জাতীয়

৯০- এর স্বৈরচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা আব্দুস ছাত্তার খাঁনের মৃত্যুতে শোক সভা অনুষ্ঠিত:

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): ৯০- এর স্বৈরচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যর কেন্দ্রীয় নেতা প্রয়াত আব্দুস ছাত্তার খাঁনের মৃত্যুতে শোক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২৯ জানুয়ারী ২০২২ শনিবার সকাল ১০ টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-র সাগর রুনী হলে সাবেক এম,পি ৯০-এর সর্বদলীয় ছাত্র ঐকের নেতা নাজমুল হক প্রধানের সভাপতিত্বে এই শোক সভা অুনষ্ঠিত হয়।
সভায় প্রয়াত নেতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন করা হয়, সভায় অন্যান্যদের মধ্যে স্মৃতিচারণ মূলক আলোচনা অংশ নেন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কেন্দীয় নেতা যথাক্রমে-শফি আহম্মেদ, বেলাল চৌধুরী, মুনসুরুল হাই সোহান, সুজাউদ্দিন জাফর, রাজু আহম্মেদ, আসাদুর রহমান আসাদ, জায়েদ ইকবাল খান, মো: শহিদুল্লা, রেজাউর রশিদ প্রমুখ।
শোক সভা সঞ্চালনা করেন সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কেন্দীয় নেতা সালেহ আহমেদ ।

সভায় শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করে সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের কেন্দ্রীয় নেতা খন্দকার মোখলেস উদ্দীন শাহীন। প্রয়াত আব্দুস ছাত্তারের সংক্ষিপ্ত জীবনী উপস্থাপন করেন, তৎকালীন ছাত্র নেতা সিরাজুমমনির।
সভায় প্রয়াত আব্দুস সাত্তারের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বক্তারা বলেন, ১৯৯০ সালের ইস্পাত কঠিন শপথের মধ্য দিয়ে সামরিক স্বৈরশাসনের অবসান ঘটিয়ে একটি বৈষম্যহীন, একমুখী ও বিজ্ঞান মনষ্ক শিক্ষা ব্যবস্থা ও বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তোলার যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়েছিল, র্দুভাগ্যজনক ভাবে আজও রাষ্ট্রে তার প্রতিফলন ঘটেনি। বরং সমাজে ও রাষ্ট্রে লুষ্ঠন, দুর্নীতি, ধর্মান্ধতা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেছে । আব্দুস সাত্তার খানের কাঙ্খিত স্বপ্নের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আবারও দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দূর্বৃত্তায়নের রাজনীতি ধর্মান্ধতা ও বৈষম্য নিরসন করতে হবে।
সভায় আগামী ১৪ ফেব্রæয়ারি স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৯৮৩ সালের মধ্য ফেব্রæয়ারি কুক্ষাত শিক্ষামন্ত্রী মজিদ খানের শিক্ষা নীতি বাতিলের দাবিতে ছাত্র মিছিলে পুলিশী হামলায় নিহত জাফর-জয়নাল দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় দেশব্যাপী পালন করার আহ্বান জানানো হয়।

