জাতীয়

জুলাই অভ্যুত্থান ও অন্তরবর্তী সরকারের এক বছরঃ কী পেলো আদিবাসীরা?

“ভবিষ্যত শঙ্কা ও অনিশ্চয়তায় ভরা বলছেন বিশিষ্টজনরা”

আইপিনিউজ, বিশেষ প্রতিবেদন: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্ণ হয়ে গেল। সেই সাথে অন্তরবর্তীকালীন সরকারও পার করল দায়িত্ব পালনের এক বছর। এই এক বছরে অন্তরবর্তীকালীন সরকার ১১ টি সংস্কার কমিশন গঠন করেছে। ইতিমধ্যে কমিশন সমূহ তাঁদের সুপারিশমালাও প্রণয়ণ করেছে। অন্যদিকে সুপারিশ প্রণয়ণের পাশাপাশি কমিশনসমূহের প্রধানদের নিয়ে অন্তরবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে জাতীয় ঐক্যমত্য কমিশন। এই কমিশন ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসমূহের নেতৃবৃন্দের সাথে দফায় দফায় আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে ঐক্যমত্যে আসার চেষ্টা চালিয়েছে। ইতিমধ্যেই এই আলোচনাও সম্পন্ন করেছে এই কমিশন। বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে- আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এই ঐক্যমত্য কমিশনের নেতৃত্বে অন্তরবর্তীকালীন সরকার সংলাপে অংশ নেয়া রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাক্ষরের পর জুলাই সনদ প্রণয়ন করবে। এই সনদ অনুযায়ীই আগামীর বাংলাদেশের পথরেখা সূচিত হবে বলে অভিমত দিচ্ছেন নীতি নির্ধারকরা।

এমনি একটা বাস্তবতায় দেশে নানা আয়োজনে পালিত হতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। কিন্তু “বৈষম্য ও বঞ্চনা” অবসানের কথা বলে দায়িত্বে আসা অন্তরবর্তী সরকারের বিগত এক বছরেও দেশের আদিবাসীদের মানবাধিকারের পরিস্থিতির অগ্রগতি হয়নি। আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করা মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের মতে, বিগত সাত মাসেই (জানুয়ারি- জুলাই ২০২৫) সর্বমোট ৪৮৯ জন আদিবাসী নানাভাবে মানবাধিকার লংঘনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৪ জন আদিবাসী নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, ভূমি দখল-সম্পর্কিত ঘটনায় ২৯৫ জন আদিবাসী এবং ১৭০ জন আদিবাসী নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের লংঘনের শিকারে পরিণত হয়েছেন।

কারা হেয়াজতে মৃত্যুবরণ করা ভানলাল-রুয়াল-বম।

কাপেং ফাউন্ডেশনের রেকর্ডকৃত আদিবাসীদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লংঘনের এসব ঘটনা সমূহের মধ্যে রয়েছে নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা পণ্য বিক্রিতে বাধা, মিথ্যা মামলায় ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার, ভূমি দখলকারীদের দ্বারা মারধর, লুটপাট ও ঘরে আগুন দেওয়া, বিজিবি কর্তৃক আটক, হয়রানি ও হুমকি, নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা আটক, আটক হওয়ার পর মৃত্যু, নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা মারধর, সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, নিরাপত্তা বাহিনীর দ্বারা বাড়ি তল্লাশি, ভাঙচুর ও হুমকি,  হয়রানি, গুলিবর্ষণ, বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের দ্বারা হামলা, আদিবাসী শিশুদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণ। এসব ঘটনায় এ সরকারের সময়েও “বিচারহীনতার সংস্কৃতি” চলমান রয়েছে যা আদিবাসীদের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

