আঞ্চলিক সংবাদ

জুম্ম সমাজে নারীদের অধিকার, ন্যায়বিচার ও কর্ম সুনিশ্চিত চেয়ে বান্দরবানে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত

আইপিনিউজ ডেস্ক: আজ (৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে “জুম্ম সমাজব‍্যবস্থায় নারী ও মেয়েদের অধিকার, ন‍্যায়বিচার ও কর্ম সুনিশ্চিত করো” স্লোগানকে সামনে রেখে বান্দরবানেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়েছে।

সকাল ১০টায় বান্দরবান জেলা সদরের মধ্যম পাড়ায় মাস্টার গেস্ট হাউজে পার্বত‍্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন, বান্দরবান জেলা কমিটির উদ‍্যোগে এই উপলক্ষে এক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

হিল উইমেন্স ফেডারেশন, বান্দরবান জেলা কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক মেসাইনু (এনু) মারমার সঞ্চালনায় এবং পার্বত‍্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি মেঞোচিং মারমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় স্বাগত বক্তব‍্য রাখেন পার্বত‍্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক সিংমেউ মারমা।

প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে বক্তব‍্য রাখেন পার্বত‍্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় সদস‍্য সাধুরাম ত্রিপুরা। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব‍্য রাখেন বিশিষ্ট লেখক জিরকুং সাহু, পার্বত‍্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির বান্দরবান জেলা কমিটির সভাপতি সুমন মারমা, পার্বত‍্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশিকা চাকমা,পার্বত‍্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ বান্দরবান জেলা শাখার সভাপতি উশৈহ্লা মারমা।

সাধুরাম ত্রিপুরা বলেন, অধিকার সচেতনতায় নারীরা এখনো পিছিয়ে থাকায় আজকের আলোচনাসভায় নারীদের সংখ‍্যা কম লক্ষ‍্য করা যাচ্ছে। কিন্তু ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসী বিপ্লবে ও বিপ্লবকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীদের বড় অবদান লক্ষ‍্য করা গেছে এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও নারীরা আত্মত‍্যাগ করে দেশের জন‍্য রাষ্ট্রের জন‍্য ভূমিকা রেখেছেন। অধিকার ঘরে বসে পাওয়া যায় না, নারীদের জাগরণ করে লড়াই সংগ্রামের মধ‍্য দিয়ে অধিকার ছিনিয়ে আনতে হবে। অধিকারের ধ্বনি যেখানে জাগরিত হবে সেখানেই নারীদের একত্রিত হতে হবে।

তিনি বলেন, পৃথিবীতে অনেক জ্ঞানী-গুণী ব‍্যক্তির জন্মই হয়েছে নারীদের থেকে। নারীদের মধ‍্যে ইতিহাস, রাজনীতি, সমাজ সম্পর্কে সম‍্যক জ্ঞান রাখতে হবে। নাহলে নারীরা সবসময় পিছিয়ে থাকবে। লড়াই সংগ্রাম ব‍্যতীত অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে না। ভারতবর্ষের স্বর্ণলতা দেবীদের মতো নারী নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। যাতে নারীরা পুরুষদেরও নেতৃত্ব দিতে পারে। নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে লড়াই সংগ্রামে সফল হওয়া সম্ভব হবে না।

তিনি আরও বলেন, সারাবিশ্ব যখন বিজ্ঞানের সুফল ভোগ করছে তখন পার্বত‍্য চট্টগ্রামের মানুষেরা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও বৈষম্যের  শিকার হয়ে আছে। এখনো পাহাড়ের মানুষের অধিকার  নিশ্চিত হয়নি, জুম্ম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ  হয়ে পার্বত‍্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের লড়াই সংগ্রামে সামিল হতে হবে, নেতৃত্ব দিতে হবে। পার্বত‍্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের মধ‍্য দিয়েই নারী-পুরুষ, পাহাড়ি-বাঙালি সকলের অধিকার নিশ্চিত হবে।

জিরকুং সাহু বলেন, আজকের আয়োজনে আমরা যে কথাগুলো বলছি সেগুলো যে যার এলাকায় নিজ নিজ মাতৃভাষায় আয়োজন করলে খুবই উপযোগী হতো। নারীর ক্ষমতায়ন ও নারীদের উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন‍্য আজকে আমাদের এই আয়োজন।

