বছরে ৬ মাস পানির কষ্টে ভোগে চিম্বুকের ম্রো আদিবাসীরা: সংকট এখন চরমে
আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): বান্দরবান পার্বত্য জেলার চিম্বুক পাহাড় এলাকার ম্রো আদিবাসীরা বছরে অন্তত ছয় মাস পানির কষ্টে থাকে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ম্রো’রা। বর্তমানে এই সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে। খাবার ও অন্যান্য জরুরি ব্যবহার্য্য পানির অভাবে তাদের মধ্যে এখন হাহাকার অবস্থা বিরাজ করছে।
স্থানীয় কয়েকজন ম্রো আদিবাসীর সাথে কথা বলে জানা যায় চিম্বুক এলাকার ২৮টি গ্রামের অন্তত ৮৭১টি ম্রো পরিবার এই মুহূর্তে পানির অভাবে অতি কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টির কারণে তীব্র গরমে তাদের গ্রামের আশেপাশের প্রায় সকল ঝিরি, ঝর্ণা ও ছড়াসমূহ শুকিয়ে এই কঠিন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এই অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই গ্রামবাসীদের মধ্যে নানা শারীরিক জটিলতা বা অসুখ দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।
গ্রামবাসীরা অভিযোগ করেছেন, চিম্বুক এলাকার অনেকেই মৌখিকভাবে ও ব্যক্তিগতভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের একাধিকবার অবহিত করলে ও দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেও এখনও পর্যন্ত কেউ এগিয়ে আসেনি এবং পাশে দাঁড়ায়নি বলে একাধিক গ্রামবাসী জানান।
এদিকে রিয়োং ম্রো নামে এক ব্যক্তি তার সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘মূলত গ্রীষ্ম মৌসুমে বছরের মার্চ – জুন মাসে পানির অভাব বেশি দেখা দেয়। সাম্প্রতিক যে গরম পড়েছে এতে নতুন করে আরো অনেকগুলো ঝিরিতে পানি শুকিয়ে যাচ্ছে। আবার ঝিরিগুলোতে যতটুকু পানি পাওয়া যায় তা অধিকাংশ দূষিত পানি। অসচেতন গ্রামবাসীগণ অনেকে এই পানি সরাসরি পান করে ফেলে, যার ফলে পরবর্তীতে নানা রকমের রোগবালাই দেখা দিতেও পারে।’
তিনি আরও লেখেন, ‘খাবার পানি সংগ্রহের জন্য পাহাড়ের নারীরা সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে। সারাদিন কাজ করে আবার রাতে সামান্যটুকু খাবার পানি পাওয়ার জন্য রাতভর না ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এই অভাবের দিনে আমরা সরকারের কোনো প্রতিনিধিকেও পাশে পাচ্ছি না। যদি জেলা প্রশাসন থেকে এই (মার্চ-জুন) সময়টুকু যদি বান্দরবান শহর থেকে খাবার পানি সাপ্লাই করতে পারতো তাহলেই আমাদের পানি সংকটের কষ্ট কিছুটা হলেও কমে যেত।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রামবাসী জানান, সেখানে ম্রোদের এলাকায় কোনো টিউবওয়েলও নেই। তিনি দুঃখের সাথে বলেন, বহিরাগত সেটেলার বাঙালিদের প্রায় ঘরে ঘরে টিউবওয়েল রয়েছে, কিন্তু ম্রোদের নেই।
এ নিয়ে যোগাযোগ করা হলে চিম্বুক এলাকার অধিবাসী ও পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি রেং ইয়ং ম্রো আইপিনিউজকে বলেন, এই সংকট আজকের সৃষ্ট না। এই বাস্তবতা সৃষ্টি হয়েছে বহু আগে থেকেই। মূলত প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হওয়া এবং অবাধে পাথর উত্তোলনের ফলে পানির উৎসগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। ফলে পানির স্তর নিচে নামতে নামতে এখন পানির সংকট তীব্র হয়েছে।

তিনি আরো বলেন, এলাকায় অনেক বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা দূরবর্তী ছড়া থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের উদ্যোগ নিয়ে এ সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু যেসব ছড়া থেকে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়েছে সেগুলোও ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে। ফলে এখন সে ব্যবস্থাও কার্যকর নয়।
এর সমাধান কী প্রশ্ন করা হলে রেং ইয়ং ম্রো আইপিনিউজকে বলেন, আমি মনে করি এসবের একমাত্র সমাধান হল প্রাকৃতিক বন ধ্বংস ও পাথর উত্তোলন বন্ধ করা এবং আদিবাসীদের প্রথাগত পাড়াবন রক্ষা ও সম্প্রসারণের যে চর্চাগুলো আছে সেগুলো আরো জোরদার করা। প্রাকৃতিক বন গজিয়ে উঠবার জন্য যেসব প্রতিবন্ধকতাগুলো আছে সেগুলো খুঁজে বের করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহন করা এখন সময়ের দাবী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায় চিম্বুক এলাকার ২৮ টি পাড়ায় পানির সংকট এখন চরমে। পানির সংকটে পড়া গ্রামগুলো হল: ১। মেনলুং পাড়া- ২৬ টি পরিবার, ২। বাগান পাড়া ১৬ মাইল- ৩০টি পরিবার, ৩। রামারি পাড়া- ৬০টি পরিবার, ৪। রিয়ামনই পাড়া- ১৭টি পরিবার, ৫। মেনসিং পাড়া- ১১টি পরিবার, ৬। কাপ্রুপাড়া- ৫৫টি পরিবার, ৭। দলা পাড়া- ২৩টি পরিবার, ৮। এরা পাড়া- ২৬টি পরিবার, ৯। পাবলা হেডম্যান পাড়া (চিম্বুক )- ৮০টি পরিবার, ১০। কিলাই পাড়া- ৯টি পরিবার, ১১। ভুইট্তা পাড়া- ১২টি পরিবার, ১২। পাতুই পাড়া- ১৭টি পরিবার, ১৩। ম্রলং পাড়া- ২৪টি পরিবার, ১৪। নোয়া পাড়া- ২২টি পরিবার, ১৫। ক্রামাদি পাড়া- ৪৪টি পরিবার, ১৬। বাবু পাড়া- ২৬টি পরিবার, ১৭। মেনদুই পাড়া- ৩২টি পরিবার, ১৮। দেওয়াই হেডম্যান পাড়া- ৩৬টি পরিবার, ১৯। রেনিক্ষ্যং পাড়া- ৩৫টি পরিবার, ২০। পরচ্যং পাড়া- ৮টি পরিবার, ২১। রুইফ পাড়া (ফোরা বাংলা)- ৩৫টি পরিবার, ২২। রাংক্লাং পাড়া- ২০টি পরিবার, ২৩। রাংলাই চেয়ারম্যান পাড়া- ২২টি পরিবার, ২৪। সিংচ্যং পাড়া- ৮টি পরিবার, ২৫। রাংলাই মধ্যম পাড়া- ২৪টি পরিবার, ২৬। এম্পুপাড়া- ৬০টি পরিবার, ২৭। কুরাং পাড়া- ৭০টি পরিবার ও ২৮। জামনি পাড়া- ৩৯ট পরিবার।


