এক হাজার একর নয়, এক শতাংশ পাহাড়ি জমিও কেউ যেন ইজারা না পায়ঃ সৈয়দ আবুল মকসুদ

আজ ১৩ নভেম্বর, ২০২০ শুক্রবার, সকাল সাড়ে দশটায় , শাহবাগস্থ জাতীয় জাদুঘর এর সামনে পরিবেশবাদী যুব সংগঠন “গ্রীন ভয়েস” এর উদ্যোগে “বান্দরবানের চিম্বুক পাহাড়ে সিকদার গ্রুপের ভূমি দখল ও পাঁচ তারকা মেরিয়ট হোটেল নির্মাণ কাজ বন্ধের দাবীতে ” আয়োজিত এক ছাত্র-যুব সমাবেশে বিশিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবি সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেছেন, চিম্বুক পাহাড়ের জমি ম্রো’রা শত শত বছর ধরে ভোগদখল করছেন সেই ম্রোদের জমিতে ফাইভ ষ্টার হোটেল এবং অ্যমিউজম্যান্ট পার্ট বানানোর চক্রান্ত চলছে। সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি যে কর্মকর্তা এই জমি ইজারা দেওয়ার জন্য অনুমতি দিয়েছেন তাকেও আইনের আওতায় আনা হোক। আমরা এই সমাবেশ থেকে দাবী করছি এক হাজার একর নয় এক শতাংশ পাহাড়ি জমিও কেউ যেন ইজারা না পায়।
তিনি গ্রীন ভয়েসের সাত দফা দাবী উত্থাপন করেন।
সাত দফা দাবীতে বলা হয় ,চিম্বুক পাহাড়ে সিকদার গ্রুপসহ অন্যান্য সকল ভূমিদস্যুদের উন্নয়নের নামে হোটেল নির্মাণ বন্ধ ।সারাদেশে পাহাড় কাটা অবিলম্বে বন্ধ ,পাহাড়ী পরিবেশ সংরক্ষন ।পাহাড়ে অনাদিবাসী বাড়ীঘর, অবকাঠামো, স্থাপনা, শিল্প-কারখানা, খামার নির্মান নিষিদ্ধ ।পাহাড় কাটায় যুক্ত ব্যক্তি, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহন ।পাহাড় ও বনে বসবাসরত আদিবাসীদের উৎখাত প্রচেষ্টা বন্ন্ধ,তাদের ভূমি অধিকার, নিরাপত্তা ও জীবন-মান উন্নয়নে সহায়তা প্রদান।সকল পাহাড় ও পাহাড়ী বন সংরক্ষণ, সম্পদ ব্যবহার ও উন্নয়নের দায়িত্ব শুধুমাত্র পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নিকট ন্যস্ত করতে হবে। পাহাড় ও বন বিষয়ে সকল প্রকার প্রশাসনিক দূর্নীতি বন্ধ ।
গ্রীন ভয়েস এর পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সমন্বয়ক সাচিনু মারমার সভাপত্বিতে এবং গ্রীন ভয়েস এর কেন্দ্রীয় সহ-সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির সুমন এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এবং বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট লেখক-বুদ্ধিজীবি সৈয়দ আবুল মকসুদ, সিপিবি‘র কেন্দ্রীয় সম্পাদক, গ্রীন ভয়েসের উপদেস্টা রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাপার যুগ্ম সম্পাদক মিহির বিশ্বাস, আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং, নাগরিক সংগতির শরীফুজ্জামান শরীফ,আদিবাসী যুব ফোরাম এর আহবায়ক অনন্ত ধামাই -সহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিগন।
সমাবেশে রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, পাহাড়ি অঞ্চলে যে উন্নয়নের নামে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে তা বন্ধ করতে হবে ।তিনি চিম্বুক পাহাড়ে তথাকথিত ফাইভ ষ্টার নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবী জানান । তিনি বলেন উন্নয়নের নামে পাহাড়ে যে লুটপাট চলছে এই লুটপাট করতে দেওয়া হবে না। পাহাড়ির অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য নষ্ট করে, পাহাড়ী জনগনের সম্মতি না নিয়ে উন্নয়নের নামে পরিবেশ প্রতিবেশ ধ্বংস করা চলবে না ।তিনি ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তি পূর্ন বাস্তবায়ন ও ভূমি সমস্যা সমাধানের দাবী জানা।তিনি সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতির দাবী জানিয়ে আদিবাসীদের দাবী আদায়ের সংগ্রামে সকল বিবেকবান মানুষদের এগিয়ে আসার আহবান জানান।
আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং বলেন, আমি দেখেছি ১৯৯১ সালের আদম সুমারীততে ম্রো জনসংখ্যা ছিল ২২১৩৮ জন ।২০০১ সালে এবং ২০১১ সালে এই জনসংখ্যা রাষ্ট্রের কোন হিসাব পাওয়া যায়নি। আমরা এমনি আদম সুমারী করি যেখানে গত ৩০ বছরে মোট জনসংখ্যা কত সেটা জানা যায়না। এই যে, সংখ্যালঘু জাতি পাহাড়ি জাতি যারা যুগ যুগ ধরে বছর বছর ধরে হাজার বছর ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় বন জীব-বৈচিত্র্য পরিবেশ নদী শুধু বাংলাদেশের নয় পৃথিবীর জন্য সংরক্ষন করে আসছে। তাদের সঙ্গে কোন রকম আলোচনা ছাড়া, তাদের সম্মতি ছাড়া, কোন সংলাপ ছাড়া গায়ের জোরে, শক্তির জোরে, রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি ভূমি লোভি লোটেরা গোষ্ঠী যারা সেখানে ফাইভ ষ্টার হোটেল বানানোর জন্য ভূমি দখলে চেষ্টা করছেন। ম্রো জনগনের সঙ্গে আমরা যারা এদেশ কে ভালবাসি, আমরা যারা নদী পরিবেশ জীববৈচিত্র্যকে সংরক্ষন করার জন্য সংগ্রাম করি, আমরা একযোগে বলতি চাই, আমরা এই কাস্টমার এনসেসটেন ল্যান্ড বা ম্রোদের জমিতে এই প্রকল্প চাই না ।ম্রোদের কাছে এই ভূমি, পাহাড়, বন মায়ের মত, জননীর মত তাদের কাছ থেকে যদি এই ভূমি কেড়ে নেওয়া হয় তাহলে তাদের কাছ থেকে মা জননীকে কেড়ে নেওয়া হয়, সেটা আমরা হতে দিতে পারি না।
শরিফুজ্জামান শরিফ বলেন, আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিন্ন করার চক্রান্ত চলছে। কিছুদিন আগে আমরা দেখেছি সরকারের কর্মকর্তার নির্দেশে টাঙ্গাইলে এক আদিবাসীর কলাবাগান ধ্বংস করা হয়েছে। এক সময় অসাধু রাজনীতিবিদরা এই কাজগুলি করত এখন বড় বড় কোম্পানী গুলো নদী খায়, সাগর খায়, খাল খায়, বিল খায় তাদের খাদ্য তালিকাতে কোন কিছুই বাদ যায় না। এখন চিম্বুক পাহাড় খাওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে একটি অসাধু ব্যাবসায়ি চক্র। এটি চলতে দেওয়া যায় না আমরা চলতে দিব না।
মিহির বিম্বাস বলেন, উন্নয়নের নামে ম্রো জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা যাবে না পাহাড় ধ্বংস করে কোন অবকাঠামো নির্মাণ করতে দেওয়া হবে না।
অনন্ত ধামাই বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রতিদিন পাহাড় টিলা ধ্বংস করে নানা রকম আবাসন প্রকল্প গ্রহন করা হচ্ছে সরকারের নীতি নির্ধারকদের কাছে এই অবস্থা থেকে পরিত্রান চাই। আমাদের সার্বিক পাহাড়ী পরিবেশ সংরক্ষণ ও অস্থিত্বের স্বার্থেই আমাদের পাহাড়গুলোকে বাঁচাতে হবে।