এদিকে গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর নানা অঙ্গিকে সামগ্রিক পরিস্থিতির পর্যালোচনা করছেন অংশীজনরা। বিশ্লেষকরা বিভিন্ন আঙ্গিকে অন্তরবর্তীকালীন সরকারের বিগত এক বছরের কার্যক্রমকে মূল্যায়ন করছেন। এই মূল্যায়নের তাগিদে কথা হয় সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও তরুণ আদিবাসী নারী অধিকার কর্মী রূপাইয়া শ্রেষ্টা তঞ্চঙ্গ্যার সাথে। ২০২৪ সালের শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক একদিন আগে (৪ আগষ্ট) আন্দোলন থেকে বাসায় ফেরার পথে আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন এবং বর্তমানে নিষিদ্ধ হওয়া ছাত্রলীগের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গুরুতর আহত হন তিনি। বেডরক মারধর করা হয় রূপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যাকে। তার ছোটভাই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অরনী অহীন তঞ্চঙ্গ্যাকেও পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হয় সেদিন। সেই বিদগ্ধ স্মৃতি নিয়েই রূপাইয়া শ্রেষ্টা তঞ্চঙ্গ্যা আইপিনিউজকে বলেন, ”গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা কিছু পরিবর্তনের আভাস পেয়েছি| স্বৈরশাসনের মুখোশ কিছুটা হলেও খুলেছে, মানুষ প্রতিবাদ করার ভাষা খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু একজন আদিবাসী হিসেবে আমি এই বিষয়টা একটু ভিন্নভাবে দেখি। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা তো শুধু রাষ্ট্রের গণতন্ত্রে অংশ নেওয়া নয়, বরং আমাদের পরিচয়, ভূমির অধিকার, সংস্কৃতি ও ভাষার প্রতি স্বীকৃতি ও সম্মানও। সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে বলতেই হয়—আমাদের আকাঙ্ক্ষাগুলো এখনো অনেকখানি অপূর্ণ।”

স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি নামক সংগঠনের উগ্রবাদীদের কর্তৃক আক্রান্ত রূপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা এবং ছোত্রনেতা ডন জেত্রা।

তিনি আরো বলেন, ”আদিবাসীদের ভূমি-দখল, উচ্ছেদ, নিপীড়ন—এসব এখনও চলমান। মূলধারার রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঢেউ হয়তো শহর ও বড় প্ল্যাটফর্মে এসেছে, কিন্তু পাহাড়-সমতলের প্রান্তিক মানুষের কাছে সেই ঢেউ এখনো পৌঁছায়নি।”

এবারের গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলনে অংশগ্রহনকারী তরুণদের গ্রাফিতিতে প্রবলভাবে উঠে এসেছে আদিবাসীদের বিভিন্ন দাবী-দাওয়া। অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করে আঁকা একটি গাছ যেখানে রয়েছে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলিম ও আদিবাসী লেখা পাঁচটি পাতা- যা ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয়েছিল। পরবর্তীতে এনসিটিবি নবম ও দশম শ্রেণীর এক পুস্তকের মলাটে এই ছবিটি ব্যবহার করে। পরে ‘স্টুডেন্টস ফর সভারেন্টি’ নামের এক সংগঠনের প্রতিবাদের মুখে এনসিটিবি সেটি বাতিল করে। তারই প্রতিবাদে রূপাইয়াসহ আদিবাসী ছাত্র ও যুব’রা এনসিটিবির সম্মুখে মিছিল নিয়ে প্রতিবাদ করতে গেলে উক্ত সংগঠনের ব্যানারে একত্রিত হওয়া কতিপয় উগ্রবাদীদের হামলার শিকার হয়ে গত ১৫ জানুয়ারি (২০২৫) আহত হন ২০ জন আদিবাসী ছাত্র ও যুব। তাঁদের মধ্যে রূপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা ও ডন জেত্রা গুরুতর আহত হন। এ ঘটনায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ওঠে এবং মতিঝিল থানায় মামলাও করা হয়।

