মতামত ও বিশ্লেষণ

পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ : পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভেতর থেকে দেখা- বুদ্ধজ্যোতি চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে কম-বেশি অনেকে লেখালেখি করেন। মূলতঃ ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র ফিরে আসার শুরুতে লেখালেখিরও শুরু হয়েছে। পার্বত্য চুক্তির পর পাহাড় সম্পর্কিত লেখালেখি আরও বেশি জোরালো হয়ে ওঠে।

এর আগে, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও এ অঞ্চলের আদিবাসীদের সমস্যা-সম্ভাবনার বিষয়টি জনসম্মুখে প্রকাশ অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ ছিল। সম্ভবত সিদ্ধ-নিষিদ্ধের সীমানায় চিন্তা সংকোচনের চাপে এই যাবতকালের লেখাগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় দুটি ধারা লক্ষনীয়। একটি হচ্ছে, ওপর থেকে দেখা, আরেকটি অন্তরদর্শন। যতদূর দেখা, ততদূর জানার দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা যতটা সহজ, ভেতরে ঢুকে কোনো বিষয় উপস্থাপন করা মোটামুটি কঠিন কাজ। ছাঁচে ঢালাইয়ের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক দারিদ্র থাকলে কোনো সমস্যার, বিশেষ করে জাতিগত সমস্যার ভেতরে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।

এই দুই ধারা বিবেচনায় সাংবাদিক ও লেখক বিপ্লব রহমানের ‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ গ্রন্থের পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভেতর থেকে দেখা সমস্যার আলোক প্রক্ষেপণ বলা যেতে পারে। লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার গভীরে থাকা অন্ধকারে অনেকাংশে আলোকপাত করতে সক্ষম হয়েছেন। এর প্রচ্ছদেই নামকরণের নীচে বইয়ের বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘সাংবাদিকের জবানবন্দিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের অকথিত অধ্যায়’।

বিপ্লব রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারি সংগঠন জনসংহতি সমিতির প্রধান, জ্যোতিরিন্দ্রিয় বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমার প্রথম সাক্ষাৎকার নেওয়া সাংবাদিক। সেই সাক্ষাৎকারটিও গ্রন্থে সংযোজন করা হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে দেশের মানুষ প্রথম জনসংহতি সমিতির মনোভাব জানতে পেরেছে।

১৯৯০-এর দশক থেকে সাংবাদিক হিসেবে বিপ্লব অভিযাত্রীর মতো পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার গোলকে অভিযান পরিচালনা করেছেন। পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের মানবিক সংকট ও সম্ভাবনাকে শুধু কাছে থেকে নয়, একেবারেই ভেতর থেকে দেখা চেষ্টা করেছেন। সেজন্য নিজের দায় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার ঘটনাপঞ্জির জবানবন্দি লিখেছেন। তার জবানবন্দিতে পার্বত্য অঞ্চলের রাজনীতি, সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জুমচাষ, মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসীদের শাখের করাতের মতো কঠিন অবস্থসহ নানা সমস্যা, সম্ভাবনার কথা কোনো কিছুই বাদ যায়নি। সবকিছুতেই নির্মোহভাবে নিজের সাক্ষ্য দিয়েছেন।

খুব কমসংখ্যক লেখক তার মতো এত ঋজুভাবে আদিবাসীদের প্রতি রাষ্ট্রীয় বৈরী দৃষ্টিভঙ্গির বাস্তবতা উপস্থাপন করেছেন। তিনি অকপটে বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং আদিবাসীদের বর্তমান অবস্থা ঠিক যেন ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগের পূর্ব-পাকিস্তান ও বাঙালিদের মতোই।

দুই ধারার লেখালেখির কথা আগেই বলা হয়েছে। ওপর থেকে দেখা লেখকরা রাখাল বালকের বাঘ দেখা তত্ত্বে সবসময় ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঘ আসছে’ আওয়াজ তোলেন। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে, তারা ১৯৭১ সালের আগেও পূর্ব-পাকিস্তান নিয়ে একই আওয়াজ তুলেছিলেন। তারা ইতিহাস জানেন না, ইতিহাস না জানার কারণে পরিবর্তন মানেন না। ‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ বইয়ে বিভিন্ন তথ্যে সেই রাখাল বালকের বাঘ দেখা তত্ত্বের এবং ভূতের পেছনে পা ফেলে চলার বিপদজনক চিত্র উপস্থাপন করেছেন। ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনো বিদ্রোহ অধ্যুষিত অঞ্চল’, ‘পাহাড়ে কেন এত সহিংসতা?’ ‘জাত্যাভিমানের মুখচ্ছবি’সহ বিভিন্ন শিরোনামে আড়াই দশক ধরে নিজের দেখা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন।

