মতামত ও বিশ্লেষণ

আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আদিবাসী তরুণরাই মূল শক্তি: সোহেল হাজং

সবাইকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের শুভেচ্ছা। এবার এ আন্তর্জাতিক দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি আদিবাসী তরুণদের নিয়ে, যারা সমাজের কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার পালন করতে পারে। জাতিসংঘের দেয়া এবারের মূল থীমের সাথে মিল রেখে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম এর প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করেছে- ‘আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আদিবাসী তরুণরাই মূল শক্তি।’

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ২০২৩ উপলক্ষে তার বাণীতে বলেন, “সিদ্ধান্ত গ্রহণে তরুণ আদিবাসীদের সম্পৃক্ততা ‘অত্যাবশ্যক’।” তিনি আরো বলেন, “সারা বিশ্বে আদিবাসীরা নানা ধরনের গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে । তাদের ভূমি ও ভূখণ্ডের ওপর আঘাত করা হয়েছে। তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে এবং অবহেলা করে ক্রমাগতভাবে তাদের প্রান্তিক থেকে প্রান্তিকতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ আদিবাসীরা এগিয়ে আসছে।”

আদিবাসী তরুণদের জলবায়ু পরিবর্তন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন এবং আন্তঃপ্রজন্মের মানুষের মধ্যে সংযোগ স্থাপনেও আদিবাসী তরুণদের অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখার কথা বলেছে জাতিসংঘ।

এবার আদিবাসীদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রসঙ্গে আসি। আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের ৩ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বলে তারা অবাধে তাদের রাজনৈতিক মর্যাদা নির্ধারণ করে এবং অবাধে তাদের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কর্মপ্রয়াস অব্যাহত রাখে।” ৪ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- “আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ণ্ত্রণাধিকার চর্চার বেলায়, তাদের আভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে স্বায়ত্বশাসন ও স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে এবং তাদের স্বশাসনের কার্যাবলীর জন্য অর্থায়নের পন্হা ও উৎসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অধিকার রয়েছে।”

আজ আদিবাসীদের আত্মনিয়ণ্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে। কেননা আদিবাসীরা অবহেলা, বঞ্চণা নিয়ে, বিভিন্ন ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তারা আজ প্রান্তিকতার শেষ পর্যায়ে চলে গেছে। তারা নিজ ভূমি থেকে বিতাড়িত হচ্ছে। উন্নয়নের প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে আদিবাসীদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ব্যতিরেকে তাদের জমিজমা দখল করা হচ্ছে। অধিকাংশ আদিবাসীদের মাতৃভাষায় শিক্ষা অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আদিবাসী শিশুরা নিজ মাতৃভাষাকে ভুলে দেশীয় মূলধারার ভাষাকে মাতৃভাষা হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। সারা দেশব্যাপী আদিবাসীদের ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘণ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হচ্ছে না। আদিবাসী নারী ও শিশুদের সব সময় একধরনের নিরাপত্তাহীনতার আতঙ্কে দিন গুণতে হচ্ছে।

আদিবাসীদের প্রথাগত আইনকে স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এর ফলে আদিবাসীদের নিজস্ব অনুশাসন কাঠামোও বিলুপ্ত হতে চলেছে। হাজংদের ‘গাওবুড়া’, গারোদের ‘নকমা’ প্রথা, সাঁওতালদের ‘মাঝি পরিষদ’-সহ সমতলের আদিবাসী সমাজের নিজস্ব অনুশাসন কাঠামোগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি পায়নি। যার ফলে, কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ হচ্ছে না। আদিবাসীরা নারী্রা্ এক্ষেত্রে আরো একধাপ পিছিয়ে রয়েছে কিংবা তাদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে।