সমাবেশে লিখিত বক্তব্যের বলা হয়,”শত শত বছর ধরে চিম্বুক পাহাড়সহ নীলগীরিতে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে প্রজন্ম পরম্পরায় ম্রো জনগোষ্ঠী বসবাস ও জীবিকা নির্বাহ করে আসছে, এই পাহাড় এ জাতিসত্তার জীবিকার প্রধান উৎস শক্তিহীন, ক্ষমতাহীন, অর্থহীন, এমনকি শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত এক পাহাড়ি সমাজ, যারা ধরিত্রী ও প্রকৃতি, বন ও পাহাড়ের বুকে বয়ে চলা নদী ও জলধারাকে, পরিবেশকে এতকাল রক্ষা করে এসেছে সবার জন্য। তারা এখন উপেক্ষিত, বিলুপ্তপ্রায় অসহায় এক জাতি। কিন্তু কয়েক বছর ধরে পর্যটনের নামে ম্রোদের প্রথাগত ভূমি চিম্বুক পাহাড়ের নানা অংশ বেদখল হয়ে গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়ে এখন প্রায় ১০০০ একর ভূমি জবরদখল করে সিকদার গ্রুপ নামের একটি চক্র এ পাহাড়ে পাঁচ তারকা হোটেল নির্মাণের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এটি হলে ম্রো জনগোষ্ঠীর কাপ্রু পাড়া, কলাই পাড়া, দলা পাড়া, এরা পাড়া ও রেমনাই পাড়া প্রত্যক্ষভাবে এবং পরোক্ষভাবে ৭০-১১৬টি পাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে, প্রায় ১০ হাজার জুমচাষি উদ্বাস্তু হওয়ার ঝুঁকিতে পরবে। একই সঙ্গে পাড়াগুলোর ৪০৫টি পরিবার তাদের প্রথাগত ভিটেমাটি হারা হবে।
পাহাড়ের হাজার হাজার একর ভূমি দখল হয়ে গেছে, বন উজাড় হয়ে গেছে অনেক আগে। এখানে বন, প্রকৃতি, নদী, জীববৈচিত্র্য-এসব মানুষের অত্যাচারে মুমূর্ষু। রাবারবাগান ও অন্যান্য প্রকল্পের নামে অনেক জমি দখল হয়ে গেছে। ট্যুরিজম বাড়াতে চাইলে পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে জায়গা নির্বাচন করুন।
সেনা কল্যাণ ট্রাস্ট কোনো সরকারী প্রতিষ্ঠান নয়। কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীর নাম ভাঙিয়ে এবং সেনাবাহিনীর প্রহরায় জমি দখল যেমন বেআইনি তেমনি সেনাবাহিনীর মানবাধিকারের ভাবমূর্তির জন্যেও ক্ষতিকর। যে সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তি রক্ষায় গৌরব উজ্জ্বল ভূমিকা রাখছে, সেই সেনাবাহিনী বিতর্কিত করপোরেট প্রতিষ্ঠান সিকদার গ্রুপের আর আর হোল্ডিংস এর সঙ্গে যোগসাযোগ করে নিজ দেশের অনগ্রসর পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জমি কেড়ে নিচ্ছে। দখলকৃত ভূমিতে বিলাসবহুল মেরিয়ট হোটেল এবং অ্যামিউজমেন্ট পার্ক হলে একদিকে ম্রো জনগোষ্ঠী উচ্ছেদ হবে অপরদিকে স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি বিতর্কিত হয়ে পড়বে।
আমাদের সংবিধানের ২৩ক অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, “রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন।” যদি তাই হয় তবে উন্নয়নের নামে হোটেল নির্মাণ করে পাহাড়ের নিজস্ব জীব বৈচিত্র্য ও স্থানীয়দের ঐতিহ্য নষ্ট করা থেকে বিরত থাকুন। রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে একটা এলাকার জনসমর্থন নিয়ে ভূমি অধিগ্রহণ করা যেতেই পারে। কিন্তু এ পাঁচতাঁরকা হোটেল, অ্যামিউজমেন্ট পার্ক ও পর্যটন স্পট তৈরীর প্রক্রিয়াটি ব্যক্তি বা ব্যবসায়ের স্বার্থে ভূমি বেদখলের অপচেষ্টা কোন সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কখনই কাম্য নয়।
সত্যিকারের উন্নয়ন করতে চাইলে পাহাড়ের পাড়ায় পাড়ায় বিদ্যালয় তৈরি করুন, হাসপাতাল তৈরি করুন। এখনও ওই সব দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সরকারি বিদ্যালয়ের অভাবে শত শত শিশু শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত, জরুরী চিকিৎসার অভাবে এখনও অনেক শিশু মারা যায়। আমাদের সার্বিক পাহাড়ী পরিবেশ সংরক্ষণ ও অস্তিত্বের স্বার্থেই আমাদের পাহাড়গুলোকে বাঁচাতে হবে ।”


