বাংলাদেশে আদিবাসী নেই’—দুই মন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি ৪৪ বিশিষ্ট নাগরিকের

আইপিনিউজ বিডি, ১৯ আগস্ট, ২০২৬, ডেস্ক রিপোর্টঃ বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব অস্বীকার করে সম্প্রতি দুই মন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যকে ‘সাংঘর্ষিক, দায়িত্বজ্ঞানহীন ও বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন দেশের ৪৪ জন বিশিষ্ট নাগরিক। একই সঙ্গে তাঁরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্য অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে এ দাবি জানানো হয়। বিবৃতিটি গণমাধ্যমে পাঠান অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১১ আগস্ট ঢাকায় ‘বাংলাদেশের জন্য আদিবাসী পরিচয় অপ্রাসঙ্গিক’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ও তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী জনগোষ্ঠী নেই বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে তাঁরা সব নাগরিককে কেবল বাংলাদেশি হিসেবে পরিচিত করার পক্ষে মত দেন এবং জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্র (UNDRIP) ও আইএলও কনভেনশন ১৬৯ বাংলাদেশ অনুসমর্থন করেনি—তাই এগুলো বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় বলে দাবি করেন।
নাগরিকদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, এ ধরনের বক্তব্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর স্বতন্ত্র পরিচয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধিকারকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। আদিবাসী পরিচয় ও বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পরস্পরবিরোধী নয় উল্লেখ করে তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও আদিবাসী গোষ্ঠীর স্বকীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। ফলে মন্ত্রীদের বক্তব্য সংবিধানের ওই দায়বদ্ধতার সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশ UNDRIP বা ILO Convention 169 অনুসমর্থন না করলেও ১৯৫৭ সালের ILO Convention 107 অনুসমর্থন করেছে, যা রাষ্ট্রের জন্য আইনগত বাধ্যবাধকতা তৈরি করে। ফলে আদিবাসীদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ভূমির অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
এ ছাড়া ১৯৫০ সালের স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেনান্সি অ্যাক্টের ৯৭ ধারা, অর্থ আইন ১৯৯৫, আয়কর আইন ২০২৩ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-সহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় আইন ও নীতিতে ‘আদিবাসী’ শব্দটির উল্লেখ রয়েছে বলেও বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে প্রশ্ন তোলা হয়, নির্বাচিত বিএনপি সরকার বাংলাদেশকে ‘রেইনবো নেশন’ হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেছে। তাহলে দেশের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বই যদি অস্বীকার করা হয়, সে ক্ষেত্রে ‘রেইনবো নেশন’ গড়ে তোলা কীভাবে সম্ভব?
নাগরিকরা ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের বাণীর কথাও স্মরণ করিয়ে দেন। ওই বাণীতে আদিবাসীদের সমান মর্যাদার নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করার পাশাপাশি তাঁদের ঐতিহ্যকে ‘জাতীয় সম্পদ’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘বাংলাদেশে আদিবাসী নেই’—এই ধারণা মূলত বিগত স্বৈরশাসনগুলোর সময় সামনে আনা হয়েছিল। বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের বক্তব্যে একই ধারণার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
৪৪ নাগরিক আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দেশের অভ্যন্তরে যেমন বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে, তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেছেন তারা হলেন:-
১. অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, মানবাধিকার কর্মী ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন
২. খুশী কবির, সমন্বয়কারী, নিজেরা করি
৩. শিরীন পারভিন হক, সদস্য, নারীপক্ষ
৪. আবু সাঈদ খান, লেখক ও সাংবাদিক
৫. রাশেদা কে চৌধুরী, নির্বাহী পরিচালক, গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা
৬. ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, টিআই-বি
৭. শাহিন আনাম, নির্বাহী পরিচালক, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন
৮. অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও সভাপতি, আইন ও সালিস কেন্দ্র
৯. ডা: মং উষা থোরাই, সিনিয়র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
১০. ড. শহিদুল আলম, আলোকচিত্রী
১১. ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অনরারি নির্বাহী পরিচালক, ব্লাস্ট ও সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১২. শামসুল হুদা, নির্বাহী পরিচালক, এএলআরডি
১৩. অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
১৪. অ্যাডভোকেট তবারক হোসেন, সিনিয়র আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোট
১৫. রেহেনুমা আহমেদ, লেখক ও গবেষক
১৬. ড. সুমাইয়া খায়ের, অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৭. ড. সামিনা লুৎফা, অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৮. ড. জোবাইদা নাসরীন, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
১৯. তাসনিম সিরাজ মাহবুব, সহযোগী অধ্যাপক, ইংরেজী বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
২০. ড. মির্জা তাসলিমা সুলতানা, অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
২১. ড. ফিরদৌস আজীম, অধ্যাপক, ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়
২২. ড. ফস্টিনা পেরেইরা, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
২৩. ড. মোশরেকা অদিতি হক, সহযোগী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
২৪. অ্যাডভোকেট সালমা আলী, নির্বাহী পরিচালক, বি এন ডব্লিউ এল এ
২৫. পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক
২৬. সায়দিয়া গুলরুখ, সাংবাদিক ও গবেষক
২৭. রোজিনা বেগম, গবেষক ও অধিকার কর্মী
২৮. বিলু কবীর, কবি ও গবেষক
২৯. মনিন্দ্র কুমার নাথ, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ
৩০. সালেহ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন
৩১. পারভেজ হাসেম, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী
৩২. জাকির হোসেন, প্রধান নির্বাহী, নাগরিক উদ্যোগ
৩৩. সাঈদ আহমেদ, মানবাধিকার কর্মী
৩৪. শাহেদ কায়েস, কবি ও প্রাবন্ধিক
৩৫. মিঠুন রাকসান, আদিবাসী কবি ও সংস্কৃতি কর্মী
৩৬. হাফিজ রশিদ খান, কবি ও আদিবাসী সংস্কৃতি কর্মী
৩৭. দীপায়ন খীসা, মানবাধিকার কর্মী
৩৮. জাহেদ হাসান, মানবাধিকার কর্মী
৩৯. আমিনুর রসুল, পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মী
৪০. জুয়েল মারাক, সাংবাদিক ও অধিকার কর্মী
৪১. ইন্টু মনি তালুকদার, প্রকাশক ও আদিবাসী সংস্কৃতি কর্মী
৪২. ড. হানা শামস আহমেদ, অধিকার কর্মী
৪৩. ড. নাসরিন খন্দকার, নৃবিজ্ঞানী
৪৪. হিরণ মিত্র চাকমা, আদিবাসী ও মানবাধিকার কর্মী


