খাগড়াছড়ি থেকে দক্ষিণ কোরিয়া: পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করছেন মংসাথোয়াই মারমা

আইপিনিউজ ডেস্ক, উচ্চশিক্ষাঃ খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার মাস্টারপাড়া গ্রামের মংসাথোয়াই মারমা বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ার Kyungpook National University-তে পরিবেশ প্রকৌশল বিষয়ে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করছেন। একটি ছোট্ট গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের প্রস্তুতি, গবেষণার অভিজ্ঞতা, অধ্যবসায় এবং নিজের স্বপ্নের প্রতি অবিচল বিশ্বাস।
নিজের উচ্চশিক্ষার যাত্রা সম্পর্কে মংসাথোয়াই মারমা জানিয়েছেন, “ছোট্ট একটি গ্রাম থেকে শুরু হওয়া আমার এই পথচলা আজ আমাকে নিয়ে এসেছে দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করার সুযোগ পর্যন্ত। এই যাত্রা সহজ ছিল না, তবে স্বপ্ন, ধৈর্য আর নিজের প্রতি বিশ্বাস আমাকে ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।”
মি. মারমার শিক্ষাজীবন শুরু হয় খাগড়াছড়ি জেলার রামগড় সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর ঢাকার নটর ডেম কলেজে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন তিনি। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষাজীবনের পরবর্তী পর্যায়ে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পান তিনি। আহছানউল্লা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (AUST) মেকানিক্যাল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ডেনমার্কের অর্থায়নে পরিচালিত একটি গবেষণা প্রকল্পে গবেষণা সহকারী (Research Assistant) হিসেবে যোগ দেন মারমা। সেখানে প্রায় আড়াই বছর কাজ করেন তিনি।
এ সময় তাঁর গবেষণার মূল বিষয় ছিল ট্যানারি শিল্পে টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা। গবেষণা প্রকল্পে কাজ করার মধ্য দিয়ে শিল্পক্ষেত্রে পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ, টেকসই উৎপাদন এবং গবেষণার ব্যবহারিক দিক সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয় তাঁর। পাশাপাশি গবেষণার দক্ষতা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা সম্পর্কে মারমা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা অর্জনের প্রতি আমার আলাদা একটা আগ্রহ ছিল। তাই স্নাতক শেষ করার পর থেকেই নিজের প্রোফাইল গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিই, বিশেষ করে গবেষণার ক্ষেত্রে। আমি বিশ্বাস করতাম, বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শুধু ইচ্ছা থাকলেই হবে না, সেই অনুযায়ী নিজেকে প্রস্তুতও করতে হবে।”
এই লক্ষ্য সামনে রেখে গবেষণায় সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকেন তিনি। একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি গবেষণাপত্র প্রকাশ, গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন এবং নিজের দক্ষতা বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত তাঁর ১২টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি জার্নাল আর্টিকেল এবং ছয়টি কনফারেন্স প্রসিডিংস রয়েছে। এ ছাড়া আরও ছয়টি গবেষণাপত্র বর্তমানে পর্যালোচনাধীন (Under Review) রয়েছে।
গবেষণার ধারাবাহিকতা সম্পর্কে তিনি বলেন, “এই প্রস্তুতির ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত আমার ১২টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে ৬টি জার্নাল আর্টিকেল এবং ৬টি কনফারেন্স প্রসিডিংস রয়েছে। পাশাপাশি আরও ৬টি গবেষণাপত্র বর্তমানে পর্যালোচনাধীন (Under Review) রয়েছে। প্রতিটি গবেষণার অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন কিছু শিখিয়েছে এবং আমার স্বপ্নের দিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।”
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়ায় তাঁর পিএইচডি গবেষণার প্রধান ক্ষেত্র পরিবেশ প্রকৌশল। বিশেষ করে নতুন ন্যানোস্ট্রাকচার্ড উপাদান তৈরি ও উন্নয়নের মাধ্যমে বর্জ্যপানি থেকে ক্ষতিকর দূষক অপসারণের সম্ভাবনা নিয়ে কাজ করছেন তিনি। তাঁর গবেষণায় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (Metal-Organic Frameworks বা MOFs), যা নির্দিষ্ট দূষক শনাক্তকরণ ও অপসারণের ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় উপাদান হিসেবে বিবেচিত।