বিপ্লব এতে বলেছেন, প্রথমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা তৈরি করে আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের অস্বীকার করা হয়েছে। সেই অস্বীকৃতিই পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক সমস্যার জন্ম দিয়েছে। সমস্যার সেই উৎসমূলে গিয়েই রাজনৈতিক সমস্যা রাজনৈতিকভাবে সমাধান করতে হবে।

বইটিতে উপস্থাপিত বিষয়গুলো শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সারাংশ করলে এইটুকু বোঝানো হয়েছে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধানে পথ দুইটি। দখল করে, নয় তো গ্রহণ করে। দখল করে সমাধানের অর্থ হলো- আদিবাসীদের আত্মপরিচয়, জনসংখ্যা, কৃষ্টি-সংস্কৃতি ও জমিজমা সবকিছু একক বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারায় অ্যাসিমিলেইশন বা মিশিয়ে নেওয়া। সেটা ছলেবলে-কৌশলে যেভাবেই হোক। দ্বিতীয়ত, গ্রহণ করে সমাধানের অর্থ হচ্ছে-আদিবাসীদের স্বতন্ত্র আত্মপরিচয় স্বীকার বা গ্রহণ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসের আলোকে স্বশাসন মেনে নেওয়া। তার উৎকৃষ্ট বিকল্প হতে পারে– পার্বত্য শান্তিচুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। লেখকের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণের মনে হয় অবকাশ নেই। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে গ্রহণ করে সমস্যার সমাধানের পথই উত্তম। রাখাল বালকের বাঘ দেখা তত্ত্বের খেলা না খেলাই শুভবুদ্ধির কাজ। ইতিহাসের গতিপথ রুদ্ধ করা যায় না।

পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা কমবেশি সবার একটি জানা বিষয়। কিন্তু সমস্যাটিকে বাইরে থেকে যারা জানেন এবং অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে বোঝেন না, বিপ্লব রহমানের গ্রন্থটি তাদের জন্য উপলব্ধি উৎসারণের দাওয়াই হতে পারে।

লেখক বইটিতে অনেক জানা-অজানা তথ্য ও প্রামাণ্য দলিল হাজির করেছেন। যেমন, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের তৎকালিন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে পেশ করা স্মারকলিপি, প্রয়াত এমএন লারমার ছিন্নপত্র ও আরও দলিল সন্নিবেশিত হয়েছে। আবার ভেতর থেকে জানেন-বোঝেন, তাদেরও ঘটনা পরম্পরা ঝাপসা হয়ে আসা স্মৃতি ঝালিয়ে নেওয়া সহজ হবে।

সবশেষে এটাও মনে রাখা দরকার, বিপ্লব রহমানের ‘পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ’ কোনো গবেষণা ও ইতিহাস গ্রন্থ নয়। এটি মূলত ঘটনাপঞ্জি, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বিবরণি ও তথ্য উপস্থাপনা। একজন সাংবাদিক যখন পার্বত্য চট্টগ্রামে গিয়েছেন, তার জানার পরিধির মধ্যে যতটুকু জেনেছেন, তাই-ই তুলে ধরেছেন। নিঃসন্দেহে ঘটনাবহুল পার্বত্য চট্টগ্রামের এটি খন্ডিত একটি অংশমাত্র। অনেকের কাছে, বিশেষ করে যারা পার্বত্যবাসীদের চলন বাকা মনে করেন, তাদের কাছে একদেশদর্শী মনে হতে পারে। এমনকি পাহাড়ি রাজনৈতিক সংগঠনের কেউ কেউ পক্ষপাতমূলক অভিযোগ করতে পারেন। ঘটনা পরম্পরা ও উপস্থাপিত বিষয় বিন্যাসেও ধারাবাহিতকা ভঙ্গ হয়েছে মনে হলে একেবারে অযৌক্তিক হবে না। বইটি পরবর্তি সংস্করণ বের হলে কিছু সময় দিয়ে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে।

বুদ্ধজ্যোতি চাকমা : সাংবাদিক

Back to top button