জাতীয়

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের “আদিবাসী গণমাধ্যম” নিয়ে ৭ দফা সুপারিশমালা প্রণয়ন

আইপিনিউজ ডেক্স: আজ ২২ মার্চ, ২০২৫ অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার তার গঠিত গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ প্রকাশ করেছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন “আদিবাসী গণমাধ্যম” বিষয়ে ৭ দফা সুপারিশ প্রদান করেছে। গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের পেশকৃত সুপারিশমালার ২১.১৮ অনুচ্ছেদে “আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর জন্য সমসুযোগ সৃষ্টি সম্পর্কিত সুপারিশ” অংশে আদিবাসী গণমাধ্যম নিয়ে সুনির্দিষ্ট ৭ দফা সুপারিশমালা সমূহ হল-

১. গণমাধ্যম নীতিমালায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের বিষয় অর্ন্তভুক্তি;

২. গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য নূন্যতম সম্প্রচার সময়সীমা নির্ধারণ;

৩. আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রকাশ/প্রচাররত গণমাধ্যমে আদিবাসী ভাষায় সংবাদ ও অনুষ্ঠান পরিবেশনকে গুরুত্ব দেওয়া;

৪. আদিবাসীদের নিজস্ব উদ্যোগ ও অর্থায়নে যেসব মাধ্যম গড়ে উঠেছে, তার নিবন্ধন সহজতর করা; এছাড়া আদিবাসীদের নিজস্ব গণমাধ্যম যেন আরও গড়ে উঠতে পারে, তার প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া।

৫. মূলধারার গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপস্থাপন যথাযথ ও উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর যথাযথ উপস্থাপনের জন্য নির্দেশিকা প্রস্তুত করা।

৬. সাংবাদিকতা শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে ’আদিবাসী বিষয়’ (Indigenous Studies) অর্ন্তভুক্ত করা।

৭. আদিবাসী সাংবাদিক/সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের জন্য ফেলোশিপ দেওয়া ও নিয়োগের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার প্রদান করা ।

ছবি: সাক্ষাৎকার নিচ্ছে আইপিনিউজ বিডি

উল্লেখ্য গত ১৫ মার্চ ২০২৫ আদিবাসীদের অনলাইনভিত্তিক জাতীয় পর্যায়ের সংবাদ মাধ্যম আইপিনিউজ বিডি বাংলাদেশে আদিবাসী গণমাধ্যম শক্তিশালী করণে এবং মূলধারার গণমাধ্যমে আদিবাসী সম্প্রদায়ের প্রসঙ্গগুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন নিশ্চিত করার জন্য গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের কাছে মৌলিক ৫ দফা ও কতগুলো সুনির্দিষ্ট উপদফা সম্বলিত সুপারিশমালা প্রেরণ করে। উক্ত মৌলিক সুপারিশমালা  সমূহ হল:

১. নীতিগত ও আইনগত সংস্কার

আদিবাসী গণমাধ্যম নীতিমালা প্রণয়ন: আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে একটি নির্দিষ্ট গণমাধ্যম নীতিমালা তৈরি করা।

সম্প্রচার আইন সংশোধন: টেলিভিশন, রেডিও ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে আদিবাসী সম্প্রদায়ের জন্য নূন্যতম সম্প্রচার সময় নির্ধারণ।

আদিবাসী ভাষায় সংবাদ সম্প্রচার নিশ্চিতকরণ: জাতীয় ও আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিচালিত আঞ্চলিক গণমাধ্যমে আদিবাসী ভাষায় সংবাদ পরিবেশন বাধ্যতামূলক করা।

২. আদিবাসী গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠা ও সহযোগিতা

জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক ঘোষণাপত্র-২০০৭ (UNDRIP) এর ১৬ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে যে,

  1. Indigenous peoples have the right to establish their own media in their own languages and to have access to all forms of non-indigenous media without discrimination.
  2. States shall take effective measures to ensure that State-owned media duly reflect indigenous cultural diversity.

এ অনুচ্ছেদ বাস্তবায়নে জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশে আদিবাসীদের প্রসঙ্গগুলো গণমাধ্যমে সঠিক ও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হওয়ার জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপ গ্রহন জরুরী:

নীতিমালা শিথিলকরণ: আদিবাসীরা নিজেদের অর্থায়নে ও পরিচালনায় যেসব গণমাধ্যম গড়ে তুলেছে সেসব গণমাধ্যম যেমন- আইপিনিউজ বিডি, এর স্বীকৃতি প্রদান করা। যেহেতু মূল ধারার গণমাধ্যমের তুলনায় আদিবাসী গণমাধ্যম এর সক্ষমতা বহুদিক (যেমন-জনবল, কাঠামো, আর্থিক, দক্ষতা) দিয়ে পিছিয়ে, সেক্ষেত্রে পরিপূর্ণ গণমাধ্যম হিসেবে রেজিস্ট্রেশনের যে নীতিমালা রয়েছে তার আলোকে আদিবাসী গণমাধ্যমসমূহ অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই আদিবাসী গণমাধ্যমের বৈধতা নিশ্চিতবকরণে এসব গণমাধ্যম যেন রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে স্বীকৃতি পায় তার জন্য গণমাধ্যম রেজিস্ট্রেশন ও নবায়ন নীতিমালা ন্যূনতম মৌলিক শর্তের আলোকে শিথিল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা।

সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা: ঐতিহাসিক কাল ধরে আদিবাসীরা নিজেদের অধিকার থেকে বঞ্চিত। আর্থ-সামাজিক নানা প্রান্তিকতায় আজ তারা দিশেহারা। এমতাবস্থায় তাঁদের ঘটনাসমূহ মূল ধারার গণমাধ্যম সমূহে সঠিকভাবে চিত্রিত হয় না। কিছু বিষয় উঠে আসলেও সেগুলোর অধিকাংশ বিকৃত, খন্ডিত কিংবা বানোয়াট। তাই আদিবাসীরা যেন নিজেদের গণমাধ্যম শক্তিশালী করতে পারে তার জন্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা। এক্ষেত্রে আদিবাসীদের নিজস্ব রেডিও, টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং অনলাইন মিডিয়া গড়ে তুলতে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা। অন্যদিকে বৈদেশিক সহায়তা গ্রহনেও প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান করা।

কমিউনিটি রেডিও বিস্তৃত করা: আদিবাসী ভাষায় সম্প্রচার নিশ্চিত করার জন্য নতুন কমিউনিটি রেডিও স্থাপন এবং বিদ্যমান রেডিওগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করণে জোর পদক্ষেপ গ্রহন করা।

৩. মূলধারার গণমাধ্যমে আদিবাসীদের প্রতিনিধি নিশ্চিত করা

আদিবাসী সাংবাদিকদের নিয়োগ বৃদ্ধি: মূলধারার গণমাধ্যমে আদিবাসী সাংবাদিকদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিশেষ নিয়োগ ব্যবস্থা চালু করা।

সাংবাদিকতায় আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি প্রদান: সাংবাদিকতা বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের জন্য আদিবাসী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি ও ফেলোশিপ চালু করা।

গণমাধ্যম প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্তি: আদিবাসী সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা এবং মূলধারার সাংবাদিকদের জন্য আদিবাসী বিষয়ক সংবেদনশীলতা প্রশিক্ষণ চালু করা। বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে ‘গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ’ এর অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ে পাঠদানের জন্য ‘ইন্ডিজিনাস স্টাডিজ’ কোর্স চালু করা, যাতে করে খুদে সাংবাদিকরা আদিবাসী বিষয়ক মৌলিক জ্ঞান ও দৃষ্টিভঙ্গি লাভ করতে পারে।

৪. সংবাদ কাভারেজে অন্তর্ভুক্তি ও সংবেদনশীলতা বৃদ্ধি

আদিবাসী বিষয়ক রিপোর্টিং গাইডলাইন তৈরি: গণমাধ্যম যেন আদিবাসী সম্প্রদায়কে সঠিক ও সংবেদনশীল উপায়ে উপস্থাপন করে, সে জন্য নির্দেশিকা প্রণয়ন।

আদিবাসী সংস্কৃতি, ভাষা ও সমস্যা নিয়ে বিশেষায়িত অনুষ্ঠান ও প্রতিবেদন: টেলিভিশন, রেডিও এবং সংবাদপত্রে আদিবাসীদের জীবনযাত্রা, ঐতিহ্য ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরতে বিশেষ অনুষ্ঠান চালু করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যম মালিক ও সংবাদকর্মীদের প্রণোদনা প্রদান করা।

ভুল তথ্য বা নেতিবাচক প্রচারণা প্রতিরোধ: আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক বা ভুল তথ্য প্রচার রোধে গণমাধ্যমে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা চালু করা।

৫. সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা বৃদ্ধি

আদিবাসী গণমাধ্যমের জন্য সরকারি অনুদান ও বিজ্ঞাপন বরাদ্দ: আদিবাসীদের বিভিন্ন ভাষার সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের জন্য সরকারি-বেসরকারি বিজ্ঞাপন ও অনুদান বরাদ্দ বৃদ্ধি করা।

গবেষণা ও ডকুমেন্টেশন: আদিবাসী গণমাধ্যমের অবস্থা, চাহিদা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে গবেষণা ও তথ্য সংরক্ষণ উদ্যোগ নেওয়া।

আইপিনিউজ এর প্রতিক্রিয়া:

এদিকে আদিবাসী গণমাধ্যম শীর্ষক সুনির্দিষ্ট সুপারিশমালার জন্য এবং আইপিনিউজ এর সুপারিশমালা সমূহ বিবেচনার জন্য গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনকে ধন্যবাদ জানিয়েছে আইপিনিউজ এর সম্পাদক আন্তনী রেমা।

এ প্রসঙ্গে আইপিনিউজ এর নির্বাহী সম্পাদক সতেজ চাকমা বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশন আমাদের মৌলিক প্রস্তাবনাসমূহ আমলে নিয়েছে। আমরা আশা করি দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমের কার্যক্রমে এবং গণমাধ্যম প্রশিক্ষণে সেসব বিষয় প্রতিফলিত হবে। গণমাধ্যম সমূহের কাভারেজের মধ্যে আমরা আদিবাসী সম্পর্কিত প্রসঙ্গগুলো সঠিক ও যথাযথরূপে উপস্থাপনে আরো সংবেদনশীলতার আশা করি এবং সুপারিশসমূহের কার্যকর বাস্তবায়ন দেখতে চাই।

 

Back to top button