অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ বিনির্মাণে আগামীর সরকারকে আদিবাসী বান্ধব হওয়া জরুরি

আইপিনিউজ বিডি: বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম কর্তৃক আয়োজিত “ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণে আদিবাসী জনগণের প্রত্যাশা” শীর্ষক এক জাতীয় গোলটেবিল বৈঠক ঢাকার দি ডেইলি স্টার কনফারেন্স হল রুমে আজ ৩ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০:৩০ টায় অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মনিরা ত্রিপুরায় সঞ্চালনায় সভার শুরুতে শুভেচ্ছা বক্তব্য প্রদান করেন সংগঠনের সহ সভাপতি অমর শান্তি চাকমা এবং মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সতেজ চাকমা।
শুভেচ্ছা বক্তব্যের শুরুতে অমর শান্তি চাকমা বলেন, স্বাধীনতার পরবর্তী বাংলাদেশে ইতিমধ্য ১২ টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক দলগুলো কেবল নির্বাচনী ইশতেহারে আদিবাসীদের কথা সামান্যভাবেই উল্লেখ করে। যৎসামান্য যা উল্লেখও করা হয় বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেটি শুন্য পর্যায়ে থাকে। বাংলাদেশের আদিবাসীরা বরাবরেরে মত তাদের অধিকারের জায়গা থেকে উপেক্ষিত থাকেন। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি স্থাপনের লক্ষ্য স্বাক্ষরিত পার্বত্য চুক্তি এখনো অবাস্তবায়িত অবস্থায় রয়েছে। সমতলের আদিবাসীদের দীর্ঘদিনের দাবি পৃথক মন্ত্রণালয় ও ভূমি অধিকার সুরক্ষার জন্য ভূমি কমিশন গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করার দাবিও জানান তিনি। যারা আগামীতে দেশ পরিচালনার দ্বায়িত্ব নিবেন তারা যেন আদিবাসীদের অধিকার বিষয়ে কথা বলেন, আদিবাসীদের অধিকার নিয়ে সচেষ্ট থাকেন এ আশাবাদও ব্যক্ত করেন তিনি।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতির মণ্ডলীর সদস্য মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, আগামীর ত্রয়োদশ নির্বাচনের হাওয়া বইছে। একদিকে নয়া বন্দোবস্তের কথা বলা হচ্ছে অন্যদিকে বৈষম্য সৃষ্টি করে দেশকে অরাজকতার দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন ত্রয়োদশ নির্বাচনে হ্যাঁ বা না ভোট প্রচার করা হচ্ছে, আমরা মনে করি এই হ্যাঁ বা না ভোটের মাধ্যমে জনগণের সাথে প্রতারনা করা হচ্ছে। নয়া বন্দোবস্তের কথা বললেও মেহনতি, আদিবাসী মানুষের অধিকারের কথা উল্লেখ নেই। অথচ দেশ পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল জনগণের কথায়, জনগণের ইচ্ছায়। সংস্কারের কথা বলে দেশকে পেছনে নেয়ার জন্য স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি উঠেপড়ে লেগেছে। তিনি বলেন আগামিতে গরীব, মেহনতি, আদিবাসী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে আবারও একটা গণঅভ্যুথান সৃষ্টি হবে। তিনি আরও বলেন আমাদের যুক্তফ্রন্ট আদিবাসী জনগণের সাথে ছিল , ভবিষ্যতেও থাকবে নিপীড়িত আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কথা তুলে ধরবে।

বাসদের সহ সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন বলেন, পৃথিবীতে বহু দেশ আছে যাদের জনসংখ্যা ৩০ লাখেরও কম । অন্যদিকে বাংলাদেশের আদিবাসীদের জনসংখ্যা ৩০ লাখের বেশি। নির্বাচনের সময় সাধারন জনগন সাধারনত ভয়ের মধ্য থাকে কারন ভোট প্রদান করার আগে বা পরে তারা প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের দ্বারা নিপীড়নের শিকার হয়। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানেও অনেক দুর্বলতা রয়েছে। সেখানে আদিবাসীদের অধিকারকে অস্বীকার করা হয়েছে, সাধারণ জনগণের কথা উপেক্ষিত করা হয়েছে। আমি একজন নাগরিক। আমার নাগরিক সুরক্ষা প্রদানের দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু রাষ্ট্র বারংবার প্রতারনা করে যাচ্ছে। আমি মনে করি আদিবাসীদের বঞ্চিত রেখে বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভব না।
গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান ও ঢাকা ১২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী তাসলিমা আখতার বলেন, বাংলাদেশ কিন্তু একক জাতির রাষ্ট্র না। তারপরও বাংলাদেশের সংবিধানে বাকি জাতিগোষ্ঠীর কথা বলা হয়নি। দেশের আদিবাসী জনসংখ্যা ৪০ লাখের বেশি অথচ সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব খুবই কম। তিনি বলেন স্বাধীনতার সময় থেকে ২৪-এর গণঅভ্যূত্থান পর্যন্ত সকল জাতিসত্তার মানুষের অংশগ্রহণ ছিল। কিন্তু সেই ইতিহাস কতটুকু সংরক্ষিত আছে? আজকে আদিবাসীদের অধিকারকে বারবার অস্বীকার করা হচ্ছে । যারা ক্ষমতায় যায় তারা আদিবাসীদের অধিকারের কথা ভুলে যায়। আগামীর সংসদে আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব খুবই নগন্য বলে তিনি অভিযোগ করেন।
কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক এহসান মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশ একটি বহু জাতির, ভাষার, বহু ধর্মের ও সংস্কৃতির দেশ। কিন্তু ঐতিহাসিক কাল থেকে দেশের আদিবাসী জনগন বৈষম্যর শিকার হয়ে আসছে। রাষ্ট্র আজকে ভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বাঙ্গালি পরিচয়ে পরিচিত করার জন্য চাপিয়ে দিচ্ছে। দেশের প্রত্যক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। কিন্তু সেসব ভাষা সংরক্ষণে রাষ্ট্রের কোনো যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠী বরাবর ঐক্যবদ্ধ কণ্ঠস্বরকে ভয় পায়। ফলে রাষ্ট্র আজ আদিবাসীদেরও বিভক্ত করে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, জুলাই আন্দোলনের পরবর্তীতেও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করেছে। বাংলদেশের ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে বুঝা যায় দেশের আদিবাসী জনগণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে আসছে। রাষ্ট্র তাদের নাগরিক সুরক্ষা দিতে পারে নি। অন্যদিকে পার্বত্য চুক্তিকে বাতিল করার জন্য উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পাহাড়ে সামরিক নীতি প্রয়োগ করে সেখানকার আদিবাসীদের উপর দমন-পীড়ন করা হচ্ছে। এছাড়াও সমতলের আদিবাসীদের উপরও বিভিন্ন প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল, গোষ্ঠী কর্তৃক দমন-পীড়ন চলমান রয়েছে। বাংলাদেশে মানবাধিকার কমিশন থাকলেও তেমন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না। তিনি ভবিষ্যতেও যেন মানবাধিকার কমিশনে আদিবাসী সদস্য রাখা হয় সেই দাবি জানান।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক মাহমুদুল সুমন বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার আজও নিশ্চিত করা হয়নি। রাষ্ট্র বারবার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ, অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা উচ্চারন করে। কিন্তু বাস্তবতা একেবারে ভিন্ন। তিনি অভিযোগ করে বলেন, আমরা যখন তিন পার্বত্য জেলায় যাই তখন মনের মনে হয় ভিন্ন দেশের বর্ডার ক্রস করছি। আজকে রাষ্ট্রই এই ওপনিবেশিক চরিত্র ধারণ করে পাহাড়ে দমন-পীড়ন চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সহ সাধারণ সম্পাদক গজেন্দ্রনাথ মাহাতো বলেন, আমাদের আদিবাসীদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন চলমান রাখতে হবে। আজকের তরুনরাই আগামীর দিনে আন্দোলনে যুক্ত হবে বলে এ আহবানও জানান তিনি।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনে সতেজ চাকমা সাম্প্রতিক বাংলাদেশের আদিবাসীদের উপর ঘটে যাওয়া মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মানের জন্য আদিবাসী জনগণের নিম্নোক্ত ৬ দফা দাবি তুলে ধরেন-
১. পরিচয়ের স্বীকৃতি: আগামীর সংবিধান সংস্কারে আদিবাসীদের ভিন্ন ভিন্ন জাতি সমূহের পরিচয়ের স্বীকৃতি এবং সামষ্টিক পরিচিতি হিসেবে আদিবাসী’পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা জরুরী।
২. ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি: আদিবাসীদের সমস্যার গোড়া ভূমি সমস্যার সমাধানে সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন ও পাহাড়ে ভূমি সমস্যার সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন পুনর্গঠন ও সক্রিয় করা জরুরী।
৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন: পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা সমাধানে অঞ্চলটিকে বেসামরিকীকরণসহ পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নে দ্রুত কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহন করা।
৪. চাকুরীতে কোটা পুনর্বহাল: প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর সরকারী চাকুরিতে আদিবাসীদের জন্য পূর্বে বরাদ্দকৃত ৫% কোটা পুনববর্হাল করা।
৫. সংসদে আদিবাসীদের জন্য আসন সংরক্ষণ: সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্তির জন্য এবং আদিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিতকরণে সংসদের উচ্চ কক্ষ ও নিম্নক্ষে আদিবাসীদের জন্য আসন সংরক্ষণ করা।
৬. সকল আদিবাসীর মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু: বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল আদিবাসী জাতিসমূহের নিজ নিজ ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু করে সেগুলো প্রচার ও প্রসারে মনোযোগী হওয়া।
সভায় বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সভাপতি টনি চিরানের সভাপতিত্বে আরও বক্তব্য রাখেন- বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের সাধারণ সম্পাদক ফাল্গুনী ত্রিপুরা, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সভাপতি খান আসাদুজ্জামান মাসুম , বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের কার্যনির্বাহী সদস্য রিপন বানাই, মানবাধিকার কর্মী ত্রিজিনাদ চাকমা। সভার মূল আলোচনার শেষে অংশগ্রহণকারী যুব ও ছাত্র প্রতিনিধিবৃন্দ মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন।


