে আজও এই কৃষক শ্রমিক, জেলে মাঝি মাল্লাদের অধিকার এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মুক্তি আসেনি।
একদা সামন্তীয় জুম্ম সমাজে নারীকে পুরুষের ভোগ্যবস্তু, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ও পারিবারিক দাসী ছাড়া অন্য কিছু ভাবা হতো না। অপরদিকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী সম্প্রসারণবাদের উদ্দেশ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার সেনা সমাবেশ, একি সাথে লক্ষ লক্ষ বাঙালি মুসলমানদের এখানে পূনর্বাসন, সাথে তাদের দ্বারা জুম্ম জনগণের ওপর অত্যাচার, নিপীড়ন, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরকরণ এইসব শ্বেত সন্ত্রাসের অন্যতম শিকার ছিল জুম্ম নারী সমাজ। সেনাবাহিনী ও অনুপ্রবেশকারী বাঙালি মুসলমানরা জুম্ম নারীদের পাইকারিভাবে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, পথে-ঘাটে শ্লীলতাহানি, জোরপূর্বক বিবাহ ও অপহরণ নিত্যনৈমত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানে। গত ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩ তারিখে কাপ্তাইয়ে সেনাবাহিনীর ৬ সদস্য কর্তৃক এক জুম্ম ছাত্রীকে গণ ধর্ষণ ও খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলায় এক জুম্ম নারীকে সেটলার বাঙালি কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এটাই তার জ্বাজ্জল্য প্রমাণ। আজকের জুম্ম নারী সমাজের এমন ভবিষ্যৎ এম এন লারমা সেই ৫১ বছর আগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন। তাই তিনি সোচ্চার হয়েছিলেন তখন থেকেই।
পারিবারিক দাসত্ব ও পুরুষের চরম আধিপত্যর বিপরীতে জুম্ম নারী সমাজ তথা এদেশের সমগ্র নারীদের করুণ অবস্থা দেখে তিনি খুবই পীড়িত হতেন। সেকারণেই সংবিধান রচনাকালে তিনি বলেছিলেন, “সবচেয়ে দুঃখজনক হচ্ছে এই যে, আমাদের মা-বোনদের কথা এই সংবিধানে নাই। নারীর যে অধিকার সেটা সম্পূর্ণরুপে উপেক্ষিত। নারীকে যদি অধিকার দিতে হয়, তাহলে পুরুষরা যে অধিকার ভোগ করে, সে অধিকার নারীকেও দিতে হবে। আজ পল্লীর আনাচে-কানাচে আমাদের যে সমস্ত মা-বোনকে তাদের দেহ বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে, তাদের কথা এই সংবিধানে লেখা হয়নি। সেই মা-বোনদের জীবনের কোনো গ্যারান্টি দেওয়া হয়নি।” জুম্ম সমাজের সামন্তীয় শাসন শোষণ ও জাতীয় জীবনে ইসলামিক সম্প্রসারণবাদের শিকার জুম্ম নারীদের মধ্যে তিনিই সর্বপ্রথম এক দুর্দমনীয় সংগ্রামী শক্তি প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সেকারণেই ১৯৭৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি গঠনের মধ্যে দিয়ে জুম্ম নারী সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করেছিলেন।
বর্তমান বাংলাদেশকে নিয়ে তার যে স্বপ্ন ও আকাঙ্খা ছিল, সেটা ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর গণপরিষদে দাঁড়িয়ে সংবিধান বিলের ওপর বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন, “গণতন্ত্রের মাধ্যমে সমাজতন্ত্রের উত্তরণ হবে আমাদের জন্মভূমি বাংলাদেশে। আমাদের দেশে সমাজতন্ত্র হবে, দেশে অভাব থাকবে না, হাহাকার থাকবে না, মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ থাকবে না, হিংসা, দ্বেষ, বিদ্বেষ – কিছুই থাকবে না। শুধু থাকবে মানুষে মানুষে প্রেম, প্রীতি, মায়া, মমতা এবং তার দ্বারা এক নতুন সমাজ গড়ে উঠবে। মানবতার এই ইতিহাস থাকবে এবং তাতে লেখা থাকবে ‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার ওপর নাই’। আমি আজ কামনা করি, তাই হোক।”
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি কত গভীর ভালোবাসা ছিল সেটা ১৯৭৩ সালের ২৩ জুন জাতীয় সংসদে প্রতিরক্ষা ভাবনা নিয়ে রাখা তার বক্তব্য থেকেই সুস্পষ্ট বুঝা যায়। তিনি সেদিন গোটা তিনটা বাহিনীর (জল, স্থল ও আকাশ) জন্য ডিফেন্স বাজেট ৪৭ কোটি টাকার বদলে প্রত্যেক বাহিনীর জন্য ৪৮ কোটি করে বরাদ্দ চেয়েছিলেন। তিনি সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এবং সিভিল গভর্নমেন্টকে সাহায্য করার জন্য আমাদের বাহিনীগুলোতে রণ-সম্ভার বেশি থাকতে হবে। তিনি সুশিক্ষিত সৈন্যবাহিনী গড়ে তোলার জন্য সরকারকে মনোনিবেশ করার আহবান জানান। কিন্তু সেদিন তার প্রত্যেকটি কথাকে অগ্রাহ্য ও অবমূল্যায়ন করা হয়েছিল। সেদিন যদি তার কথামতো দেশের সেনাবাহিনীকে সুশিক্ষিত ও নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্যশীল করা হতো, তাহলে হয়তো দেশের অভ্যন্তরে রক্তক্ষয়ী সেনা অভ্যুত্থানে দেশের প্রধানদের প্রাণ ঝরে যেত না।