এ ঘটনায় বিচারের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রূপাইয়া বলেন, ”এনসিটিবি-র ঘটনায় আমি শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে আহত হয়েছি। যে আঘাত আমি শরীরে পেয়েছি, তার চেয়ে অনেক গভীর ছিল আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার ওপর আঘাত। আজও সেই ক্ষত পুরোপুরি সেরে ওঠেনি — শরীরে যেমন রক্তের দাগ ছিল, তেমনি মনেও রয়ে গেছে ক্ষোভ আর অপমানের দাগ। আর মামলার কাজ? সেটা এখনো ধীরে চলছে—যেন কেউ চায় না সত্যটা প্রকাশ পাক, বিচারটা সম্পূর্ণ হোক। অথচ আমরা তো চেয়েছিলাম একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে কেউ ক্ষমতার জোরে নির্যাতনের দায় এড়িয়ে যেতে না পারে।”

নারী প্রতি মৈত্রী যাত্র কর্মসূচীতে অংশগ্রহনকৃত কয়েকজন আদিবাসী ।

গণঅভ্যুত্থান থেকে আদিবাসীদের কী অর্জন জিজ্ঞেস করা হলে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, এক বছর আগে যে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয় তাতে বলা হয়েছিল- বৈষম্যের অবসান হবে। একারণে ছাত্র-জনতা সেখানে অংশ নিয়েছিল। অনেক সংস্কার কমিটি করা হল, কমিশন করা হল কিন্তু আদিবাসী বিষয়ক কমিশন গঠন করা হল না। আদিবাসীদের প্রতি ঐতিহাসিক বঞ্চনা ও নিপীড়ন পৃথিবী ব্যাপী স্বীকৃত। টেকসই উন্নয়ন লক্ষমাত্রা-২০৩০ এ ও এটি বলা আছে। কিন্তু এই সরকারের মানসপটেও আদিবাসীরা অনুপস্থিত। এই সরকার আরো অন্তরভুক্তিমূলক  হবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। কাজেই জুলাই অভ্যুত্থানের পরে গঠিত সরকারের চিন্তাতেও আদিবাসীরা নাই ( এক্সক্লুডেড)।

সঞ্জীব দ্রং স্মৃতিচারণ করে বলেন, যখন এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তাঁর জাতির উদ্দেশ্যে দেয়া প্রথম ভাষণে আদিবাসীদেরকে আদিবাসী হিসেবে সম্বোধন করেছেন আমরা আশান্বিত হয়েছিলাম। কিন্তু পরে আমাদের ছাত্র ও যুব’রা জানুয়ারিতে যখন ঢাকার রাস্তায় মার খেল তখন এই সরকার তেমন কোনো কঠোরতা দেখাতে পারেনি। আমরা হতাশ হয়ে পড়লাম। বিভিন্ন সংস্কার কমিশনেও আদিবাসীদের অন্তরভুক্তির বিষয়টি আমাদের কাছে তেমন গ্রহনযোগ্য ও সন্তোষজনক নয়। কাজেই এই সরকারের কাছে আমাদের উচ্চপ্রত্যাশা আজ হতাশ করেছে।

একই সুর ধ্বনিত হল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী ও নাগরিক উদ্যোগের প্রধান নির্বাহী জাকির হোসেন এর মুখে। আইপিনিউজকে তিনি বলেন, ”প্রথম থেকেই একটা বিষয় নিয়ে আমাদের অসন্তোষ আছে। যে রিফর্ম কমিশনগুলো হয়েছে, আমরা আসলে সেখানে আদিবাসীদের কোন রিপ্রেজেন্টেশনই পাই নাই। এই যে একটা পরবর্তনের এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ বিনির্মানের যে প্রতিশ্রুতি এই আন্দোলনের ছিল, সেখানে স্পষ্টতই আদিবাসীসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী অংশগ্রহণ করেছে । আমরা রাস্তায় যখন দেখেছি, তখন শুধু আদিবাসীরাই না, যারা আন্দোলনে ছিল তারা দেয়ালে লিখেছে যে আমাদের দেশে কোন বৈষম্য চলবে না, জাতিবিদ্বেষ চলবে না,সকল জাতিগোষ্ঠীর সমান অধিকার থাকবে। আদিবাসী শব্দটাও দেওয়ালে আমরা প্রচুর দেখতে পেয়েছি। এইটা যে শুধু আদিবাসীরাই লিখেছে ব্যাপারটা এরকম না, আন্দোলনের স্পিরিটটাই তেমন ছিল। কিন্তু একটা সুশাসনের গণতান্ত্রিক সমাজ নির্মাণের যে আকাঙ্খা সেখান থেকে আমরা দূরে চলে গিয়েছি।”

