অন্যান্য

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছেঃ জাতিসংঘের স্থায়ী ফোরামে জেএসএস প্রতিনিধি

নিউইয়র্কস্থ জাতিসংঘের সদরদপ্তরে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ১৬তম অধিবেশনে ‘বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা নির্যাতন বৃদ্ধি পেয়েছে’ বলে মতামত ব্যক্ত করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি বিধায়ক চাকমা।
এজেন্ডা-৪ঃ আদিবাসী অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের [অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন, সংস্কৃতি, পরিবেশ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবাধিকার] আলোকে স্থায়ী ফোরামের ৬টি এখতিয়ারভুক্ত ক্ষেত্রসমূহের বাস্তবায়ন সম্পর্কে গত ২৭ এপ্রিল ২০১৭ প্রদত্ত বক্তব্যে বিধায়ক চাকমা তাঁর বক্তব্যে আরো বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও আদিবাসী বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র বাস্তবায়িত না হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর নিপীড়ন-নির্যাতন জোরদার করা হয়েছে। অবৈধ গ্রেফতার ও আটক, অমানুষিক নির্যাতন, অস্ত্র গুঁজে দিয়ে গ্রেফতার, মিথ্যা মামলায় জড়িত করে জেলে প্রেরণ, তল্লাসীর নামে জনসংহতি সমিতির অফিসসহ ঘরবাড়ির জিনিসপত্র তছনছ ইত্যাদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, ২০১৬ সালে সাতজন জনপ্রতিনিধিসহ ১৫০ জন গ্রামবাসী ও জনসংহতি সমিতির সদস্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ও একজন ইউপি সদস্যসহ ৪০ জন গ্রামবাসী ও জনসংহতি সমিতির সদস্যকে আটক করা হয়েছে। এছাড়া ৬৩ জন গ্রামবাসী ও সমিতির সদস্যকে সাময়িক আটক ও হয়রানি, ৯৯ জনকে শারীরিক নির্যাতন এবং ১৫০ জন জনসংহতি সমিতির সদস্যকে এলাকাছাড়া করা হয়েছে। ২০১৭ সালে এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ব্যাপক মাত্রায় অব্যাহত রয়েছে। তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো চলতি এপ্রিল মাসে নানিয়ারচরে রমেল চাকমা নামে একজন আংশিক দৃষ্টি প্রতিবন্ধী এইচএসসি পরীক্ষার্থীকে সেনা নির্যাতনে হত্যার ঘটনা, যা পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ব্যাপক প্রতিবাদের ঝড় উঠে। এছাড়া নারীর উপর সহিংসতা, রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক ব্যাপক মাত্রায় ভূমি বেদখল, প্রায় ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহযোগিতায় সেটেলার বাঙালি কর্তৃক জুম্মদের উপর সাম্প্রদায়িক হামলা ইত্যাদি নৃশংস ঘটনা ঘটে ঘটেছে।
জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি আরো বলেন, বর্তমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বিষয়গুলো দীর্ঘ ১৯ বছর ধরে অবাস্তবায়িত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন সম্পর্কে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কেবল প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। যেমন, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ এর বিরোধাত্মক ধারা আট মাস আগে সংশোধন করলেও ভূমি কমিশনকে প্রয়োজনীয় তহবিল, জনবল ও অফিস বরাদ্দ প্রদান করেনি।
বিধায়ক চাকমা আরো বলেন, মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রসারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। যেমন বাংলাদেশ বর্তমানে মানবাধিকার পরিষদের সদস্য, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনের অন্যতম শান্তিরক্ষী সরবরাহকারী, সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ সফলতা ইত্যাদি অন্যতম। কিন্তুআদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র সমর্থন প্রদানে বাংলাদেশ চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, যে ঘোষণাপত্রের বর্তমানে এক দশক পূর্তি পালন করা হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে এই ঘোষণাপত্র বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে সম্পূর্ণ উপেক্ষার মধ্যে রয়েছে।
পার্বত্য চুক্তির দ্রুত, যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণার জন্য বাংলাদেশ সরকারে উৎসাহিত করতে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামকে আহ্বান জানান বিধায়ক চাকমা। ভূমি কমিশনের জন্য প্রয়োজন অর্থ ও জনবল বরাদ্দ, কার্যপ্রণালী বিধিমালা চূড়ান্তকরণ এবং রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে শাখা অফিস স্থাপনের মাধ্যমে ভূমি কমিশন কার্যকর করা; সকল অস্থায়ী ক্যাম্প ও সেনাশাসন ‘অপারেশন উত্তরণ’ প্রত্যাহার; পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সেটেলার বাঙালিদের যথাযথ পুনর্বাসন; ইউপিআরে প্রতিশ্রুতি অনুসারে নারী ও কন্যাশিশুর উপর সহিংসতা এবং সকল মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সুবিচার নিশ্চিত করা; এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সমীক্ষা অনুসারে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে গৃহীত সুপারিশমালা বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে সহযোগিতা করতে স্থায়ী ফোরামকে জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য যে, গত ২৪ এপ্রিল ২০১৭ নিউইয়র্কস্থ জাতিসংঘের সদরদপ্তরে আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ১৬তম অধিবেশন শুরু হয়েছে। আগামী ৫ মে পর্যন্ত এ অধিবেশন চলবে। জনসংহতি সমিতির প্রতিনিধি ছাড়াও বাংলাদেশ থেকে কাপেং ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি বাবলু চাকমা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক বিনতাময় ধামাই, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্কের প্রতিনিধি নু ওয়ে প্রমুখ আদিবাসী নেতৃবৃন্দ উক্ত অধিবেশনে অংশগ্রহণ করছেন।
এ অধিবেশনে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব সুদত্ত চাকমার নেতৃত্বে একটি সরকারী প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করছে। গত ২৬ এপ্রিল প্রদত্ত বক্তব্যে “আদিবাসী ধারনাটি আইনগতভাবে এবং ঐতিহাসিকগতভাবে সমর্থনযোগ্য পদ্ধতিতে বাবহার করা উচিত” বলে সুদত্ত চাকমা সরকারের পূর্ববর্তী বক্তব্য চর্বিত চর্বন করেন।
তিনি আরো বলেন, সরকার পর্যটনসহ ৩০টি অন্যান্য বিষয় যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ইত্যাদি পার্বত্য চট্টগ্রাম জেলা পরিষদের নিকট হস্তান্তর করেছে। গত বছর প্রধনিমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের রাজধানী ঢাকায় পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্সের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছে যেটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতিক ঐতিহ্য, সামাজিক প্রথা, ভাষা, ধর্ম এবং ব্যক্তিবিশেষের বৈশিষ্ট্যের প্রদর্শন করবে। সরকার বাংলদেশের জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্য মাতৃভাষায় শিক্ষা ইতোমধ্যে চালু করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। “আমাদের সরকার জাতিগত ও ধর্মীয় সংখালঘুদের উপর যেকোন প্রকারের মানবাধিকার লংঘনের ক্ষেত্রে ‘শূন্য সহনশীলতায়’ নীতি গ্রহণ করেছে” বলেও সরকারের পূর্বের বক্তব্য তিনি আবারও আওড়ান।

Back to top button