জাতীয়শিক্ষা

২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে ৬০৬ জন মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার: জেএসএস

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগণের রাজনৈতিক সংগঠন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি’ (জেএসএস) ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির উপর ২০২৫ সালের বার্ষিক রিপোর্ট’ প্রকাশ করেছে। জেএসএসের সহ তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমার স্বাক্ষরিত এই রিপোর্ট আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি ২০২৬) প্রকাশ করা হয়েছে।

জেএসএসের উক্ত মানবাধিকার রিপোর্টে বলা হয় যে, অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক সংবিধানসহ সংস্কার কার্যক্রমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের আলোচনার বাইরে রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক গৃহীত জুলাই সনদেও পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নসহ ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের বিষয়ে কোনো কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। যা অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আদিবাসী জনগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি গভীর বৈষম্যের সুষ্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে।
রিপোর্টে আরো বলা হয় যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। ফলে চুক্তির মৌলিক বিষয়সহ চুক্তির দুই-তৃতীয়াংশ ধারা এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়ে গেছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানবাধিকার পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটেছে। ২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, সেনা-মদদপুষ্ট সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপ, সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী গোষ্ঠী, রোহিঙ্গ্যা সশস্ত্র জঙ্গী, মুসলিম বাঙালি সেটেলার ও ভূমিদস্যুদের দ্বারা ২৬৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এসব ঘটনায় ৬০৬ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে।
২০২৫ সালে সংঘটিত ২৬৮টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার মধ্যে নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ১৬৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এসব ঘটনায় ২২৪ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর মতো অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে বিচার-বহির্ভূত হত্যার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। একজন মারমা ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনজন জুম্ম নিহতসহ ২০২৫ সালে ৮ জন জুম্ম হত্যার শিকার হয়েছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় যে, এসব হত্যা ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদেরকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি। কোনো মামলাও দায়ের করা হয়নি।

অস্ত্র গুঁজে দিয়ে, মিথ্যা মামলায় জড়িত করে, সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজির অজুহাত তুলে নিরীহ জুম্মদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। ২০২৫ সালে নিরাপত্তা বাহিনী ও পুলিশ কর্তৃক ১১৭ জন জুম্মকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪৭ জনকে সাময়িক আটকে রেখে নির্যাতনের পর ছেড়ে দেয়া হয়। অবশিষ্ট ৭০ জনকে জেলে প্রেরণ করা হয়। ২০২৫ সালে সেনাবাহিনী ও বিজিবি সদস্যরা কমপক্ষে ১৯৩টি জুম্ম অধ্যুষিত গ্রামে তল্লাসী অভিযান চালিয়েছে। এসব অভিযানে কমপক্ষে ৬৫ জন জুম্মকে মারধর, হুমকি প্রদান, আহত করা হয়েছে। ২টি বৌদ্ধ মন্দিরসহ ৪৩টি বাড়ি তল্লাসী ও জিনিসপত্র তছনছ করা হয়েছে। ২০২৫ সালে নিরাপত্তা বাহিনী ও মুসলিম সেটেলার কর্তৃক জুম্ম নারী ও শিশুর উপর ২৬টি সহিংস ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এতে ৩২ জন জুম্ম নারী ও শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌন হয়রানি, শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে।

২০২৫ সালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ ও দেশের আদিবাসী জনগণের উপর ব্যাপক আকারে দুইটি নৃশংস সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলা সদরের সিঙ্গিনালা এলাকায় এক জুম্ম কিশোরীকে সেটেলার বাঙালি কর্তৃক গণধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সেনা বাহিনীর ইন্ধনে ২৭-২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ বাঙালি মুসলিম সেটেলার কর্তৃক জুম্মদের উপর নৃশংস সাম্প্রদায়িক হামলা ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়। এতে খাগড়াছড়ি জেলার গুইমারা রামসু বাজার ও এর আশেপাশের জুম্ম বসতিতে সেনাবাহিনী ও বাঙালি সেটেলার কর্তৃক সম্মিলিতভাবে উপর্যুপরি হামলায় ৩ জন জুম্ম নিহত এবং অন্তত ২০ জনের অধিক আহত হয়েছে। এছাড়া রামসু বাজারে জুম্মদের ৫৪টি দোকান, ২৬টি ঘরবাড়ি ও ১৬টি মোটরসাইকেল অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত হয়।

জুম্মদের উপর উক্ত সাম্প্রদায়িক হামলা এবং সেনাবাহিনীর গুলিতে তিনজন জুম্ম নিহত হলেও উল্টো পুলিশ বাদী হয়ে সহিংসতা ও ভাঙচুরের অভিযোগে জুম্মদের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়।
বান্দরবান জেলার লামা, আলিকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান সদর সহ বিভিন্ন এলাকায় বহিরাগত বিভিন্ন কোম্পানি, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির উদ্যোগে রাবার বাগান, হর্টিকালচার, পর্যটন কেন্দ্র ব্যবসার নামে চলছে জুম্মদের শ্মশান, বৌদ্ধ বিহার, জুম ভূমি সহ বসতভূমি বেদখল, উচ্ছেদ, মিথ্যা মামলা দায়ের, হামলা ও অগ্নিসংযোগ। ২০২৫ সালে ২৬৮টি ঘটনার মধ্যে মুসলিম বাঙালি সেটেলার ও ভূমিদস্যু কর্তৃক ৪১টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে এবং এতে ৩০ জন ম্রো শিশুকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরসহ ২২৮ জন জুম্ম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে এবং কমপক্ষে ৩০০ একর ভূমি বেদখল করা হয়েছে।

বান্দরবানে রোহিঙ্গা শরণার্থীর অনুপ্রবেশ অব্যাহতভাবে চলছে। অনুপ্রবেশকালে পুলিশ মাত্র ৬৭ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। অন্যদিকে ২০২৫ সালে রোহিঙ্গা সশস্ত্র জঙ্গী আরসা-আএসও কর্তৃক নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম থেকে ৩ জন তঞ্চঙ্গ্যা গ্রামবাসীকে অপহরণের পর হত্যা করেছে।

উল্লেখ্য যে, ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের সময় অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির ফলে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী জুম্ম জনগণের প্রতি যে অন্যায়-অবিচার করা হয়েছে, তার থেকেই পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার পাকিস্তানের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে বাংলাদেশের একের পর এক সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম জনগণের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভূমি বেদখল ও উচ্ছেদ, ধর্মান্তর ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘন ধারাবাহিকভাবে করে চলেছে।

Back to top button