চুক্তি বাস্তবায়নের দাবিতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন এর আয়োজনে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত গণমিছিল।

সংস্কার কমিশনের রিপোর্টসমূহ নিয়ে তিনি বলেন, ”যেসব রিপোর্ট ইতিমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে, সেখানেও কোথাও আদিবাসী কিংবা পিছিয়ে পড়া অন্যান্য বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কথা কমিটমেন্টে আসে নাই। যে স্লোগানের ভিত্তিতে সমস্ত দেশবাসী এক হয়ে স্বৈরশাসককে হটিয়েছে, সেখান থেকে যে পরিবর্তন এবং প্রতিশ্রুতি আশা করেছিলাম, সেটি আমরা দেখতে পাচ্ছি না। আমাদের অনেকদিনের দাবি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন। সেগুলো বাস্তবায়নের কোন উদ্যোগ দেখি নাই। তবে সাম্প্রতিককালে আমরা শুনেছি, যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটির একটা সভা হয়েছে, সেখানে কিছু বিষয় নিয়ে আলাপও হয়েছে, কিন্তু তার রিফ্লেকশন আমরা এখনো দেখতে পাচ্ছি না।”

জাকির হোসেন আরো বলেন, ”যে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্খায় এত মানুষ প্রাণ দিলো, সেখানে কিন্তু আমরা তেমন কোন সফলতা লক্ষ্য করছি না। আমরা মনে করি-বৈষম্য কোথায় আছে এবং কারা কারা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী তাদের জন্য একটা দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া দরকার। পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য একটা কমিশন গঠন করা দরকার। যে কমিশন মানবাধিকার কমিশনের মতোই আলাদাভাবে সংখ্যালঘু, আদিবাসী, দলিতদের বিষয়গুলো দেখবে। এজন্য আমরা দ্রুত একটা কমিশনের দাবি করি। এই কমিশন আবার রিফর্ম কমিশন না, আমরা চাচ্ছি এটা একটা পার্মানেন্ট কমিশন হবে এবং সেই কমিশন কন্সটিটিউশন রিফর্মের যে প্রস্তাবনাগুলো আছে, সেই প্রস্তাবনা বলে একটি ’কন্সটিটিউশনাল কমিশন’ হবে বলে আমরা এই দাবি করছি।”

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের তিন দিন আগে অনুষ্ঠিত দ্রোহ যাত্রায় প্রদর্শিত দাবি সম্বলিত ব্যানার । ছবি’র স্থান: রাজু ভাষ্কর্য, টিএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২ আগষ্ট ২০২৪।

এদিকে গত একবছরে শুধু আদিবাসীরা না, বাংলাদেশের জনমানুষের কল্যাণকর বা তাদের জন্য উপকারে আসবে এরকম সরাসরি কোন প্রত্যক্ষ বিষয়ই আসলে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নাই দাবি করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ান আইপিনিউজকে বলেন, ”একদম মৌলিকভাবে বললে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত কোনো সিদ্ধান্ত আমরা দেখিনি এবং আমরা যেহেতু কৃষিনির্ভর একটা জাতি সেখানে কোন কৃষি কমিশনও নাই। মানুষের আকাঙ্খার প্রতিফলন হতে পারতো এমন কোনো প্রত্যক্ষ উদ্যোগ ও সিদ্ধান্ত এ সরকারের পক্ষ থেকে দেখা যায়নি।”

