
সূচী মারমাঃ প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে ৮ মার্চ পালিত হয় আন্তর্জাতিক নারী দিবস। ঐতিহাসিকভাবে পুরুষতান্ত্রিক বিশ্ব ব্যাবস্থায় লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে নারীর প্রতি সম্মান ও সমঅধিকার জানানোই নারী দিবস উৎযাপনের মূল লক্ষ্য। । এটি এমন একটি দিন যা স্মরণ করিয়ে দেয় প্রতিটি নারীকে সম্মান জানানোর এবং পৃথিবীব্যাপী লিঙ্গ বৈষম্য দূর করে সমতার বিশ্ব গড়ার। ২০২৩ সালের নারী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হল “ডিজিটাল প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন জেন্ডার বৈষম্য করবে নিরসন”।
আশেপাশে একটু খোজ নিলে অবশ্যই জানতে পারবেন, নারীরা ভাল নেই। দেশের প্রান্তিক আদিবাসী নারীরাও ভাল নেই। আদিবাসী নারীরা বৈষম্যের শিকার হন আদিবাসী হবার কারণে, তার নারী পরিচয়ের কারণে এবং তার প্রান্তিকতার জন্য।
আমাদের আদিবাসী নারীদের ঘরের বাইরে পা রাখলেই পাশ দিয়ে শুনতে হচ্ছে বিভিন্ন অকথ্য মন্তব্য। ইভটিজিং, শারীরিক লাঞ্ছনা, ধর্ষণ, হত্যা এবং ভূমি থেকে উচ্ছেদের মতন আতংক নিয়ে বাস করছে প্রান্তিক আদিবাসী নারীরা। প্রতিদিন হাজারো প্রতিকূল অবস্থার সাথে লড়াই করে আদিবাসী নারীদের টিকে থাকতে হয়। আর টিকর থাকার সমস্ত অবলম্বন হারিয়ে গেলে দেশান্তরী হয়ে যাচ্ছেন। এখনো অনেক আদিবাসী অঞ্চলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্যাক্তি বা সামাজিক উদ্যোগে বিভিন্ন জায়গায় স্কুল নির্মান করলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই স্কুল ঠিকমত পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছেনা। আবার স্কুল নির্মান হলেও পারিবারিক বৈষম্যের কারণে অনেক আদিবাসী নারী শিশুদের পড়াশোনা করার সুযোগও হয়না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের কারণে আদিবাসী নারীরা দেশের বাঙ্গালী নারীদের তুলনায় পিছিয়ে আছে। অনেক অঞ্চলের প্রান্তিক আদিবাসী নারীদের কাছে প্রযুক্তি এখনো বিলাসিতা।
পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরী আর নারী শ্রমিকের মজুরীর বৈষম্য এখনো বিদ্যমান। অথচ ঐ নারী শ্রমিক তার সারাদিন কাজের শেষে ঘরে ফিরেও পরিবারের সবার জন্য খাবার রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পরে, ঘুমোতে যাবার আগ পর্যন্ত তাকে কাজ করতে হয়। কারণ সে নারী, নারীর যেন ক্লান্তি নেই! নারীর শ্রমের মর্যাদা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এখনো অনেক কাজকেই ‘নারী’দের কাজ ভাবা হয়।
আবার স্বামীদের তুলনায় তাদের স্ত্রীরা স্মার্টফোন ব্যবহারেরও কম সুযোগ পান। নিজের কাছে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার না থাকায় নারীরা এখনো প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবনের দিকে যেতে পারেনি। আদিবাসী নারীরাও তথ্য প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে আছে।
তবে শহরে বসবাসরত আদিবাসী নারীদের মধ্যে অনেকেই এখন প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে অনলাইনভিত্তিক ব্যবসা, ভ্লগ ও নানাবিধ কার্যক্রমে নিজেদের যুক্ত করা শুরু করেছে। অনেকেই তাদের প্রথাগত জ্ঞ্যানকে কাজিয়ে লাগিয়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। তবে এখানেও প্রযুক্তিগত জ্ঞ্যানের সীমাবদ্ধতা ও অন্যান্য পারিপার্শ্বিক অবস্থার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে আদিবাসী নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো নিশ্চিত করতে হবে রাষ্ট্রকেই।
