খুলনার বাটিয়াঘাটায় চার নারী ফুটবলারের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের ৪৪ বিশিষ্টজনের নিন্দা

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): দেশের ৪৪ জন নাগরিক খুলনার বাটিয়াঘাটায় চার নারী ফুটবলারের ওপর হামলার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। একই সাথে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, যথাযথ বিচার এবং নারী ফুটবলারদের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে গতকাল বৃহষ্পতিবার এক বিবৃতি প্রদান করেছেন।
বিবৃতিতে নাগরিকরা বলেন, আমরা গভীর ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জেনেছি যে, গত ২৭ জুলাই ২০২৩ বৃহস্পতিবার খুলনার বাটিয়াঘাটা উপজেলার একটি স্কুল মাঠে খুলনা বিভাগীয় অনুর্ধ-১৭ দলের ফুটবলার সাদিয়া আফরিন যখন ফুটবল খেলছিলেন তখন তার ছবি তুলে পরিবারকে দেখিয়ে আপত্তিকর নানা কথা বলেন স্থানীয় তরুণী নূপুর খাতুন। এর প্রতিবাদ করতে গেলে গত ২৯ জুলাই শনিবার সন্ধ্যারাতে নূপুরের দুই ভাই আলাউদ্দিন ও সালাউদ্দিন, বাবা নুর আলম, মা রঞ্জি বেগম এবং তাদের আত্মীয় মনোয়ারা সাদিয়া ও তার তিন সতীর্থ মঙ্গলী বাগচী, হাজেরা খাতুন ও জুঁই মণ্ডলের ওপর হামলা চালান। নূপুরের বাবা নুর আলম লোহার রড দিয়ে মঙ্গলী বাগচীর মাথায় আঘাত করলে মঙ্গলী অচেতন হয়ে পড়েন। এরপর ঐ পরিবারের লোকজন মঙ্গলীকে তাদের বাড়ির ভেতরে নিয়ে হাত বেঁধে প্রায় দুই ঘণ্টা আটকে রাখে। পুলিশকে খবর দেবার পর মঙ্গলীকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এখনো তিনি সেখানে চিকিৎসাধীন আছেন। ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক, আমরা এ ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানাই।
ঘটনার পরদিন ৩০ জুলাই নুপুর খাতুন, তার মা, বাবা ও ভাইকে আসামী করে সাদিয়া নাসরিন একটি মামলা করেছেন। তবে পুলিশ কেবল নুর আলমকে গ্রেপ্তার করেছে দাবি করে বিবৃতিদাতা নাগরিকরা আরো বলেন, হামলাকারী আসামী সালাউদ্দিন ও অন্য আসামীরা নারী ফুটবলারদের শায়েস্তা করার এমনকি এসিড ছুঁড়ে মারার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন বলে আক্রান্তরা অভিযোগ করা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোন কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা গ্রহণের বদলে হামলাকারীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে। আমরা মনে করি, নারী ফুটবলারদের ওপর হামলা বিশেষ করে তাদের একজনকে রড দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় আটকে রাখার ঘটনা এবং তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিকে যেভাবে গুরুত্বের সাথে নেয়ার প্রয়োজন ছিল পুলিশ প্রশাসন এখনো সেটি করেনি। আমাদের প্রশ্ন হলো- নারী ফুটবলারদের ওপর হামলা এবং তারপর তাদের ওপর এসিড নিক্ষেপসহ বিভিন্ন হুমকি দেয়ার এই সাহস তারা কোথা থেকে পেয়েছে? এ ব্যাপারে প্রশাসন ও পুলিশ কোনোভাবেই তাদের দায় এড়াতে পারেনা।
বিবৃতিদাতাদের অন্যতম ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী খুশী কবির স্বাক্ষরিত বিবৃতিতে আরো বলা হয়, আহত ফুটবলার মঙ্গলী বাগচী অভিযোগ করেছেন, ঘটনার সময় ওই পরিবারের সদস্যরা তাদের খেলার পোশাক নিয়ে বারবার কটুক্তি করে এবং তার ধর্ম তুলে গালাগাল করে। একটি দীর্ঘ সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ধর্মান্ধতা, পোশাকের দোহাই দিয়ে নারীকে অবদমিত করার চেষ্টাকে আমরা মেনে নিতে পারিনা। আমরা মনে করি, সংখ্যালঘু বলে কাউকে তার ধর্ম নিয়ে কটুক্তি করার মতো সাম্প্রদায়িক আচরণের বিরুদ্ধে আমাদের সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
রকার যখন বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে কিশোরীদের ফুটবলে অংশগ্রহণে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা যোগাচ্ছে, সেই সময়ে এ ধরনের ঘটনা এবং পুলিশ-প্রশাসনের আচরণ কেবল অনাকাঙ্খিতই নয়, খেলাধুলায় অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অগ্রযাত্রার ওপর একটি আঘাত বলেও উল্লেখ করে নাগরিকরর বলেন, গতবছর আমাদের নারী ফুটবলাররা সাফ চ্যাম্পিয়নশীপে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হিসেবে দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়ে গোটা জাতির জন্য গৌরব বয়ে এনেছিলেন। তবে এখনো নারী ফুটবলারদের যেসব প্রতিবন্ধকতা মুখোমুখি হতে হয় সেগুলো দূর করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে নারী ফুটবলারদের ওপর হামলাকারীদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সেটি না হলে সারাদেশে নারীদের খেলাধুলায় অংশ নেয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা আমরা কোনভাবেই মেনে নিতে পারিনা। আমরা হামলাকারীদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত আইনগত ব্যবস্থা, যথাযথ বিচার নিশ্চিত করা এবং অবিলম্বে আক্রান্ত নারী ফুটবলারদের পূর্ণ নিরাপত্তা বিধানের জোর দাবি জানাই।