এ গবেষণার মাধ্যমে বর্জ্যপানি থেকে PFAS এবং অ্যান্টিবায়োটিকের মতো উদীয়মান দূষক অপসারণের কার্যকর পদ্ধতি উন্নয়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। PFAS হলো একধরনের স্থায়ী রাসায়নিক পদার্থ, যা পরিবেশে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যেতে পারে। অন্যদিকে, বর্জ্যপানিতে অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। এসব দূষক অপসারণে উন্নত উপাদান ও কার্যকর প্রযুক্তির বিকাশ পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নিজের গবেষণার উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে মি. মারমা বলেন, “আমার গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো নতুন ন্যানোস্ট্রাকচার্ড ম্যাটেরিয়াল, বিশেষ করে মেটাল-অর্গানিক ফ্রেমওয়ার্ক (MOF), তৈরি ও উন্নয়ন করা, যা বর্জ্যপানি থেকে PFAS এবং অ্যান্টিবায়োটিকের মতো উদীয়মান দূষক অপসারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ দূষণ কমানো এবং পানি পরিশোধনের আরও কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবনের মাধ্যমে পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে অবদান রাখাই আমার গবেষণার অন্যতম উদ্দেশ্য।”
গবেষণার এই ক্ষেত্রটি পরিবেশগত সমস্যার প্রযুক্তিনির্ভর সমাধান অনুসন্ধানের সঙ্গে সম্পর্কিত। বর্জ্যপানি পরিশোধনের কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করা গেলে তা পানি দূষণ কমানো এবং পরিবেশ সুরক্ষায় অবদান রাখতে পারে। সে বিবেচনায় মারমার গবেষণার লক্ষ্য কেবল একাডেমিক ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গবেষণার ব্যবহারিক সম্ভাবনা অনুসন্ধানও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
উচ্চশিক্ষার এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পেছনে যাঁরা সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন, তাঁদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন মারমা। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার পাশাপাশি অন্যদের সহযোগিতা ও যথাযথ দিকনির্দেশনাও একজন শিক্ষার্থীর পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমার এই যাত্রায় অনেক মানুষের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণা পেয়েছি। তাঁদের প্রতি আমি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ। তাঁদের পরামর্শ, সহযোগিতা এবং উৎসাহ আমার বিদেশে উচ্চশিক্ষার পথকে অনেকটাই সহজ করেছে। আমি বিশ্বাস করি, জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে সঠিক মানুষের কাছ থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনা অনেক বড় পরিবর্তন আনতে পারে।”
বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থীদের জন্যও একটি বার্তা দিয়েছেন তিনি। বিশেষ করে যাঁরা এখনো স্নাতক পর্যায়ে রয়েছেন কিংবা ভবিষ্যতে বিদেশে গবেষণা ও উচ্চশিক্ষা অর্জনের পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন মারমা।
তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ, “যাঁরা বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখছ, বিশেষ করে আমার জুনিয়রদের জন্য আমার ছোট্ট একটি বার্তা— ‘Always trust the process.’”
তিনি আরও বলেন, “নিজেকে সময় দাও, নিজের দক্ষতা বাড়াও, গবেষণার সঙ্গে যুক্ত থাকো এবং ধৈর্য ধরে নিজের প্রোফাইল তৈরি করো। অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের যাত্রার তুলনা না করে প্রতিদিন নিজেকে আগের দিনের চেয়ে একটু ভালো করার চেষ্টা করো।”
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, প্রত্যেকের শিক্ষাজীবন, সুযোগ এবং প্রস্তুতির পরিস্থিতি এক নয়। ফলে অন্যের সাফল্য দেখে হতাশ না হয়ে নিজের সামর্থ্য ও লক্ষ্য অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
মি. মারমার ভাষায়, “মনে রেখো, সবার পথ এক রকম নয়, আর সাফল্যও সবার জীবনে একই সময়ে আসে না। আজকের ছোট ছোট প্রস্তুতিই একদিন তোমাকে তোমার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে পারে।”
বিদেশে উচ্চশিক্ষার আবেদনপ্রক্রিয়া, গবেষণার সুযোগ, বৃত্তি এবং সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতি সম্পর্কে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করার আগ্রহও প্রকাশ করেছেন তিনি। নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অন্যদের পথচলায় সহায়তা করতে চান এই গবেষক।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, “বিদেশে উচ্চশিক্ষা, গবেষণা, স্কলারশিপ কিংবা আবেদনপ্রক্রিয়া নিয়ে কারও কোনো প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় যোগাযোগ করতে পারো। আমার অভিজ্ঞতা থেকে যতটুকু সম্ভব, আমি অবশ্যই সহযোগিতা করার চেষ্টা করব।”
নিজের বক্তব্যের শেষাংশে উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী তরুণদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “স্বপ্ন দেখো, নিজেকে প্রস্তুত করো, ধৈর্য ধরো এবং নিজের প্রক্রিয়ার ওপর বিশ্বাস রাখো।”
খাগড়াছড়ির রামগড়ের মাস্টারপাড়া থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করার পর্যায়ে পৌঁছানোর এই যাত্রায় মংসাথোয়াই মারমার অভিজ্ঞতা উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের সামনে গবেষণাভিত্তিক প্রস্তুতি, দক্ষতা উন্নয়ন, অধ্যবসায় এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার গুরুত্ব তুলে ধরে। তাঁর অভিজ্ঞতার মূল বার্তা- লক্ষ্য নির্ধারণের পাশাপাশি সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধারাবাহিকভাবে নিজেকে প্রস্তুত করা জরুরি।