এই দিবসটি উৎযাপনের পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সুতা কারখানার নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ে সংগ্রামের ইতিহাস। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতান্ত্রিকরা। নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্রেট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে ১৯০৯ সালে ২৮ ফেব্রুয়ারি আয়োজিত নারী সমাবেশে প্রথম নারী সম্মেলন হয়।
এরপর ১৯১০ সালে ডেনমার্কে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এ সম্মেলনে জার্মানীর সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নেত্রী ‘ক্লারা জেটকিন’ নারীদের অধিকার আদায়ের দাবিতে প্রতি বছর ৮ই মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। এই সম্মেলনে ১৭ টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি অংশগ্রহন করে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯১৪ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে নারী দিবস পালন শুরু হয়। ১৯৭৫ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের স্বীকৃতি লাভ করে। দিবসটি পালনের জন্যে জাতিসংঘ বিভিন্ন দেশকে আহ্বান জানায়। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে এই দিবসটি।
বাংলাদেশেও দিবসটি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার আগে থেকেই পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশে বসবাসরত ৫০ টির অধিক জাতিগোষ্ঠীর আদিবাসী নারীরাও তাদের অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দিবসটি পালনসহ আন্দোলন করে আসছে।
পুরুষ শাসিত সমাজে নারীদের বৈষম্যের শিকারের সূচনা নিজের ঘর থেকেই। নারী পরিচয়ের কারণে ঘরে ও ঘরের বাইরে রাস্তাঘাট, বাজার, কর্মক্ষেত্র এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও সম্মুখীন হতে হয় বিভিন্ন বৈষম্যের,লাঞ্ছনার। এর মধ্যে আদিবাসী নারীদের অবস্থা আরও শোচনীয়।আদিবাসী নারীদের প্রতি নেতিবাচক আকর্ষণ অনুভব করছেন দেশের বেশিরভাগ পুরুষ। অনলাইনে নানাবিধ প্রতারণার শিকার হচ্ছে আদিবাসী নারীরা। আদিবাসী নারীদের অনেকেই এখন যৌন পেশায় যেতে বাধ্য হচ্ছে।আদিবাসী নারীকে বিজ্ঞাপন করে যৌন ব্যবসার কথা আমাদের অনেকেরই হয়তো জানা।
এদিকে দেশের চা শিল্পে কর্মরত নারী চা শ্রমিকদের অবস্থা আরও শোচনীয়। তাদের দৈনিক মজুরী মাত্র ১২০ টাকা। এই দূর্মুল্যের বাজারে এই টাকাতেই তাদের দিনাতিপাত করতে হয়। গত বছর চা শ্রমিকরা দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরীর দাবিতে কর্মবিরতি দিয়ে রাজপথে নেমেছিল। সরকার আলোচনা সাপেক্ষে তাদের মজুরী মাত্র ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা নির্ধারণ করে। ফলে তাদের কাঙ্ক্ষিত মজুরী আদায় না হলেও তাদের কাজে ফিরতে হয়। যেখানে নারী চা শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি মেটানোই এখনো স্বপ্ন সেখানে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন এখনো যোজন যোজন দুরে।
নারীর সম্মান কেবল একদিনের জন্যে নয়, তবে নারীদের কথা বলার জন্যে বছরের এই একদিনের প্রয়োজনীয়তা আছে। দিবসটি পালনের মুল লক্ষ্য হল নারী ও
পুরুষের সমান অধিকার ও সম্মান প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। আর এজন্য দরকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ এবং সর্বক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তগুলোতে আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নারীদের মতামত ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সকল শ্রেণীর নারীর অধিকার নিশ্চিত করে চলমান বৈষম্য ঘোচানো সম্ভব।


