জাতীয় সংসদের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন যা বললেন

জাতীয় সংসদের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের সম্পূর্ণ বক্তব্য আইপিনিউজের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হল:
মাননীয় স্পীকার,
আপনাকে ধন্যবাদ। জাতীয় সংসদের সুবর্ণজয়ন্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব সাধারণকে আমি সমর্থন করছি। আমার সৌভাগ্য হয়েছে এই সংসদে পাঁচবার নির্বাচিত হয়ে সংসদের কার্য্যক্রমে অংশ গ্রহণ করার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন সংসদের এই পঞ্চাশ বছরের যাত্রাপথ মসৃণ ছিলনা। এই সংসদের ওপর বারবার আঘাত এসেছে সংসদ বাতিল হয়েছে, সংসদকে ঠুটো জগন্নাথ বানানো হয়েছে। তবে এই পঞ্চাশ বছরের বিভিন্ন সময় জনগণের এ সংসদ সদস্যদের বীরোচিত সংগ্রাম সংসদকে তার নিজের জাগয়া ফিরিয়ে এনেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঠিকই বলেছেন, গত তিনটি সংসদ গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাই নজির স্থাপন করেছে। ব্যাপক উন্নয়নের ক্ষেত্র তৈরী করেছে।
মাননীয় স্পীকার,
১৫ আগস্ট ৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যার পর খুনী মুশতাক সংসদকে দিয়ে তার ক্ষমতার বৈধতা দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সংসদ সদস্যরা রাজী হয় নাই। পরবর্তীতে অভ্যূত্থান-পথটা অভ্যুত্থানে সংসদ বাতিল হয়। অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক ডিক্রিতে কেবল সংবিধান নয়, সংসদের ওপরও আঘাত হানে। সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীতে সংবিধানকে কেবল পাল্টে দেয়া হয় না। তার ঐসব সংশোধনী যাতে সংসদ বাতিল বা পরিবর্তন না করতে পারে সে বিধানও সংযোজন করা হয়। এই সংসদের সবচেয়ে কালো অধ্যায় ছিল বঙ্গবন্ধু হত্যা বিচার বন্ধ করে খুনী মুশতাকের জারী করা ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে আইনী ও সাংবিধানিক বৈধতা দান।
মাননীয় স্পীকার,
সেই কঠিন সময়েও তৎকালীন বিরোধী দলের সদস্যরা জিয়ার পঞ্চম সংশোধনীকে বৈধতা দিতে অস্বীকার করেছে। কেবল তাই-নয় ঐ সংসদে পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সামরিকীকরণ, জাতীয়করণকৃত শিল্পসমূহের বি-রাষ্ট্রীয়করণের বিরোধীতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, কৃষক সার ও পানির অধিকারের প্রশ্নে ঐ ঠুটো জগন্নাথ সংসদেও সংসদ সদস্যরা তাদের লড়াই অব্যাহত রাখেন।
মাননীয় স্পীকার,
উজার মৃত্যু সাপের হাতেই। আর তাই জিয়া আমলের উনিশতম অভ্যূত্থানে সে নিহত হলে, তার অল্প কিছু পরেই সামরিক শাসনে ক্ষমতা দখলকারী রাষ্ট্রপরিচালনায় সেনা বাহিনীর অংশীদারীত্ব সাংবিধানিক বিধানে পরিণত করার দাবি তুলে সংসদ বাতির করে। এর পর দীর্ঘ নয় বছরব্যাপী সামরিক শাসন প্রত্যাহার করে সার্বভৌম সংসদের নির্বাচন ও সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের এক অসমসাহসী লড়াইয়ে নব্বুইয়ের গণঅভ্যূত্থানে তিনজোটের রূপ রেখায় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন ঘটে। কিন্তু সার্বভৌম সংসদ ও সংসদীয় গণতন্ত্র প্রত্যাবর্তনের পথটিও সহজ ছিল না। বিএনপি-জামাতকে নিয়ে ক্ষমতা লাভ করে রাষ্ট্রপতি পদ্ধতি অব্যাহত রাখে।
মাননীয় স্পীকার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি এই সংসদে তিনজোটের রূপরেখার সংবিধানের পরিবর্তন না করা হলে পদত্যাগের যে হুমকি দেন তার প্রেক্ষাপটে বিএনপি-জামাত সরকার সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী উত্থাপন করে।
মাননীয় স্পীকার,
