মহান মুক্তিযুদ্ধে চাকমা জনগোষ্ঠীর ভূমিকাকে অস্বীকার করে বক্তব্য: সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদের ঝড়

আইপিনিউজ ডেস্ক (ঢাকা): ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চাকমা জনগোষ্ঠীর উল্লেখযোগ্য ভূমিকাকে অস্বীকার করে বক্তব্য দেওয়ার প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদ ও সমালোচনার ঝড় বইছে।
বিস্তারিত: গত ৩০ আগস্ট ২০২৫, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় যমুনা টিভির নিয়মিত আয়োজন “DUCSU: THE STUDENTS VOICE”-এ অংশগ্রহণ করেছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)’র মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বিষয়ক সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দিতা করা ৬ জন পদপ্রার্থী।
আলোচনার এক পর্যায়ে বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্র শিবির সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোটের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদপ্রার্থী ফাতিমা তাসনিম জুমা ”মুক্তিযুদ্ধে চাকমাদের কোন স্টেক ছিলোনা” বলে একটি মন্তব্য করেন। জনসমক্ষে এ ধরণের বক্তব্যর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহলে বইছে সমালোচনা ঝড় । এ বক্তব্যের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন করেছে স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল। সংবাদ সম্মেলনে এই প্যানেলের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদপ্রার্থী নূমান আহমদ চৌধুরী বলেন, এই মন্তব্য মহান মুক্তিযুদ্ধে অবাঙালী জাতিগোষ্ঠীর যে অবদান ছিল, তাদের জন্য চরম অবমাননাকর। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল মনে করে, মুক্তিযুদ্ধে বাঙালি, অবাঙালি, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সব মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। তিনি আরো বলেন, ২৫ মার্চ মধ্যরাতে গণহত্যা পরবর্তী সময়ে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন ইপিআরের সদস্যরা। তাঁদের মধ্যে অন্তত ২০ থেকে ২২ জন চাকমা ছিলেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধে চাকমাদেরও শহীদ রয়েছেন।’
প্যানেলের কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক প্রার্থী সুর্মী চাকমা এ বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়ে বলেন, ফাতেমা তাসনিম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ধরণের ন্যাক্কারজনক ও মিথ্যা বক্তব্য প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, চাকমা জাতিসত্ত্বার মধ্যে কে কে রায়, হেমরঞ্জন চাকমা, অমৃতলাল চাকমা, সঞ্জয়কেতন চাকমা, স্নেহকুমার চাকমা, মতিলাল চাকমাসহ অনেক চাকমা মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলো।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য প্যানেল এ ধরণের বক্তব্যকে ডাকসুর গঠনতন্ত্রের সাথে সাংঘর্ষিক এবং ২৪ ঘন্টার মধ্যে এ বক্তব্যের সুস্পষ্ট ব্যাখ্য দাবি করে। ব্যাখ্যার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ারও অনুরোধ জানায় তারা।
এদিকে এ বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক-এ চলছে সমালোচনার ঝড়। নেটিজেনরা বলছেন, জুমা’র এ ধরণের বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সাংঘর্ষিক। তার এ বক্তব্য জন মানুষদের মনে চাকমা বিদ্বেষী মনোভাব সৃষ্টি করতে পারে। একই সাথে তার এ বক্তব্যর মাধ্যমে শুধুমাত্র চাকমা সম্প্রদায় নয়, মুক্তিযুদ্ধে দেশের আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোর ভূমিকাকে চরমভাবে অবমাননা কর হয়েছে। এ বক্তব্যর জন্য তার জনসমক্ষে ক্ষমা চাওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করছেন অনেকে।

উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় পাকিস্থানের পক্ষাবলম্বন করলেও চাকমা রাজপরিবারের সদস্য কে কে রায় ছিলেন একজন সক্রিয় ও নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা। রাঙামাটি জেলা শহরে ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে গঠিত সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রনেতা ছিলেন রাঙামাটি সরকারি কলেজের গৌতম দেওয়ান। ইপিআর সদস্য হেমরঞ্জন চাকমা, রঞ্জন চাকমা, খগেন্দ্র চাকমা, অ্যামি মারমা প্রমুখ মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। এছাড়া বিমলেন্দু দেওয়ান, আনন্দ বাঁশি চাকমা, কৃপাসুখ চাকমাসহ ২০—২২ জন সরকারি কর্মকর্তা ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আরও উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে শতাধিক আদিবাসী ছাড়াও সমতল অঞ্চলের হাজার হাজার আদিবাসী মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে।