Uncategorizedজাতীয়শিক্ষা

মধুপুরে বসতভিটায় আক্রমণ ও উচ্ছেদ চেষ্টার ঘটনাবলী সরেজমিন পরিদর্শন করলেন প্রতিনিধি দল

টাঙ্গাইলের মধুপুরের চাঁদপুরে বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশন, রাবার বাগান কর্তৃপক্ষ ও আনসার বাহিনীর সদস্যরা গত সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬, স্থানীয় গারো আদিবাসী নারী ও শিশুদের উপর ন্যাক্কারজনক হামলা চালায়। একই সাথে তারা আদিবাসীদের বসতভিটা ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং নিজ ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করার অপচেষ্টা চালায়। যার ভয়াবহ চিত্র ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে।

মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলী সরেজমিন পর্যবেক্ষণের জন্য ঢাকা থেকে আজ সিটিজেনস ফর হিউম্যান রাইটস-এর একটি প্রতিনিধি দল টাঙ্গাইল মধুপুরের চাঁদপুরের পূর্ব ধরাটি গ্রামে ঘটনাস্থলে যান। ১৬ মার্চ সোববার বেলা ১২টায় প্রতিনিধি দল মধুপুরের পূর্ব ধরাটি গ্রামে পৌঁছান এবং আক্রান্ত আদিবাসী পরিবারগুলোর সাথে সাক্ষাৎ করেন।

প্রতিনিধি দলের মধ্যে ছিলেন সিপিবি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন, মানবাধিকার কর্মী দীপায়ন খীসা ও আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি টনি ম্যাথিউ চিরান, ব্লাস্ট এর টাঙ্গাইলের স্টাফ ল্ য়ার শামসিন্নাহার লিজা, বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা প্রমুখ।

এসময় সাংবাদিক ও ভুক্তভোগী আদিবাসীদের সাথে মতবিনিময়কালে সিপিবি‘র সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আমরা এসেছি আপনাদের সংকটে পাশে দাঁড়াতে। আপনারা যেন এখানে স্থায়ীভাবে টিকে থাকতে পারেন তার জন্য আমরা পাশে আছি। একটা ইতিবাচক বিষয় হল এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসন অন্তত একটা তৎক্ষণাৎ রেসপন্স করেছেন। আমরা তাদেরকে ধন্যবাদ জানাই। আমরা আশা করবো এরকম ঘটনা যেন আর কোথাও ঘটতে না পারে তার জন্য স্থানীয় নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনসহ সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা জানিয়ে নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন বলেন, আমরা এই প্রথম দেখলাম প্রশাসন একটা ইতিবাচক ও দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। অভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশে প্রশাসনের এরকম উদ্যোগ দেখে ভালো লাগল। তবে কোনো নাগরিক যেন এভাবে আক্রান্ত না হয় এবং ক্ষতিগ্রস্থ না হয় তার জন্য প্রশাসনকে আরো সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন দেশে কেউ বৈষম্যের মধ্যে থাকবে না। তবে এ কথার বরখেলাপ যদি হয় তখন আমরা রুখে দাড়াঁবো। যখন যেখানে যেমন খুশি এসে উচ্ছেদ করবে, বাস্তুভিটা ভেঙে দিবে তা হতে পারে না। আমরা দেখলাম এখানে সেনিটেশন ব্যবস্থা ভালো না, শিক্ষার ভালো সুযোগ নেই এবং পরিবারটি দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। প্রশাসনের উচিত হবে এসব বিষয়ে দৃষ্টি দিয়ে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা।

লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ বলেন, প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে কেন এই পদক্ষেপ নেওয়ার পর্যায়ে চলে যাবে তাও আমাদের সজাগ থাকতে হবে। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিককে যেন এভাবে হয়রানি করা না হয়। আর এখানে যারা গারো, কোচ, বর্মন আদিবাসীরা আছেন তাঁদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আদিবাসীদের বন ও ভূমি রক্ষার লড়াই দীর্ঘদিনের। কাজেই আমাদের ঐক্যের উপরই নির্ভর করবে এই আদিবাসীদের নিরাপত্তা। কাজেই স্থায়ী নেতৃবৃন্দ ও জাতীয় নেতৃবৃন্দসহ সংবেদনশীল সকল পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

পর্যবেক্ষণে জানা যায়, ৬০ বছর বয়সী রমেন কুবি আট বছর আগে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ৫ শতাংশ জমির উপর বাড়িঘর নির্মাণ করেন। ঐ জমিতে তিনি আম, কাঠাল গাছও রোপন করেছিলেন। কিন্তু গৃহবর্ধনের কাজ শুরু করলে বাংলাদেশ বন শিল্প উন্নয়ন কর্পোরেশন তাকে বাঁধা দেয় এবং ঘরের খুটি ভেঙে ফেলে এবং আম ও কাঠালের গাছ উপড়িয়ে ফেলে।

টাঙ্গাইলের মধুপুরের চাঁদপুর রাবারবাগানের কালো পাহাড় এলাকায় গত সোমবার (৯ মার্চ ২০২৬) তাঁরা সেখানে নতুন ঘর তৈরীর খবর পেয়ে বন শিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের আওতাধীন রাবারবাগানের মাঠ কর্মকর্তার নেতৃত্বে কয়েকজন আনসার সদস্য গারো দম্পতির নির্মাণকাজে বাধা দেন। তাঁরা ঘরের খুঁটি ভেঙে ফেলেন। এ সময় আনসার সদস্যদের সঙ্গে ওই পরিবারের সদস্যদের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এ ঘটনার একটি ভিডিওতে আনসার সদস্যদেরকে গারো পরিবারের এক নারী সদস্যের দিকে রাইফেল তাক করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে দেখা যায়। এ বিষয়টি জানতে পেরে পরদিন মঙ্গলবার মধুপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মির্জা জুবায়ের হোসেন ঘটনাস্থলে যান। তিনি রাবারবাগান কর্তৃপক্ষ এবং ভুক্তোভোগী রমেন কুবি ও শিবলী মাংসাং দম্পতির সঙ্গে কথা বলেন।

এছাড়া ইউএনও ঘর নির্মাণের জন্য ওই পরিবারকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই বান্ডেল ঢেউটিন ও ছয় হাজার টাকা এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ব্যয় বহনের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই সেসব পৌঁছে দেয়াও হয়েছে। এছাড়া ইউএনও এবং ওসিকে না জানিয়ে ভবিষ্যতে এ ধরনের অভিযান না চালাতে সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

উক্ত পরিদর্শনের সময় উপস্থিত ছিলেন ৪ নং কুরাগাছা ইউনিয়নের সদস্য অর্চনা নকরেক, জয়েনশাহী আদিবাসী উন্নয়ন পরিষদের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মর্নিংটন চিরান, উক্ত সংগঠনের ধরাটি-মমিনপুর আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক চন্দন চিরান প্রমুখ।

Back to top button