হতাশার সুরে তিনি বলেন, “জনমানুষের যে আকাঙ্খা সেটি পরিপূরনের কোন উদ্যোগই দেখা যায় নি, যেটা দেখা গেছে সেটা আসলে প্রত্যক্ষভাবে সরাসরি ক্ষমতায়িত যে  রাজনৈতিক দলসমূহ আছে, সেই রাজনৈতিক দলসমূহের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে কমিশন গঠন করা হয়েছে।  সেই ক্ষমতায়িত মানুষদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কমিশন যখন গঠন করতে দেখা গিয়েছে, তখন সেখানে আসলে মূলধারার সাধারণ জনগণ কিংবা আদিবাসী বা চা-শ্রমিক বলি, তারা সবাই আসলে এ সকল কমিশন থেকে যোজন যোজন বিচ্ছিন্ন। এ সকল কমিশনের সাথে জনমানুষের কোন সম্পৃক্ততা নাই। এ সকল কমিশনের যোগাযোগ আসলে ক্ষমতায়িত বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও তাদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যে সিন্ডিকেটসমূহ আছে তাদের সাথেই রয়েছে। গত একবছরে এর বাইরে আসলে কিছুই হয়নি উপরন্তু নানা ধরনের বিশৃঙ্খলা এবং দাবি-দাওয়ার প্রেক্ষাপটে দেখা গিয়েছে যে জনমানুষের দূর্ভোগ বেড়েছে। সে দূর্ভোগ থেকে সাধারণ নাগরিকও রেহাই পায় নি আর আদিবাসী তো প্রশ্নই আসে না।”

ড. স্নিগ্ধা রেজওয়ানা আরো বলেন,  “আদিবাসীদের ক্ষেত্রে যেটি দেখা গিয়েছে- বিগত সরকারের সময়ে যখন আদিবাসীদের একঘরে করে রেখে দেওয়া হয়, সেটার একটা ব্যাখ্যা আমাদের কাছে ছিল। কিন্তু এই সরকারের সময় যেখানে আদিবাসীদের নিপীড়িত হতে দেখা গিয়েছে সেটার আসলে কোন ব্যাখ্যাই নাই। কারন এই সরকার কোন রাজনৈতিক সরকার ছিল না ।সে জায়গা থেকে বরঞ্চ সম্ভাবনা ছিল কিছু একটা করার। কারন আমরা বুঝি, যখন একটা মানুষ বা একটা দল নির্বাচনে যায়, তার মধ্যে একটা জনতুষ্টিবাদী প্রবণতা (পপুলিস্ট এটিটিউট) থাকে যার কারনে সে অনেক সিদ্ধান্ত স্বাভাবিক কারনে গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু দূর্ভাগ্যক্রমে শুধু আদিবাসী না কোন ইস্যুতেই এই সরকারকে এমন কোন সিদ্ধান্ত নিতে দেখা যায় নাই যেটা জনমানুষের আকাঙ্খা পূরন করবে।”

তবে আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং হতাশ হয়েও আশার সুরে  বলেন, ” আদিবাসীদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিকভাবে যে নিপীড়ন সে নিপীড়নের বিরুদ্ধে আদিবাসীরা এখনো সংগ্রাম করছে। তরুণরা এগিয়ে আসছে। অন্তরভুক্তিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও স্বীকৃতির যে সংগ্রাম সে সংগ্রাম আমাদের তরুণদেরকেই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। হয়ত একদিন আমরা সেই কাংঙ্খিত রাষ্ট্র ও সরকার পাবো।”

রূপাইয়া শ্রেষ্ঠা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, “এত কিছুর পরও আমি হতাশ নই। কারণ গণঅভ্যুত্থান কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের জন্য নয়, এটা মানুষের চেতনার উন্মেষের জায়গা। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের সংগ্রাম যদি ধারাবাহিক থাকে, তবে একদিন সকল মানুষের আশা- আকাঙ্খা এবং প্রান্তিকতায় থাকা মানুষের অধিকারও  প্রতিষ্ঠিত হবেই।”

 

 

 

 

Back to top button