প্রতিটি শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহনের অধিকার রয়েছেঃ কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন
বাংলাদেশে মাতৃভাষা-ভিত্তিক বহুভাষিক প্রাথমিক শিক্ষা: সংকট ও সম্ভাবনা শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন।

আইপিনিউজ ডেক্স(ঢাকা): প্রতিটি শিশুর মাতৃভাষায় শিক্ষাগ্রহনের অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা উচিৎ না। এ অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারকেই ব্যবস্থা নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলা একাডেমীর সভাপতি ও বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। আজ ৪ ডিসেম্বর ২০২২, সকাল ১১টায় , কাপেং ফাউন্ডেশন ও মাল্টি লিঙ্গুয়ালেএডুকেশন ফোরাম এর উদ্যোগে ‘ বাংলাদেশে মাতৃভাষা-ভিত্তিক বহুভাষিক প্রাথমিক শিক্ষা: সংকট ও সম্ভাবনা শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন।
কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বাংলা একাডেমীতে পরিচালকের সাথে আলোচনা করে আদিবাসীদের সাহিত্য চর্চার জন্য আলাদা সেল খোলার ব্যবস্থার আশ্বাসও দিয়েছেন। ঢাকার কাওরান বাজারের ডি ডেইলী স্টার ভবনের আজিমুর রহমান কনফারেন্স হলে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন ও জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন এবং প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কথা সাহিত্যিক ও বাংলা একাডেমীর সভাপতি সেলিনা হোসেন। ফাল্গুনী ত্রিপুরার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরো বক্তব্য রাখেন জাতীয় কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মেসবাহ কামাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌরভ সিকদার, সুইজারল্যান্ড এ্যাম্বেসীর ইরস রব্বাইনী, এমএলই ফোরামের সমন্বয়কারী তপন কুমার দাশ, জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, লেখক ও মানবাধিকারকর্মী লেলুং খুমী প্রমুখ। মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন কাপেং ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা।
পল্লব চাকমা মূল বক্তব্য উপস্থাপনের সময় বলেন, ২০১৭ সালে প্রথম ৫টি ভাষার (চাকমা, মারমা, ককবরকক, গারো, এবং সাদ্রী) মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালুর পর আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশী। কিন্তু এই শুভ উদ্যোগ আজ কিছুটা স্থিমিত দেখেছি। তাই কোথায় কোথায় সংকট আছে তার চিত্র ও যথাযথ বাস্তবায়নের সুপারিশের জন্য আজকের এই আয়োজন। শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষন ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে স্থানীয় অভিভাবকেরা জানান। মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কারিকুলাম আরো উন্নীত করা দরকার। সেই সাথে বই পাওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ে পড়ানোর সময়সুচি না থাকায় এই শুভ উদ্যোগ বিফলে যাবে বলে সন্দিহান প্রকাশ করেন অনেকে। এক্ষেত্রে মনিটরিং এর কোন বিকল্প নেই। স্থানীয়ভাবে নিজ উদ্যোগে মাতৃভাষা শিক্ষা চালু আছে কিন্তু এক্ষেত্রে বাজেট কম থাকায় মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষায় হুমকির মুখে পড়েছে। খুমী ভাষার চর্চা খুব কম, তাই এই ভাষাকে সংরক্ষণ করার উদ্যোগ সরকারীভাবে এখনই গ্রহন করা জরুরী।

লেখক ও মানবাধিকারকর্মী লেলুং খুমী বলেন, খুমি ভাষার যে সংকটের কথা তুলে ধরা হয়েছে (পার্বত্য চট্টগ্রামে মাতৃভাষায় বিপন্নতার দিক দিয়ে প্রথমে লুসাই ভাষা, দ্বিতীয় হলো খুমী ভাষা) তা বাস্তব। তাদের জীবনধারা প্রান্তিক পর্যায়ে তো আছেই। সেই সাথে যেসব ভাষাগুলো (লুসাই, খুমী) বিপন্নতার মুখে রয়েছে সেগুলোর সংরক্ষন করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষাা ইনস্টিটিউটের সম্পৃক্তকরণ সময়ের দাবীদার। শুধু তাই না সরকারী বেসরকারী পৃষ্ঠপোষকতা জোরদার করা জরুরী মনে করেন।
জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেন, আজকে পলিসি মেকার থাকলে খুব ভালো হত বিশেষ করে যারা মাতৃভাষায় প্রাথমিক ভাষার শিক্ষা বাস্তবায়নে কাজ করেন। আদিবাসী শিশুদের শিক্ষা অনুবাদকরণের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। যেমন “আমার সোনার বাংলা.. আমি তোমায় ভালোবাসি” জাতীয় সঙ্গীতের অর্থ যখন মাতৃভাষায় অনুবাদ করে গায়, তখন সেটা শুধু সুর নয়, বরং অনুভব করতে পারবে। নিজেদের মধ্যে ব্যবহারের মাত্রা ক্রমশ কমে যাচ্ছে যা আমাদের ভাষাকে হুমকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সরকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কমিটির দৃষ্টিভঙ্গি আমাদেরকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। জাতীয় শিক্ষা নীতিতে আদিবাসী বিষয়ক সুন্দর সুন্দর ধারা থাকলেও শিক্ষক পদায়নের ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে যেমন চাকমা স্কুলে মারমা শিক্ষক নিয়োগ, ত্রিপুরা অধ্যুষিত এলাকায় চাকমা শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে আরো মনোযোগ দেয়ার আহ্বান জানান। আদিবাসী সাহিত্য নিয়ে কাজ করার জন্য বাংলা একাডেমীতে সুযোগ সৃষ্টির জন্য দাবীও জানান এই ভাষা গবেষক।
আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা ৫টি ভাষা ছাড়াও আরো অনেক ভাষায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহন করার আশ্বাস দিয়েছেন এমএলই ফোরামের তপন কুমার দাশ। সেই সাথে বাংলা একাডেমীতে আদিবাসী বিষয়ক দিবস· রাখার আহ্বানও জানান।
ভাষা গবেষক ও ঢাবি অধ্যাপক সৌরভ সিকদার বলেন, গুণগত মানের শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষন ব্যবস্থা করতে পারলে মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন ৮০% সমস্যা সমাধান হবে। সেই সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে জেলা পরিষদের শুধু আন্তরিকতা ও সহযোগিতা দরকার। মিডিয়া, বেতার কেন্দ্র, টিভি নিয়মিত আদিবাসী ভাষায় প্রোগ্রাম করার আরো উদ্যোগ নিতে হবে কমিউনিটির ভিত্তিক পাড়ায় পাড়ায়, মন্দির কেন্দ্রীক মাতৃভাষায় সেন্টার ব্যবস্থা জোরদারকরন, দৈনন্দিন চর্চায় আর যে সময়ে মতপ্রচার করা সেসময়ে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে বলেন এই প্রতিষ্ঠান নানা আমলাতান্ত্রিকতায় জর্জরিত। যার কারণে ভাষা নিয়ে গবেষনার কাজ এক্ষেত্রে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বলেন, ২০১৬ সালের পর আদিবাসীদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দ্বিতীয় পর্যায়ে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও এখনও হয়নি। বিপন্নতার দিক দিয়ে বিবেচনা করে খুমি, লুসাই, সাঁওতালী ভাষাসহ এবিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহনের আহ্বান জানান তিনি। সাংস্কৃতিক একাডেমী গড়ে উঠেছে কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে কার্যকরি উপদেষ্টা কমিটি করা দরকার। মনিটরিং করার ক্ষেত্রে কমিউনিটি বেতারকেন্দ্র এর সুযোগদানসহ জাতীয়ভাবে অমর একুশে আদিবাসী কবিতা পাঠের আয়োজন করারও জোর দাবী জানান এই আদিবাসী গবেষক।
ড. এ কে এম রিয়াজুল হাসান বলেন, সাঁওতালী ভাষার সংকট হলো ভাষার বাহন বর্ণমালা নির্ধারণ তাদেরকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। মাতৃভাষায় শিক্ষা বাস্তবায়ন সংকটের ক্ষেত্রে শিক্ষা উপকরন ও সহায়িকা সরবরাহের সংকট আছে বলে জানান। সেজন্য এনসিটিবিকে কমিউনিটি থেকেই তাগিদ দিলে এই সংকট রোধ করা যাবে।
সুইজারল্যান্ড এ্যাম্বেসীর ইরস রব্বাইনী বলেন, ভাষার বৈচিত্র্যতা মানুষের জন্য গর্ব ও আনন্দের সর্বজনীন উৎস। ভাষা মানুষের পরিচয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক এবং মানুষের সমতা ও অধিকারের সূচক।
মুক্ত আলোচনায় সন্তোষিত চাকমা বকুল, জান্নাতুল-ই ফেরদৌসী, বিনোদন ত্রিপুরা, সান্তনা খীসা, প্রসন্ন কুমার চাকমাসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি প্রমুখ অংশগ্রহন করেন। আলোচনার সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বলেন মাতৃভাষায় শিক্ষক সংকট সব জায়গায়। সরকারী পরিকল্পনায় আদিবাসী শিক্ষক নিয়োগ দেয়ার কোন বিকল্প নেই। সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়ে বলেন সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। নতুবা আরেকটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে ঐ জাতিগোষ্ঠির সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়া।