ঐ সংবিধান সংশোধনীর বিশেষ কমিটি আমি সদস্য ছিলাম। রাতের পর রাত বিতর্কের পরও সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন সম্ভব হলেও প্রধানমন্ত্রীর হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভবন, সংবিধানের চার মূলনীতিতে প্রত্যাবর্তন, সংসদ সদস্যদের স্বাধীন মতপ্রকাশে বিঘœ সৃষ্টিকারী ৭০ বিধি পরিবর্তন করা সম্ভব হয় নাই। বরং ঐ বিধিকে আরও কঠোর করা হয়েছে। সংবিধানের কমিটিসমূহের ক্ষমতায়নের বিষয়টিরও সমাধান হয় নাই। বরং একানব্বুইয়ের অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে ঐহিত্য তৈরী করা হয়েছিল তাকে গুড়িয়ে দিয়ে খালেদা জিয়ার সরকার মাগুড়া ও মীরপুর উপ-নির্বাচনের কলঙ্কিত ইতিহাস তৈরী করে।
মাননীয় স্পীকার,
দেশের মানুষকে অবাধ নির্বাচনের সংসদে ও সংসদের বাইরে আবার সংগ্রামে নামতে হয়। ঐ তীব্র আন্দোলনের মুখে ৬ষ্ঠ সংসদের নির্বাচন ছিল সংসদীয় নির্বাচন ও ব্যবস্থার প্রতি আরেকটি কুঠারাঘাত। সংবিধানের এয়োদশ সংশোধনীতে তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে সংযোজন করে খালেদা জিয়াকে কয়েকদিনের মাথায় পদত্যাগ করতে হয়। সপ্তম সংসদে সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর সভাপতি মন্ত্রীর জায়গায় সংসদ সদস্যদের বিধান সংযোজন ছিল সংসদের ক্ষমতায়নের এক নতুন অধ্যায়। কিন্তু ২০০১-এর ষড়যন্ত্রমূলক নির্বাচনে বিএনপি-জামাত ক্ষমতা তাদের প্রবর্তিত তত্বাবধায়ক সরকারে ও ভোটার তালিকায় যে পরিবর্তন আনে তাতে সুষ্ঠু নির্বাচন ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর অসম্ভব হয়ে পরে। ফলে শুরু হয় বিএনপি-জামাত জোট বিরোধী সংগ্রাম। সেই সংগ্রাম যখন সফল হতে চলেছে তখনই আবার সেনা শাসন। এবার আবার নতুন রাজনৈতিক পদ্ধতি প্রবর্তনের চেষ্টা হয়। কিন্তু জনগণের বিরোধীতার মুখে সেনা শাসনকে নির্বাচন দিতে হয়।
মাননীয় স্পীকার,
পঞ্চম সংশোধনীতে সংবিধানের ৪ মূলনীতি আমরা ফিরিয়ে এনেছি। ইতিমধ্যে সংবিধানে যে জঞ্জাল জমে গেছে সে জঞ্জালকে দূর করা এত সহজে সম্ভব হয় নাই। একদিকে ধর্ম নিরপেক্ষতার ১২ বিধিতে যে সজ্ঞা রয়েছে, যে সজ্ঞায় বলা হয়েছে কোন ধর্মকে রাজনৈতিক প্রাধান্য দেয়া হবে না রাজনীতিতে। সেখানে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম বিধান সাংঘর্ষিক হিসেবে এখনও বহাল রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু স্বীকৃতি দেয়া হলেও তাদের আদিবাসী হিসাবে স্বীকার করা হয় নাই। ফলে আদিবাসীদের মধ্যে অসন্তোষ এখনও বিরাজ করছে। ৭০ বিধি এখনও অবস্থান করছে বিএনপি তার ১০ ও ২৭ দফায় সংবিধান সংস্কারের কথা বলছে- তাদের লক্ষ্য সংবিধান বাতিল করা বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন পার্লামেন্টারী ট্রাডিশন গড়ে তুলব কারণ এই পদ জনগণের ক্ষমতার বাস্তবায়ন ঘটে, রাষ্ট্রপতি বলেছেন প্যার্লামেন্টে আইনজীবি কমে গেছে আইন প্রণয়নে বিশেষজ্ঞ আনতে হবে।
মাননীয় স্পীকার.
রাজনীতির ও নির্বাচনের বাণিজ্যায়নে এই সংসদের চেহারা পাল্টে যাচ্ছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্য হচ্ছে এই সংসদে সাধারণ মানুষের কথা কমে গেছে সালাউদ্দিন, আমিনুজ্জামন পঞ্চম সংসদের ১ ঘন্টা বক্তৃতার মধ্যে মাত্র ৩ মিনিট গরীব মানুষের গ্রামের মানুষের কথা হয়। বাকী কথা হয় নেতা সম্পর্কে, দলের সম্পর্কে, ফলে জাতীয় সংসদ সম্পর্কে জনগণ তার আগ্রহ কমে যাচ্ছে।
মাননীয় স্পীকার,
একটি অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে হলে, স্মার্ট সংসদ গড়ে তুলতে আমাদের সামগ্রীক বিষয়গুলোকে ভাবনায় নিয়ে সামনে এগোতে হবে। নতুন প্রজন্মকে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের উপযোগী করে তুলেই এগোতে হবে। সংসদকেও আধুনিক করে গড়ে তুলতে হবে।