যে চারটি মূলনীতির (জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা) ভিত্তিতে এই দেশ পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল, সেই চার মূলনীতি থেকে অনেক আগেই সরে গেছে আমাদের প্রিয় স্বদেশ। জাতীয়তাবাদের নামে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদ। দেশের সংবিধানে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারোসহ ৪৫ টির অধিক জাতিগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, উপজাতি হিসেবে অভিধা দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে সংবিধানে জাতি হিসেবে স্বীকার করা হয়নি; উপরন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে দেশের এই পরিণতির কথা এম এন লারমা সেসময় মূল্যায়ন করেছিলেন। সে প্রেক্ষিতে তিনি বলেছিলেন, “একদিকে হিংসাদ্বেষ-বিহীন সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, আর অন্যদিকে উৎপাদন যন্ত্র ও উৎপাদন-ব্যবস্থাসমূহের মালিকানা আইনের দ্বারা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আবদ্ধ রেখে শোষণের পথ প্রশস্ত করে দেওয়া হয়েছে। আমরা এমন একটা ক্ষমতা দেখতে পাচ্ছি, যে ক্ষমতাবলে সরকার একটা লোককে এক পয়সার অধিকারী হতে দেবেন এবং অন্য একটা লোকের জন্য এক কোটি মালিকানার অধিকার রেখে দেবেন।” তার সেই ঐতিহাসিক মূল্যায়ন আজ সত্যতে পরিণত হয়েছে। নিয়তির কি নির্মম পরিহাস! আজ সমাজতন্ত্রের নামে আমাদের দেশে উচ্চ শ্রেণির দূর্নীতিবাজ, ঘুষখোর আর ক্ষমতার অপব্যবহারকারীরাই দাপটের সাথে এদেশ পরিচালনা করছে। সমাজতন্ত্রের বদলে এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, দূর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের।
দেশে গণতন্ত্রের নামে ক্ষমতার অপব্যবহার, ভয়ের সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার নামে ইসলাম ধর্মকে প্রতিষ্ঠিত করে দেওয়া হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় কথা ছিল এদেশের সংবিধান জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে আপামর জনগণের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ করবে এবং সকল প্রকারের জাতিগত নিপীড়ন, শোষণ-বঞ্চনার অবসান ঘটবে। ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক ও পাকিস্তান আমলের কালাকানুনগুলোর বিলুপ্তি ঘটিয়ে সত্যিকারের জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু তা আজও হয়নি।
১৯৭৪ সালের ৫ জুলাই জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে এম এন লারমা বলেছিলেন “মানুষকে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার অধিকার দিতে হবে। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। সেটা যদি দিতে না পারেন, তাহলে বলব আপনারা অত্যাচারী সরকার, গনবিরোধী সরকার। আপনারা যদি সরকার হিসেবে আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে না পারেন, তাহলে জনসাধারণ আপনাদের ক্ষমা করবে না। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে নাই।”
যে বাংলাদেশ পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার, নিপীড়ন ও অন্যায় শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিল, সেই বাঙালি শাসকগোষ্ঠী আজ গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের মুখোশ পরে এক কলমের খোঁচাতেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ তথা এদেশের ৪৫ টির অধিক জাতির জাতীয় অস্তিত্ব লুপ্ত করে দিয়েছে। তার বিরুদ্ধেই এম এন লারমা একাই রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। রাজনৈতিকভাবে অসচেতন ও সামন্তবাদে নিদ্রামগ্ন পার্বত্য চট্টগ্রামের ভিন্ন ভাষাভাষী জুম্ম জনগণকে জুম্ম জাতীয়তাবাদী চেতনায় জাগরিত করে এবং রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ করে যে সংগ্রাম তিনি শুরু করেছিলেন, যে মুক্তির অগ্নিমন্ত্র নিয়ে জুম জনপদে আবির্ভূত হয়েছিলেন, ১০ নভেম্বর ১৯৮৩ তে ঘাতকেরা তার জীবন প্রদীপ কেড়ে নিলেও তার সেই সংগ্রামকে শেষ করে দিতে পারেনি।
আমরা অধিকার চাই, আমরা মুক্তি চাই, সমাজ জীবনে আমরা পরিবর্তন আনতে চাই। সমাজে নারীর মর্যাদা ও তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সমাজে অবহেলিত খেটে খাওয়া শ্রমিক মজুরদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হলে, শ্রেণীহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে, এম এন লারমার আদর্শকে বুকে ধারণ করে এদেশের একটা তরুণ প্রজন্মকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। জুম জনপদের প্রতিটা সংগ্রামে, এদেশের মেহনতী মানুষের অধিকার বুঝে নেওয়ার প্রতিটা প্রতিরোধ ও আত্মবলিদানে এম এন লারমা ধ্রুব তারার মতো পথপ্রদর্শক হয়ে আজীবন বেঁচে থাকবেন।
লেখক,
সভাপতি
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ
রাঙ্গামাটি জেলা শাখা।


