পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি রাঙ্গামাটি শাখার ৬ষ্ঠ সম্মেলন: নেতৃত্বে রিতা চাকমা ও রিনা চাকমা

আইপিনিউজ বিডি (রাঙ্গামাটি): আজ ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ খ্রি: “সকল ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে ইস্পাত-দৃঢ় জুম্ম জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলি, জুম্ম জাতির অধিকারের সনদ পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়নের বৃহত্তর আন্দোলন জোরদার করুন” স্লোগানে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি, রাঙ্গামাটি জেলা শাখার ৬ষ্ঠ সম্মেলন ও কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০ টায় জেলা সদরের ’উদ্যোগ রিসোর্স সেন্টার’-এ অনুষ্ঠিত সম্মেলনে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সভাপতি রিতা চাকমার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক সুবিনা চাকমার সঞ্চালনায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন সহ-সাধারণ সম্পাদক আশিকা চাকমা।
সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি শ্রী ঊষাতন তালুকদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির সভাপতি শ্রীমতি মনি চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম যুব সমিতি, রাঙ্গামাটি জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুমিত্র চাকমা, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক উলিসিং মারমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি সুমন চাকমা প্রমুখ।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি শ্রী ঊষাতন তালুকদার বলেন, শাসকগোষ্ঠী জুম্মদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্য করে না। সবসময় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যে আমাদের দিনযাপন করতে হয়। সামন্তীয় সমাজব্যবস্থায় পুরুষতান্ত্রিক মতাদর্শে লালিত সমাজে জুম্ম নারীরা নানা নিপীড়ন বঞ্চনার অবসানকল্পে মহিলা সমিতির প্রতিষ্ঠা। কেউ আমাদের অধিকার এনে দিবে না, নিজেদেরকে সংগ্রাম করে অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে। লড়াই সংগ্রামে নারী সমাজকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পার্টির আন্দোলন সংগ্রামের সময় জুম্ম সমাজে নানা ধরনের পরিবর্তন এসেছে, সামাজিক সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি এসেছে, সমাজে নারী পুরুষের ভেদাভেদ কমেছে। সমাজে নারীদেরকে পরিবার, সমাজের নানা বাস্তবতার সম্মুখীন হতে হয় তবু রাজনৈতিক বাস্তবতায় সংগ্রামী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জনগণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে অধিকার আদায়ের আন্দোলন জোরদার করতে হবে। আত্মমূখিনতা, দোদুল্যমানতা পরিহার করে লড়াই সংগ্রামে অধিকতর সামিল হতে হবে। আমাদেরকে আদর্শবান হতে হবে, দক্ষ সংগঠকের গুনাবলি অর্জন করতে হবে। স্রোতের গড্ডালিকা প্রবাহে গাঁ না ভাসিয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সামিল হতে হবে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির শ্রীমতি মনি চাকমা বলেন, জুম্ম নারীরা প্রতিনিয়ত নিপীড়ন, নির্যাতনের শিকার হয়। লড়াই সংগ্রামে নিজেকে আত্মবলিদানের মানসিকতা পোষণ করে দৃঢ় শপথ নিতে হবে। তৃণমূল অঞ্চল থেকে জনগণকে সুসংগঠিত করে আমাদের আন্দোলন জোরদার করতে হবে। আমাদের কর্মীদের মধ্যে গুনগত দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
যুবনেতা সুমিত্র চাকমা বলেন, জুম্ম নারীদের রাষ্ট্রের দ্বারা শোষণ, বঞ্চনার শিকার হতে হয়। আমাদের জুম্ম নারী সমাজ এখনো পশ্চাতে রয়েছে। সন্তানের বেড়ে উঠায় মা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা পালন করে। তাই মায়েদের শিক্ষিত ও অধিকার সচেতন হতে হবে। বর্তমান তরুণ সমাজের অনেকাংশের মধ্যে হতাশা বিরাজমান অবস্থা পরিলক্ষিত হয়। তারা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা ভাবনায় অধিক নিমজ্জিত। আমাদের এ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তরুণদের অধিকার সচেতন করতে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পার্টির নীতি আদর্শকে ধারণ করে লক্ষ্য পূরণে আমাদের সংগ্রাম করতে হবে। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের অধিক সম্পৃক্ত করতে হবে। নারী ও পুরুষ উভয়ের অংশগ্রহণে আমাদের আন্দোলন আরও বেশি বেগবান ও সুদৃঢ় হবে।
হিল উইমেন্স ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক উলিসিং মারমা বলেন, ক্ষয়িষ্ণু সামন্তীয় সমাজের বেড়াজালে আবদ্ধ জুম্ম নারী সমাজকে অধিকার সচেতন করতে মহিলা সমিতি আবির্ভূত হয়। সমাজের জুম্ম নারীদের অধিকার সচেতন করে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমাদের কাজ করতে হবে। নারীদের প্রতি পদে পদে লড়াই করতে হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীদের শুধুমাত্র রান্না ঘরে আবদ্ধ রাখার চেষ্টা করে।
তিনি আরও বলেন, পৃথিবীতে সংগঠিত প্রতিটি আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল। আমাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় নারীদেরকে আরো অধিক আন্দোলনে সামিল হতে হবে। জুম্ম নারী সমাজকে এগিয়ে নিতে পুরুষদেরও সহযোগিতা করতে হবে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ, রাঙ্গামাটি জেলা শাখার সভাপতি সুমন চাকমা সুমন চাকমা বলেন, শাসকগোষ্ঠী পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের সাথে বিমাতাসূলভ আচরণ করে আসছে। জুম্ম জনগণের অধিকারের সনদ পার্বত্য চুক্তিকে বানচাল করতে সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী গোষ্ঠীর নানা ষড়যন্ত্র এখনো বিরাজমান। জুম্ম নারীদের অধিকার সচেতন করার লক্ষ্যে মহিলা সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সমাজের জুম্ম নারীদের অধিকার সচেতন করার জন্য মহিলা সমিতির কর্মীদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। কর্মীদেরকে আরো অধিক আদর্শিক কর্মী হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিগত কোন সরকারই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সদিচ্ছার সাথে এগিয়ে আসে নি। জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য জুম্ম তরুণ যুব সমাজকে দৃঢ় শপথ নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনে সামিল হতে হবে।
সম্মেলন শেষে রিতা চাকমাকে সভাপতি, রিনা চাকমাকে সাধারণ সম্পাদক, মালবিকা দেওয়ানকে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত করে ২৭ সদস্য বিশিষ্ট রাঙ্গামাটি জেলা কমিটি গঠন করা হয়। নবনির্বাচিত জেলা কমিটিকে শপথ বাক্য পাঠ করান কেন্দ্রীয় কমিটির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক শ্যামা চাকমা।