বিবৃতিতে স্বাক্ষরকারী ব্যক্তিরা হলেন সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও চেয়ারপার্সন, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশ, রাাশেদা কে. চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণ স্বাক্ষরতা অভিযান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা, খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি ও চেয়ারপার্সন, এএলআরডি, ড. সাদেকা হালিম, প্রফেসর, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়. ড. হামিদা হোসেন, মানবাধিকার কর্মী, ড. পারভীন হাসান, ভাইস চ্যান্সেলর, সেন্ট্রাল উইমেন্স বিশ্ববিদ্যালয়, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা, নির্বাহী পরিচালক, রীব, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, প্রধান নির্বাহী, বেলা, আলী ইমাম মজুমদার, সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব, অ্যাড. জেড আই খান পান্না, সভাপতি, আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, রাণা দাশগুপ্ত, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এসোসিয়েশ ফর ল্যান্ড রিফর্ম এ্যান্ড ডেভলপমেন্ট (এএলআরডি), আনু মোহাম্মদ, অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআইবি, রোবায়েত ফেরদৌস, অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ড. বীনা ডি. কস্তা, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, অস্ট্রেলিয়া ন্যাশনাল বিশ^বিদ্যালয়, প্রফেসর শাহনাজ হুদা, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, কাজল দেবনাথ, প্রেসিডিয়াম সদস্য, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, তবারক হোসেইন, সহ-সভাপতি, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন ও আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ড. আজিজুর রহমান, সাবেক অধ্যাপক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ড. আবুল বারকাত, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও উপদেষ্টা, এইচডিআরসি, রাহনুমা আহমেদ, কবি ও লেখক, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অনারারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট, ড. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী ও সমাজকর্মী, জাকির হোসেন, নির্বাহী পরিচালক, নাগরিক উদ্যোগ, সাঈদা গুলরুখ কামাল, সংবাদকর্মী, রোজিনা বেগম , গবেষক ও অধিকার কর্মী, নুর খান, মানবাধিকার কর্মী ও নির্বাহী পরিচালক, আইন ও সালিস কেন্দ্র, শিরীন হক, সদস্য, নারীপক্ষ, ড. নাঈমা হক, প্রফেসর, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ড. মোহাম্মদ তানজিম উদ্দিন খান, অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়, ব্যারিস্টার আশরাফ আলী, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, এ্যাড. মিনহাজুল হক চৌধুরী, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ব্যারিস্টার শাহাদাত আলম, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, ব্যারিস্টার শুভ্র চক্রবর্তী, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট, এ্যাড. সাইদুর রহমান, প্রধান নির্বাহী, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন, রেজাউল করিম চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, কোস্ট ট্রাস্ট, দীপায়ন খীসা, সদস্য বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, জোবাইদা নাসরীন কণা, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়,মুক্তাশ্রী চাকমা, কোর গ্রুপ মেম্বার, সাঙ্গাত, হানা শামস আহমেদ, আদিবাসী অধিকার কর্মী, তাসনীম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়।