উল্লেখ্য আব্দুস সাত্তার খান ১৯৫৭ সালের ১৫ জানুয়ারী পাবনা জেলার সুজানগর থানার নাজিরগঞ্জ ইউনিয়নের নারায়নপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মোঃ বছির উদ্দিন খান ও মাতার নাম গুলজান আরা। বাবা-মায়ের ৭ম সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন ৫ম। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী এবং অত্যন্ত সাহসী। অন্য মানুষদের সাহায্য করা, উপকার করা ছিল তাঁর নেশা। এলাকার বরকাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাশ করেন। তারপর ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হন নাজিরগঞ্জ বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ে। হাইস্কুলে পড়ার সময় থেকেই বিভিন্ন খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সাথে তিনি জড়িত ছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি যখন দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলেন তখন দেশে চলছিল স্বাধীনতা যুদ্ধ। এলাকার আওয়ামী লীগের নেতারা রাতে তাদের বাড়িতে আসতেন এবং যুবকদের রাইফেল চালানো শেখাতেন। আব্দুস সাত্তার খানদের বাড়িকে নিরাপদ মনে করে সেখানে অস্ত্র রেখে যেত। আবদুস সাত্তার খানও তাদের সাথে ছিলেন। এইভাবে ট্রেনিং নেয়া তাঁর ভালো লাগছিল না। দেশে তখন অভাব অনটন চলছিল। একদিন সকালে আবদুস সাত্তার খান পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় বাজার করতে নিকটস্থ বাজারে যান। নাজিরগঞ্জ বাজার পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত। নদীর ধারে গিয়ে দেখেন পাশের এলাকার (তার মামার বাড়ির এলাকা)পরিচিত কিছু লোক ভারতে যাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং এর জন্য। সংসারের প্রয়োজনীয় বাজার না করেই তিনি বাড়িতে ফিরে আসেন এবং মা বাবার থেকে অনুমতি নেন যে তিনি ট্রেনিং নিতে ভারত যেতে চান। যে বাবার বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের ক্যাম্প, তিনি কি অনুমতি না দিয়ে পারেন? বাজারের জন্য সামান্য টাকা এবং কিছু কাপড়চোপড় নিয়ে গেলেন সেই নৌকার নিকট। বাবার অনুমতি পেয়ে যুবক সাত্তার খানকে তারা সাথে নিলেন। নৌকা যোগে পাবনা থেকে ভারত যাওয়া খুব সহজ ছিল না। পথে অনেক বাধা বিপত্তি পাড়ি দিয়ে অবশেষে তারা ভারত পৌছান। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে রাজশাহী অঞ্চলে যুদ্ধ করেন। এরপর দেশ স্বাধীন হয় কিন্তু আবদুস সাত্তার খান ফিরে আসেন নাই। মা বাবার অপেক্ষার পালা যেন আর শেষ হয় না। মানুষের মুখে বিভিন্ন রকম কথা, অনেকে বললো, হয়ত মারা গেছে। কিন্তু মা বাবার মনে অন্য কথা। সন্তান ফিরে আসবেই ইনশাআল্লাহ। একদিন দুপুর বেলা ঠিকই সাত্তার খান দেশ স্বাধীন করে ফেরত আসলেন বীরের বেশে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে তাদের বাড়িটা ছিলো এলাকার হিন্দু পরিবারগুলোর জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল। অনেক হিন্দু পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন তাদের বাড়িতে। আবার অনেকে মালামাল রেখে ভারতে চলে গিয়েছিলেন।দেশ স্বাধীনের পরে দেশে ফিরে তারা তাদের মালামাল অক্ষত অবস্থায় ফিরে পান। ৭১ সালের যুদ্ধের কারণে মেট্রিক পরীক্ষা না হওয়ায়, আবদুস সাত্তার খান ৭২ সালে মেট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।এরপর ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হন পাবনা শহীদ বুলবুল কলেজে। তরুণ মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সাত্তার খান কলেজে পড়ার সময়েই ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পরেন। ১৯৭৪ সালে শহীদ বুলবুল কলেজ থেকে সাফল্যের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। এরপর ঢাকায় চলে আসেন উচ্চশিক্ষার জন্য। ঢাকায় এসে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজে ভর্তি হন এবং পুরোদমে ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন।
ছাত্র রাজনীতির ধারাবাহিকতা ও নীতিনিষ্টতায় তিনি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বাসদ) কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সাহসী ভূমিকায় অবর্তীন হন। ছাত্র রাজনীতি শেষে তিনি আমৃত্যু দেশে গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখতে সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। গত ১৩ অক্টোবর ২০২১ দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সার ও করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসারত অবস্থায় তিনি মৃত্যু বরণ করেন।

Back to top button