সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত স্বদেশ প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু নিবেদিত ছিলেন অধ্যাপক অজয় রায়ঃ স্মরণসভায় বক্তারা

বিজ্ঞানমনস্ক, উদার ও মননশীল চিন্তার অগ্রসৈনিক হিসেবে আমৃত্যু বৈষম্য-শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থার লড়াইয়ে নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন। তিনি শ্রমজীবী, মেহনতী মানুষের মুক্তির সংগ্রামে সহায়ক ভূমিকায় জীবন উৎসর্গ করে গেছেন এমন সৃজনশীল চিন্তার মানুষ এখন বিরল। পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে সমাজ প্রগতির লড়াইয়ে নিজের চিন্তার আলোকে বিজ্ঞান আন্দোলনের পথে হেঁটেছেন আমৃত্যু। গতকাল ১০ ডিসেম্বর, শুক্রবার রাজধানীতে সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও সহ-সভাপতি শিক্ষাবিদ, পদার্থবিজ্ঞানী অধ্যাপক অজয় রায়ের দ্বিতীয় মৃত্যুদিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনায় নেতৃবৃন্দ উল্লিখিত মন্তব্য করেন।
সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌসের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের প্রেসিডিয়াম সদস্য জননেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য (ভার্চুয়াল), ড. সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ কে আজাদ, জহিরুল ইসলাম জহির, অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম, সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য অ্যাডভোকেট পারভেজ হাসেম, মাসুদ মাযহার, বিপ্লব চাকমা, কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল ওয়াহেদ, বেলায়েত হোসেন, রাইজিংবিডির সাংবাদিক হাকিম মাহি, ঢাকা মহানগর সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির নেতা জুবায়ের আলম, ছাত্র নেতা আব্দুল মোতালেব জুয়েল প্রমুখ। সভা সঞ্চালনা করেন সাধারণ সম্পাদক সালেহ আহমেদ।
সভায় পঙ্কজ ভট্টাচার্য বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অসাম্প্রদায়িক জাতি গঠনে অধ্যাপক অজয় রায়ের যে ত্যাগ, তা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাহস অনেকের নেই। অধ্যাপক অজয় রায় সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় দৃঢ়তা নিয়ে সারাদেশে ঘুরেছেন সন্ত্রাসবাদ, লুটেরা, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষকে জেগে উঠার স্বপ্ন দেখিয়েছেন। তার মহাপ্রয়াণে সংখ্যালঘু, আদিবাসী জনতার টিকে থাকার লড়াইয়ের নিবেদিত একজনকে আমরা হারিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াইয়ে আমাদের সবাইকে অজয় রায়ের সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।
ছাত্র জীবনের তাকে পেয়েছি শিক্ষক হিসেবে, তারপর মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি শিক্ষক নেতা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, সাহসীযোদ্ধা, পরবর্তী সময়ে মানবমুক্তির লড়াইয়ে তার সহযোগী হিসেবে সারাদেশ ঘুরেছি। কখনো অন্যায়ের সাথে আপোষ করতে দেখিনি। ২০০১ সালে সংখ্যালঘুদের উপর যে নির্মতা নেমে আসে সেই সময় তিনি ছিলেন সোচ্চার। যেখানেই নিপীড়ন, সেখানে ছুটে চলেছেন অবিরাম। প্রতিকার দাবি করেছেন, মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন সাহস যুগিয়েছেন। আমৃত্যু তার সানিধ্যে থেকে মানবতার মুক্তির লড়াইয়ে তাকে অবিচল দেখেছি।
দুর্ভাগ্য হলো- শেষ জীবনে ঘাতকদের হাতে পুত্রকে হারিয়েও তিনি সাহসের সাথে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়েছেন, পুত্র হত্যার বিচার দেখে যেতে চেয়েছিলেন, পুত্র হত্যার বিচার তিনি দেখে যেতে পারেননি।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরের শেষ প্রান্তে এসে আজকে অধ্যাপক অজয় রায়ের আমৃত্যুর যে লড়াইয়ের কথা বলেছেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার। পাকিস্তানীদের কাছ থেকে বাংলাদেশের ন্যায্য পাওয়া আদায় করা। ৩০ লক্ষ মানুষকে হত্যার দায়ে পাকিস্তানকে ক্ষমা চাইতে হবে। সে লড়াইয়ের অগ্রসর করে নিতে হবে। পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে সহায়তা করার জন্য বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র ভারত বর্ষের যে ত্যাগ তা আমাদের স্মরণ রাখতে হবে। আন্তদেশীয় সম্পর্কের উন্নয়নে ভারতের সাথে সহযোগিতা করে সাম্প্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় দৃঢ় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।
অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, সীমাহীন দুঃখ-কষ্ট ও অপমান সহ্য করে ড. অজয় রায় মারা গেছেন। পুত্র হত্যার বিচার প্রক্রিয়ায় আদালতকে প্রশ্ন করেন “আমাকে আরও আসতে হবে!” অজয় রায় একজন পদার্থবিজ্ঞানী হয়েও ইসলামী স্থাপত্য ও দর্শন নিয়ে অসামান্য পান্ডিত্যপূর্ণ প্রজ্ঞা রাখতেন। ধর্মান্ধতা আজ সমাজকে ঘ্রাস করে ফেলেছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে অধ্যাপক অজয় রায়ের মতো অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক ও মানবিক সংগঠক প্রয়োজন। সুস্থ সমাজবিনির্মাণে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের বিকল্প নেই বলেও মনে করেন এই শিক্ষক।
ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, অধ্যাপক অজয় রায়ের মতো একজন ধীমান ও জ্ঞানতাপস বুদ্ধিজীবী খুবই প্রয়োজন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ফিরে পেতে হলে তাদের মতো মনীষীদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আমাদের তরুণ প্রজন্মকে জানাতে হবে।
উল্লেখ্য অজয় রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়য়ের অধ্যাপক পদার্থবিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ ও সমাজ কর্মী। গতকাল ৯ ডিসেম্বর অজয় রায়ের ২য় মৃত্যুবার্ষিকী। অজয় রায় এর মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা এবং অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে, স্থিতিশীল ও সম্প্রীতির স্বদেশ প্রতিষ্ঠার দৃঢ় প্রত্যয়ে ১৯৯৮ সালে ব্যাপক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে দেশের প্রগতিশীল, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতা কর্মীদের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন গঠনে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। এই সংগঠনের তিনি প্রতিষ্ঠাতা সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
অজয় রায়ের জন্মঃ ১ মার্চ ১৯৩৫ দিনাজপুর। মৃত্যুঃ ৯ ডিসেম্বর ২০১৯ [বয়স ৮৪] । শিক্ষা ও কর্ম জীবনঃ স্কুল এবং কলেজ জীবনে পড়াশোনা করেছেন দিনাজপুরে। ১৯৫৭ সালে এমএসসি পাশ করে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে । তিনি ১৯৫৯ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগে শিক্ষকতা করেছেন । অতঃপর ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের লীডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৬৭ সালে সেখানেই করেন পোস্ট ডক্টরেট । ১৯৬৭ সালে শিক্ষক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুনরায় যোগদান করেন এবং অবসর নেয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন । দেশি এবং বিদেশি বহু জার্নালে তাঁর নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তিনিবাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন ছিলেন । তিনি আমৃত্যু সম্প্রীতি মঞ্চের সভাপতি, বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং এশিয়াটিক সোসাইটির বিজ্ঞান বিভাগের সম্পাদক ছিলেন । তাছাড়া তিনি শিক্ষা আন্দোলন মঞ্চের সভাপতি এবং দক্ষিণ এশীয় মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী সংগঠনের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যও ছিলেন। তিনি মুক্তমনার উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য এবং মুক্তান্বেষার সম্পাদক ছিলেন। কলামিস্ট হিসবেও তিনি বিভিন্ন দৈনিকে লেখালেখি করতেন । মৃত্যুর পূর্বাবধি তিনি বাংলা একাডেমির ৩ খণ্ডে ‘বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস’ গ্রন্থেও সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন ।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকাঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক অজয় রায়ের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিলেন । ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী নৃশংস গণহত্যা শুরু করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসস্থল ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন তিনি।