আদিবাসীদের জায়গায় যেমন বৃহত্তর ময়মনসিংহের আদিবাসী এলাকায় ‘সুফল’ প্রকল্প হচ্ছে, পার্বত্য বান্দরবানে ফাইভ স্টার ম্যারিয়ট হোটেল নির্মাণ কাজ, কিংবা দিনাজপুরের বাগদা ফার্ম এলাকায় ইপিজেড প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে- সবই স্থানীয় আদিবাসীদের স্বাধীন ও পূর্বাবহিত সম্মতি ব্যতিরেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। যা এক ধরনের চরম মানবাধিকার লঙ্ঘণ।

আদিবাসী এলাকায় আদিবাসীদের সম্মতি ছাড়া কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায় না। জোর করে তাদের আবাদী জমিতে লেক খনন করা অবৈধ। তবুও যদি এরকম ঘটনা ঘটে থাকে এবং তাতে যদি আদিবাসী তরুণরা এর প্রতিবাদ করতে আসে তাহলে অবশ্যই তা সমর্থনযোগ্য। আদিবাসীদের ওপর অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে এই তরুণদেরই আমরা মূল শক্তি হিসেবে দেখতে চাই।

অধিকাংশ আদিবাসীদের ভূমির দলিল নেই বলে তাদের সম্মতি ছাড়া তাদের চিরাচরিত ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা যায় না। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭২ সালে ‘আদিবাসী ও ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী কনভেনশন ১৯৫৭ (নং ১০৭)’ অনুস্বাক্ষর করে এ সম্পর্কিত ধারাগুলো বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করেছে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার ৭ম ও ৮ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ‘জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র ২০০৭’ সমর্থন এবং ‘আদিবাসী ও ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠী কনভেনশন ১৯৮৯ (নং ১৬৯)’ অনুস্বাক্ষরের অঙ্গীকার করেছে।

আদিবাসী তরুণরাই আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বড় ভূমিকা রাখছে। এ আন্দোলনে সামিল হতে গিয়ে বিগত দিনে আলফ্রেদ সরেন, পীরেন স্নাল, সত্যবান হাজংসহ অসংখ্য আদিবাসী যুবক-যুবতীরা জীবন দিয়েছে। অনেকেই বড় বড় আন্দোলনে যুক্ত হয়ে আদিবাসীদের ভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষায় অসামান্য অবদান রেখেছে। আবার অনেকেই দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও পরিবেশ রক্ষায় তাদের অবদানের কথা তোলে ধরছেন।

এভাবে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আদিবাসী তরুণরাই মূল শক্তি হিসেবে কাজ করবে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠা মানে অন্য একটি নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা নয়। রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের মধ্যে থেকেই আদিবাসীরা এ অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন করতে পারে। এবং রাষ্ট্রীয় সংবিধান এ অধিকার চর্চার স্বীকৃতি দিতে পারে। আন্তর্জাতিক আইনে সকল মানুষেরই আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের কথা বলা আছে। যা কানাডা সম্মান দেখিয়ে কানাডার মধ্যে আদিবাসীদের স্ব-শাসনের অধিকার সংবিধান দ্বারা স্বীকৃত এবং সুরক্ষিত করেছে।

পরিশেষে,আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় আদিবাসী তরুণদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে অর্থপূর্ণ ও শক্তিশালী আন্দোলন গড়ে তোলতে হবে। তরুণদের বেশি বেশি করে আদিবাসীত্ব, আদিবাসীদের স্বশাসন ব্যবস্থা, প্রথাগত রীতি ও আদিবাসী বিষয়ক মানবাধিকার সরঞ্জামসমূহ এবং জাতীয় নীতিসমূহ জানতে হবে। আদিবাসী অধিকার প্রতিষ্ঠায় চ্যালেঞ্জসমূহ নির্ধারণ করে তা মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত নিয়ে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অ্যাডভোকেসী ও ক্যাম্পেইন করতে হবে। আদিবাসী তরুণদের এ লড়াইয়ে সকলকে পাশে দাঁড়াতে হবে। আদিবাসী তারুণ্যের জয় হোক।

Back to top button