পার্বত্য মন্ত্রণালয়ে “অ-পাহাড়ী” প্রতিমন্ত্রী পদায়নের প্রতিবাদে ৩৫ বিশিষ্ট জনের বিবৃতি

আইপিনিউজ ডেস্ক: পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন’কে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পদায়নের প্রতিবাদে এবং তাঁকে অন্য মন্ত্রণালয়ে পদায়নের দাবি জানিয়ে বিবৃতি প্রকাশ করেছেন ৩৫ বিশিষ্ট নাগরিক। আজ ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ তারিখে এ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়।
বিবৃতিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিকে বরখেলাপ করে একজন অ-পাহাড়ী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী নন এমন একজন ব্যক্তিকে পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পদায়নে গভীর উদ্বেগ জানিয়ে অবিলম্বে তাঁকে অন্য মন্ত্রণালয়ে পদায়নের দাবি জানানো হয়।
বিবৃতির শুরুতে নতুন সরকারকে অভিনন্দন জানিয়ে বলা হয়, ”গত ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ইংরেজী, বৃহষ্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছেন তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), যার জন্য আমরা অভিবাদন জানাচ্ছি। এছাড়া নবগঠিত সরকারের মন্ত্রীসভায় রাঙ্গামাটি-২৯৯ আসন থেকে নির্বাচিত সাংসদ দীপেন দেওয়ানকে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে গঠিত ও পরিচালিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রী হিসেবে পদায়ন করায় আমরা সাধুবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আমরা আশা করি তাঁর নেতৃত্বে আগামীতে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিবদমান সমস্যা ও সংকট নিরসন এবং পাহাড়ের অধিবাসীদের সামগ্রিক জীবনমান উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহনে সক্ষম হবে।”
বিবৃতিতে একই সাথে অতীব উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা প্রকাশ করে বলা হয়, ”পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (ঘ) খন্ডের ১৯ ধারায় স্পষ্টভাবে বর্ণিত “উপজাতীয়দের মধ্য হইতে একজন মন্ত্রী নিয়োগ করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা হইবে” কে অনুসরণ করে রাঙ্গামাটির সাংসদ দীপেন দেওয়ানকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করলেও চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) থেকে নির্বাচিত সাংসদ মীর হেলালকে একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নিয়োগ করে উক্ত ধারাকে ভঙ্গ করেছে নবনির্বাচিত সরকার। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মধ্য দিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মূল কাজ হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত বাংলাদেশ সরকারের সামগ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে সরকারের সাথে পাহাড়ের অধিবাসীদের কার্যকরী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে নির্বাহী সংস্থা হিসেবে বিভিন্ন উদ্যোগ ও কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া। সেক্ষেত্রে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় সরকারের কর্মকান্ডের মধ্যে পাহাড়ের আদিবাসীদের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করাও এই মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্ব। কাজেই এটা খুবই স্বাভাবিক যে, মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত নির্বাহী দায়িত্বে যতজনই থাকুক না কেন সকলেই পাহাড়ী বা পাহাড়ের অধিবাসী পাহাড়ী নাগরিক হবেন। তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম সম্পর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরের এবং অ-পাহাড়ী একজনকে প্রতিমন্ত্রী নিযুক্ত করার মধ্য দিয়ে পার্বত্য চুক্তিকে চরমভাবে বরখেলাপ করা হয়েছে।”
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ”অন্যদিকে আমরা এযাবৎকালে আরো লক্ষ করেছি যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিযুক্তির ক্ষেত্রে পাহাড়ের পাহাড়ী নাগরিকদের অংশগ্রহন অত্যন্ত নগন্য। এক্ষেত্রে পার্বত্য চুক্তির মূল প্রস্তাবনা- “পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি উপজাতীয় অধ্যুষিত অঞ্চল” হবে তার প্রতিফলনও আমরা পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে খুঁজে পাইনি। অন্যদিকে বর্তমানে সরকারের নেত্বেত্বে থাকা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)’র ঘোষিত ৩১ দফা’র ২ নং দফা’র “সম্প্রীতিমূলক সমন্বিত রাষ্ট্রসত্তা (রেইনবো নেইশন)” প্রতিষ্ঠার ধারণা’র সাথেও সাংঘর্ষিক।”
বিবৃতিতে সর্বশেষ, নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমানে কাছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আলোকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে নিয়োজিত মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন’কে অন্য মন্ত্রণালয়ে পদায়ন এবং উক্ত মন্ত্রণালয়ের কর্মকতা ও কর্মচারী নিযুক্তির ক্ষেত্রে পাহাড়ী আদিবাসী নাগরিকদের অগ্রাধিকার দেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়।
এই বিবৃতিতে, বিবৃতি দাতাদের পক্ষে স্বাক্ষর করেছেন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক ইন্টুমনি তালুকদার ।
বিবৃতিতে আরো স্বাক্ষর করেছেন:
১. প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা (অব: উপ সচিব), সভাপতি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ‘ক’ অঞ্চল।
২. বিজয় কেতন চাকমা, সভাপতি, এমএন লারমা মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশন।
৩. ডা: মং উষা থোয়াই মার্মা (সাবেক সিভিল সার্জন), সভাপতি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, বান্দরবান জেলা শাখা।
৪. শিশির চাকমা, বিশিষ্ট লেখক ও সভাপতি, জুম ঈসথেটিক কাউন্সিল।
৫. মংক্যশৈনু (নেভী), অব: কর্মকর্তা, সভাপতি, সিএইচটি রাইটার্স ইউনিয়ন, বান্দরবান।
৬. মধুমঙ্গল চাকমা, অব: অধ্যাপক, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ।
৭. সন্তোষিত চাকমা বকুল, সাধারণ সম্পাদক, জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতি।
৮. নমিতা চাকমা, উন্নয়ন কর্মী।
৯. ইন্টুমনি চাকমা, সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল।
১০. নব কুমার চাকমা, সভাপতি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, খাগড়াছড়ি জেলা শাখা।
১১. জিংমুলিয়ান বম, বিশিষ্ট চিত্র শিল্পী, বান্দরবান।
১২. জিরকুং সাহু, বিশিষ্ট লেখক ও সমাজকর্মী, বান্দরবান।
১৩. ক্যসামং মারমা, বিশিষ্ট লেখক ও সাংস্কৃতি কর্মী, বান্দরবান।
১৪. মোহনী রঞ্জন চাকমা, অব: প্রকৌশলী, সভাপতি, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম, রাঙ্গামাটি জেলা শাখা।
১৫. সুরেন্দ্র লাল চাকমা, অব: প্রকৌশলী, এলজিইডি, রাঙ্গামাটি।
১৬. জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, অব: খাদ্য কর্মকর্তা, রাঙ্গামাটি।
১৭. জহর বিকাশ চাকমা, অব: প্রকৌশলী, রাঙ্গামাটি।
১৮. প্রসন্ন কুমার চাকমা, অব: প্রধান শিক্ষক ও বিশিষ্ট লেখক (চাকমা ভাষা), রাঙ্গামাটি।
১৯. শুক্র কুমার চাকমা, সভাপতি, আদিবাসী পাহাড়ী বৈদ্য শাস্ত্রীয় বহুমুখী কল্যাণ সমিতি, রাঙ্গামাটি।
২০. ইন্দুলাল চাকমা, অব: মৎস্য কর্মকর্তা, রাঙ্গামাটি।
২১. সাথোয়াই মারমা, সাংবাদিক, খাগড়াছড়ি।
২২. পলাশ কুসুম চাকমা, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান, সহ সভাপতি, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদ, রাঙ্গামাটি।
২৩. যতীন বিহারী চাকমা, বিশিষ্ট ঠিকাদার, রাঙ্গামাটি।
২৪. সাগর রানী চাকমা, অব: শিক্ষক, খাগড়াছড়ি।
২৫. বিজয় গিরি চাকমা, সভাপতি, ত্রিদিব নগর ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি, রাঙ্গামাটি।
২৬. থুয়াসা খিয়াং, সংস্কৃতি কর্মী, রাঙ্গামাটি।
২৭. মালেকা চাকমা, কারবারী বিহারপুর, রাঙ্গামাটি
২৮. চন্দ্রশেখর তালুকদার, হেডম্যান, গোরস্থান মৌজা, বরকল।
২৯. লোমা লুসাই, সহসভাপতি, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রীষ্টান ঐক্য পরিষদ, রাঙ্গামাটি।
৩০. স্মৃতি শংকর চাকমা, বিশিষ্ট সমাজকর্মী।
৩১. শান্তিমায়া ত্রিপুরা, বিশিষ্ট নারী নেত্রী।
৩২. জুনান তঞ্চঙ্গ্যা, চিত্রশিল্পী।
৩৩. থুইচা প্রু মারমা, কাউখালী।
৩৪. শ্যামা চাকমা, সাবেক ভাইস-চেয়ারম্যান।
৩৫. ত্রিপন জয় ত্রিপুরা, সাংবাদিক, খাগড়াছড়ি।


