জাতীয়

জুম ম্যাগাজিনে পাহাড়ীদের বেদনা ও আশার কথা রয়েছেঃ ঢাবি’তে কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন

অপূর্ব চাকমা: ‘জুম’ ম্যাগাজিনে পাহাড়ী ভাই-বোনদের হতাশার কথা রয়েছে। আশার কথা রয়েছে। তাঁদের মাতৃভাষাকে সম্মান করতেই হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া জুম্ম শিক্ষার্থীদের সাংস্কৃতিক সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির বার্ষিক সাময়িকী ‘জুম’ ম্যাগাজিন এর মোড়ক উন্মোচন ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্য উৎসবে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক ও বাংলা একাডেমীর সভাপতি সেলিনা হোসেন। গতকাল শনিবার বিকাল ৩.০০ টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার বকুলতলায় এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। সংগঠনটির সহ-সভাপতি নীতি চাকমার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক ও বাংলা একাডেমির সভাপতি সেলিনা হোসেন ছাড়াও সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি এন্ড বুদ্ধিস্ট স্ট্যাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জ্যোতিস্বী চাকমা, সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও চলচ্চিত্র নির্মাতা এডিট দেওয়ান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ঢাবি জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের সভাপতি ঐতিহ্য চাকমা।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেলিনা হোসেন আরো বলেন,আজকের অনুষ্ঠান ভিন্নতার অনুষ্ঠান, ভিন্ন ভাষার জাতিগোষ্ঠীদের অনুষ্ঠান। জুম ম্যাগাজিন প্রকাশ করাকে আমি সাধুবাদ জানাই। জুম ম্যাগাজিনে পাহাড়ি ভাই বোনেরা তাদের হতাশার কথা বলেছেন, তাদের আশার কথা বলেছেন। আজকের দিনটি নতুন একটি দিগন্তের সূচনা করলো। জুম ম্যাগাজিনের মাধ্যমে অনেকেই পাহাড়িদের সম্পর্কে, তাদের কষ্টের, সংগ্রামের ও হতাশার কথা জানতে পারবেন। আদিবাসী এবং বাঙালী লেখকদের সংমিশ্রণে একটি বইও প্রকাশ করা উচিত। এছাড়া আদিবাসীদের লেখা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করা উচিত যাতে বাঙালীরাও তাঁদের ভাষা সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী হন।

প্রধান অতিথির বক্তেব্য রাখছেন বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন

ঢাবির ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল বলেন, “আজকের এই অনুষ্ঠানটি প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ বহুসংস্কৃতি, বহু ভাষা, বহুত্ব জাতির মূর্ত প্রকাশ।” সৃজনশীলতা তখনই ভালোভাবে ফুটে ওঠে যখন নিজের ভাষায় তা প্রকাশ করা হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তও প্রথমে নিজের ভাষা ছেড়ে ইংলিশে সাহিত্যচর্চা শুরু করেন তখন তিনি নিজের মনের ভাব সহজে প্রকাশ করতে পারেন নি। পরে তিনি বাংলাতে নিজের সাহিত্য চর্চা করেন এবং বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করে খ্যাতি অর্জন করেন।
আদিবাসী বন্ধুরা অনেকে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা করলেও বাংগালী বন্ধুরা তাদের ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেন না। তাদের ভাষা রক্ষার করার কোনো আগ্রহই দেখান না। জুম্ম শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ”ভাষা একটা শক্তি, ভাষা হলো সম্পদ।”

এছাড়া জুম ম্যাগাজিনের এবারের প্রচ্ছদটি এঁকেছেন বিশিষ্ট আর্টিস্ট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তুফান চাকমা। এই প্রচ্ছদের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে ঢাবি’র অধ্যাপক মেসবাহ কামাল আরো বলেন, জুম্ম শিক্ষার্থীরা যেন তাদের শেকড়কে ভুলে না যায়। শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পেছনে পাহাড়ের প্রতিটা মানুষের অবদান রয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের পাশাপাশি আদিবাসীরাও রক্ত দিয়েছেন। ৫% আদিবাসী থাকা সত্ত্বেও মহান মুক্তিযুদ্ধে তাদের অবদান সত্যি চোখে পড়ার মত।মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সবার সমানাধিকারের কথা বলে হয়েছে, ভাষা ও সংস্কৃতির অধিকার রয়েছে এবং সকল জাতির জন্য তা সমান। উপজাতি শব্দটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক। আদিবাসীদের যারা উপজাতি বলেন তাদের সবাইকে তীব্র সমালোচনাও করেন তিনি।

তিনি আরো বলেন, আদিবাসী শিক্ষার্থীরা জুম ম্যাগাজিনের মাধ্যমে তাদের ভাবনাগুলো তুলের ধরার একটা মাধ্যম পেয়েছে। আদিবাসীদের না পাওয়ার বেদনা, অধিকারহীনতার বেদনা, কাপ্তাই বাধ থেকে শুরু করে সমকালীন পাহাড় দখল নিয়ে তাদের ভাবনাগুলো লেখা হয়েছে এ জুম ম্যাগাজিনটিতে। আদিবাসীরা সম্মানজনকভাবে জীবনযাপনের অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার, সাংস্কৃতিক অধিকার আদায়ের জন্য আদিকাল থেকে সংগ্রাম করে আসছেন। পাহাড়ে একটি চুক্তি হয়েছে। কিন্তু সেই চুক্তির অনেক বিষয়ই বাস্তবায়িত হয়নি। এই ক্ষোভ ও বেদনার একত্রিত প্রতিফলন আমি এই জুম ম্যাগাজিন এ দেখতে পেয়েছি।

অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় অংশ নেন ঢাবি জুম সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদের শিল্পীরা।

এমএন লারমার নেতৃত্বে জুম্ম জাতীয়বাদের জন্ম হয় এবং পাহাড়ে বসবাসরত পাহাড়িদের মধ্যে ঐক্যের সৃষ্টি হয়। পাহাড় ও সমতলের আদিবাসীরা একই পতাকাতলে কাজ করছেন উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এমএন লারমার উত্তরসূরী হিসেবে কাজ করে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটি পাহাড়ি শিক্ষার্থীদেরকেও করতে হবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি এন্ড বুড্ডিস্ট স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক জ্যোতিস্বী চাকমা বলেন, ঢাবি জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ ঢাবিতে পড়ুয়া পাহাড়ী শিক্ষার্থীদের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। এ সংগঠনের সদস্যগণ যেন প্রতিবছর তাদের সংগঠনের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত আদিবাসীদের সংস্কৃতি ও সাহিত্য প্রচার করার জন্য তাদের লেখালেখি, চিন্তাভাবনা ও অভিমতগুলো সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে তুলে ধরা দরকার। এধরণের সৃষ্টিশীল কাজগুলো যেন এ সংগঠনটি অব্যাহত রাখে সে আশা রাখবো।

চলচ্চিত্র নির্মাতা এডিট দেওয়ান বলেন, ২০১৭ সাল থেকে এ সংগঠনটি ঢাবির জুম্ম শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতি চর্চার একটি প্লাটফর্ম হিসেবে গড়ে উঠলেও এটি মূলত ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় রাঙ্গামাটিতে। বহুত্ববাদী সংস্কৃতিকে ধারণ করে এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে লালন করে এমন একঝাঁক তরুণ আদিবাসী শিক্ষার্থী এটি প্রতিষ্ঠা করে। পরে এটি ঢাবি কেন্দ্রীক হয়ে ওঠে। অস্তিত্বের সংকট, রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেওয়া এ সংগঠনের কাজ। এ সংগঠনটি প্রতিবছর বিজু-বৈসু-বিষু-বিহু-সাংগ্রাই-চাংক্রান উপলক্ষে ম্যাগাজিন প্রকাশ করে থাকে। এ সংগঠনটি ঢাবি কেন্দ্রীক হওয়ার অনেক আগে থেকেই জুম নামের ম্যাগাজিনটি প্রকাশিত হয়ে আসছে। এবারেও এটি প্রকাশিত হল। আমাদের পরিচয় নির্মাণের যে সাংস্কৃতিক লড়াই চলছে তাতে এ ধরণের আয়োজন চলতে থাকুক।”

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন ঢাবি জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের অর্থসম্পাদক স্বাগতম চাকমা। তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একমাত্র সাংস্কৃতিক সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ। আজকের এই সাংস্কৃতিক বৈচিত্র‍্য উৎসবের মাধ্যমে বাংলাদেশে মূল ধারার বাঙালি সংস্কৃতির পাশাপাশি পাহাড়ের যে বর্ণাঢ্য জুম্ম সংস্কৃতি এই দেশে আছে সেটাই আমরা তুলে ধরছি। আমরা চাই এই দেশে বাঙালি ভিন্ন অপরাপর আদিবাসী সংস্কৃতি চর্চা, প্রচার ও প্রসার ঘটুক। যার মাধ্যমে আমরা বহুত্ববাদী একটি বাংলাদেশ নির্মাণ করতে পারবো।

সমাপনী বক্তব্যে সংগঠিনটির সভাপতি ও এবারের জুম ম্যাগাজিনের সম্পাদক ঐতিহ্য চাকমা বলেন, আমরা চেষ্টা করেছি এই সংগঠনের মাধ্যমে পাহাড়ের বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্বর সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিচয় ঘটাতে। জুম ম্যাগাজিন প্রকাশনা ও এই আয়োজনটিও সে প্রয়াসের একটি অংশ। আমরা বিশ্বাস করি আমাদের পারষ্পরিক মেলবন্ধনের মধ্য দিয়েই তৈরী হবে সৈহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের পাতাতন। যার মাধ্যমে আমরা বহুত্ববাদী ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারবো। একাই প্রয়াসেই ‘জুম’ ম্যাগাজিন এর পথচলা এবং সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য উৎসবের আয়োজন। এসব নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে একটি বহুজাতির ও বহুসংস্কৃতির বাংলাদেশ নির্মাণ করতে সক্ষম হবো বলে আশা রাখি।
আলোচনা সভা শেষে জুম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদের শিল্পীদের পরিবেশনায় অনুষ্ঠিত হয় মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

Back to top button