হবেনা আর কোন আলাপন, তারপরও বলবো না বিদায় – দীপায়ন খীসা

২২জুলাই, রোববার। রাজীব মীরের জন্য অপেক্ষায় আমরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে। কেউবা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে। এখানে হবে প্রথম জনাজা। তারপর টিএসসিতে কিছুক্ষণ রাখা হবে তার সুহৃদদের জন্য। কথা ছিল ২টায় টিএসসি-তে এসে পোঁছাবে রাজীব মীরের মরদেহ। কিন্তু বিলম্ব হচ্ছিল। বিমানবন্দর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়মুখী সড়কগুলোতে গাড়ীর ধীর গতি। সড়কগুলো বিদ্রোহ করছে। তারাও যেন বলছে আরেকটু সময় রাজীব মীরকে আটকিয়ে রাখলে ক্ষতি কি? আমরা প্রতীক্ষায় আছি। সর্বশেষ খবর এলো এলিফেন্ট রোড, বাটা সিগন্যাল পার হচ্ছে এম্বুলেন্স। আমি মনে মনে ভাবছি পথের ধীর গতি কি আরও একটু ধীর হতে পারতো না।
না তা হবার নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জনাজা শেষে রাজীব মীর কে নিয়ে আসা হলো টিএসসিতে। ভালবাসা নিবেদন। ফুলেল ভালবাসা। টিএসসিতে প্রতীক্ষায় ছিলেন রাঙ্গামাটির সাংসদ ঊষাতন তালুকদার, সঞ্জীব দ্রং, নুমান আহম্মেদ খান, পঙ্কজ ভট্টাচার্য্য, রোবায়েত ফেরদৌস, ফাহমিদ। ছিলেন ঢাবির প্রাক্তন উপাচার্য আরেফিন সিদ্দিক, প্রভাষ আমিন। একটু পরে দেখা হলো নাদিয়া শারমীনের সাথে।
ফুল হাতে একে একে রাজীব মীরকে বিদায় জানাচ্ছে তার সুহৃদরা। আমি ভাবছি ভিন্ন কথা। আর কথা বলবেনা রাজীব মীর। লিখবেনা কোন কবিতা। পাহাড়ে কিংবা সমতলে আদিবাসীরা আক্রান্ত হলে, নির্যাতিত হলে আর ছুটে যাবেনা। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পোড়া ভিটাতে আর দেখা মিলবেনা রাজীব মীরকে। লিখবেনা আর সরেজমিন পরিদর্শনোত্তর কোন সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য। মানববন্ধনে দাঁড়িয়ে সংহতি জানাবেনা। বই মেলায় আর দেবেনা অটোগ্রাফ। গাইবেনা গান। ছাত্রদের সাথে দেখা হবেনা পাঠদান কক্ষে। এই রকম আরও অনেক না আমাকে তখন তাড়িয়ে বেরাচ্ছিল।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে চলেছে। ফুলেল ভালবাসায় সিক্ত হলেন রাজীব মীর। আমি গেলাম ভীরু কদমে। রাজীবের মুখখানি দেখব দেখব করেও দেখা হয়নি। কিংবা দেখতে চাইনি। কফিন ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমার কাছে রাজীব মীর মানে তো অফুরন্ত জীবনের উচ্ছ্বাস। তাই শেষ দেখাটা এড়িয়ে গেলাম।
এবার রাজীব ফিরে যাচ্ছে তার গ্রামে। মায়ের কাছে, বাবার কাছে। ভোলায় অপেক্ষা করছে প্রিয়তম স্ত্রী, প্রতীক্ষায় কাতর হয়ে আছে তার আদরের শিশু কন্যা বিভোর। অতঃপর শেষ বিদায়। ধরণীর কাছে ফিরে যাবে রাজীব।
জানি আর দেখা হবেনা। মাটির নীচে শায়িত রাজীব আর কথা বলবে না। বলতে হবে বিদায়। কিন্তু বিদায় বলি কি করে। এ যে প্রাণের সাথে প্রাণ মিলেছে। জীবনের সাথে মিলেছে জীবন। “আজ জীবন খুঁজে পাবি …, হাসি নিয়ে বাঁশি নিয়ে আয়, … ছুঁটে ছুঁটে আয়“। তাই বিদায় নয়, অগণিত জীবনের মাঝে, নিপীড়ত মানুষের হাসি-কান্নায়, কোন এক গীতি কবিতায় রাজীব মীর বেঁচে রবে চিরকাল।
দীপায়ন খীসা
রাজীব মীরের সুহৃদ