তিনি বলেন, শুধুমাত্র বাংলাদেশেই নারী সুরক্ষা আইন থাকা সত্ত্বেও নারীর প্রতি সহিংসতা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশে নারীরা পার্লামেন্ট, রাজনীতিতে নেতৃত্ব দিচ্ছে। পার্বত‍্য চট্টগ্রামে বিজাতীয় শাসকগোষ্ঠী দ্বারা আদিবাসী নারীরা যৌন নির্যাতন, সহিংসতার শিকার হচ্ছে। নারীদের সামনে আগানোর জন‍্য, অধিকার ও অস্তিত্বকে ধরে রাখার জন‍্য সাহস নিয়ে এগিয়ে আসা উচিত।

সুমন মারমা বলেন, আজকে যে লিফলেট বা প্রচার পত্রটি বিতরণ করা হয়েছে সেখানে পার্বত‍্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি ও হিল উইমেন্স ফেডারেশন তাদের বক্তব‍্য উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। নারী সমাজ ঘরে এবং ঘরের বাইরে লড়াই সংগ্রামে ভূমিকা না রাখলে, সমর্থন ব‍্যতীত অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে পুরুষদের সামিল হওয়া কঠিন হতো। বিশ্বের অর্ধেক অংশ নারী সমাজকে অধিকার, ন‍্যায়বিচার ও কর্ম নিশ্চিত করতে না পারলে তাদের পেছনে ফেলে, অধিকার বঞ্চিত করে বিশ্বের উন্নয়ন সম্ভব নয়। পুরুষ এবং সমাজের ব‍্যক্তিদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে নারী সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ যুগের শাসন-শোষণ, মামলা-হামলার কারণে পার্বত‍্য চট্টগ্রামে জুম্মদের মধ‍্যে সর্বক্ষেত্রে ভয় বিরাজ করছে। সে কারণে পার্বত‍্য চট্টগ্রামে ছাত্র সমাজ ও নারী সমাজ লড়াই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করতে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছে। তার ফলে পার্বত‍্য চট্টগ্রামে ছাত্র সমাজ ও  নারী সমাজ লড়াই-সংগ্রামে সঠিকভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না।

তিনি আরও বলেন, পার্বত‍্য চট্টগ্রামের সমাজ ব‍্যবস্থায় নারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে যাতে নারীদেরও পুরুষের সমান সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত হয়। নারী সমাজের অধিকার নিশ্চিত করতে না পারলে লড়াই – সংগ্রামে সফল হওয়া সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, রাষ্ট্র আমাদের বৈষম‍্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখছে। সেজন‍্য তারা সর্বক্ষেত্রে নজরদারি এবং চলাচলের উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে। সকল সমস‍্যা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হচ্ছে, পার্বত‍্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন করা। কিন্তু চুক্তির ৭২টি ধারার মধ‍্যে শুধুমাত্র ২৫টি ধারা পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। পার্বত‍্য চট্টগ্রামে নারী এবং তাদের সন্তানদের হিল উইমেন্স ফেডারেশন এবং পার্বত‍্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতিতে যুক্ত হয়ে পার্বত‍্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনে সামিল হতে হবে। নারীরা নিজেদের দূর্বল ভেবে গুটিয়ে না রেখে সাহস নিয়ে সংগ্রামে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

আশিকা চাকমা বলেন, বিশ্বের নারী সমাজের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে আজকের দিনটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। পার্বত‍্য চট্টগ্রামের নারী সমাজের যে বাস্তবতা যুগ যুগ ধরে বিজাতীয় শাসনব্যবস্থা বিদ‍্যমান রয়েছে। বিজাতীয় শাসন ব‍্যবস্থা থেকে মুক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নারীদের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু যেভাবে ভূমিকা রাখার কথা সেভাবে ভূমিকা রাখতে পারছে না। নারীরা লড়াই সংগ্রাম করতে না পারলে সবসময় শোষিত-নিপীড়িত থেকে যাবে। নারী সুরক্ষা আইন থাকলেও রাষ্ট্রব‍্যবস্থার দূর্বলতার কারণে নারীরা প্রতিনিয়ত যৌন সহিংসতা, ধর্ষণের শিকার হচ্ছে।

উশৈহ্লা মারমা বলেন, ১৮৫৭ সালে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্বে সবচেয়ে বড় আন্দোলনের ঘটনা ঘটে।নারীদের সে সংগ্রাম, ত‍্যাগের ইতিহাসকে স্মরণ করার জন‍্য এই দিনটি পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশে পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাভাবনা, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের কারণে নারীদের সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব হয়নি।সংবিধানে নারীদের সুরক্ষার বিষয়ে উল্লেখিত থাকলেও সেগুলো কাগজে কলমের মধ‍্যেই সীমাবদ্ধ।পার্বত‍্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পার্বত‍্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসী পাহাড়ি-বাঙালি, নারীদের অধিকারের বিষয়ে লিপিবদ্ধ থাকলেও চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় নারীরাও অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

Back to top button