নারীর প্রাকৃত সত্তার শক্তি ও বিপত্তি- ফারহা তানজীম তিতিল

‘ইচ্ছে যার, উপায় ছিল না তার’—উদ্ধৃতিটা ঠিকঠাক মনে করতে পেরেছি কিনা জানি না। শোনা ছিল গল্পটা। পড়িনি। কলিম খান লিখেছেন, এই প্রেমপত্রটি স্কুলের একটি মেয়ে ছুঁড়ে দিয়েছিল যুবা প্রেমিকদের দিকে। যে ছেলেটি অর্থ বুঝেছিল, সেই পৌঁছে গিয়েছিল মেয়েটির সবচেয়ে কাছে। কথাটার অর্থ হলো, বেদনা নারীর। কারণ, শরীর থেকে যদি হাতটা কেটে ফেলা হয়, হাতের তো ব্যথা থাকবে না। ব্যথা করবে বাহুমূলে। আদিকালে প্রকৃতিতে নারী আর পুরুষ সত্তা একদেহে ছিল। তারপর প্রজননের সুবিধার জন্য প্রকৃতি পুরুষ সত্তাটিকে বিচ্ছিন্ন করে। ফলে নারীদেহ প্রকৃতির সমার্থক হয়ে রয়ে যায়। পুরুষ হলো বিচ্ছিন্ন অংশ। বিচ্ছিন্ন খণ্ডে বেদনা থাকে না। ক্ষমা করবেন পুরুষ বন্ধুরা। এই ব্যাখ্যা মেনে নেবার কিছু নেই। এ শুধু গল্প। এসব শুধু কথার কথা।
যুগে যুগে, কালে কালে নারীর বেদনা কি আসলেই প্রাকৃতিক কারণে? এক লোককথায় পড়েছিলাম, অনেককাল আগে পুরুষ রজস্বলা ছিল। ঋতুকালে তারা বাঁশের চোঙ পরে থাকত। একদিন এক মেয়ে দুষ্টুমি করে চোঙ ধরে মুচড়ে দিল। তাই ঈশ্বর শাস্তি হিসেবে নারীদেরকে ঋতুবতী করলেন। লোকগল্পগুলো সবসময় বিজ্ঞানসম্মত না হলেও বাস্তব জীবনের সূত্র থাকে সেখানে। গল্পে যাই ঘটুক না কেন, নারীরা কিন্তু সবসময়েই আছে আলোচনার কেন্দ্রে। নারী কৃষিকাজের আবিষ্কারক, সন্তানের গর্ভধারিণী, কিন্তু সে অর্থ সম্পদ এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকেনি। অন্যদিকে এতো ক্ষমতাবান হয়েও পুরুষ কখনো আলোচনা, মনোযোগ এবং আগ্রহের কেন্দ্রে ছিল না। নারীর সঙ্গে প্রকৃতি এবং বংশবৃদ্ধির নিবিড় যোগই কি পুরুষকে হীনমন্য করেছে? সে কারণেই কি নারীর জন্য তাকে বানাতে হয়েছে বিধিনিষেধ? আর নিজের জন্য বানাতে হয়েছে পৃথিবীজোড়া যোগাযোগের আসর? নারীর প্রতি আরোপিত বিধিনিষেধকে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মগুলো মোটামুটি স্বীকৃতি দিয়েছে। তারা নারীকে সম্মান বা অসম্মান যাই দিয়ে থাক, আবরণের মধ্যে রাখতে পছন্দ করেছে। আবরণ কি নারীর আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়? কখনো কখনো দেয়। ধরুন ধর্ষণের বেলায় কি ঘটে? নারী শারীরিকভাবে ব্যথিত হয়। মানুষ হিসেবে অপমানিত হয়। কিন্তু অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজ এই পরিস্থিতিতে ভিকটিম ব্লেইমিংয়ের মাধ্যমে নারীদের মানসিক এবং সামাজিক ক্ষতি করে। কখনো কখনো তার আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিয়ে তাকে জীবনবিমুখ করে তোলে। অথবা, এক্ষেত্রে পুরুষেরা ভাবতে পারে, তাদের নিজস্ব নারী, অপর কোনো দলের পুরুষের দখলে গেছে। এটা প্রথম দলের পুরুষের জন্য পরাজয়ের সূচক। তো দেখুন, নারী যতটা বিপন্ন, পুরুষের হীনমন্যতা তাকে তার চেয়েও বেশি বিপন্ন করে। এই বিপন্নতার যুগ কবে এলো সেটা নির্ণয় করা কঠিন। তবে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস তো মত দিয়েছেন যে, নিজের সন্তানকে চিহ্নিত করা এবং তাকে সম্পত্তি দেয়া নিশ্চিত করতেই নারীর ওপরে নিয়ন্ত্রণ আনা হয়েছে বা পরিবার প্রথার জন্ম হয়েছে। পরিবার গঠনের এটাই একমাত্র কারণ না বোধহয়। তবে এই কারণ, নারীর প্রাকৃত শক্তিকে পুরুষের অধীন করেছে।
বাংলাদেশের আদিবাসীদের মধ্যে কেবল মান্দি, খাসি এবং লিঙ্গামদের সমাজে নারীকে ক্ষমতায়িত দেখা যায়। সেখানেও আবার কেউ কেউ বলছেন, মাতৃসুত্রীয় হলেও মাতৃতান্ত্রিক নয় মান্দিরা। মধুপুরের মান্দি নারীদের ক্ষমতা গড়পড়তা হালুয়াঘাটের মান্দি নারীদের চেয়ে বেশি কেন? মধুপুরে আধুনিকায়ন এবং বাঙালি সংস্কৃতির প্রভাব কম বলে? মাতৃতন্ত্রকে স্বীকার করলে সমস্যা কি? আদিবাসীকে স্বীকার করলে যে সমস্যা সেটাই। স্বীকৃতিই যেন অর্ধেক জীবন। নারী তাই সব সমাজের রাজনীতিতেই বিপন্ন। আদিবাসী পুরুষ প্রেষণে থাকে। আদিবাসী নারী আরো বেশি প্রেষণে থাকে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের এক গবেষণায় এসেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে ৬১ শতাংশেরও বেশি নারী কর্মক্ষেত্রে বা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে বহু ধরনের সহিংসতার শিকার হয়েছে। তারা বাজারে, মাঠে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং কর্মস্থলে সহিংসতার সম্মুখীন হয়েছে।মানসিক, অর্থনৈতিক এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে তারা। যদিও নারী, পুরুষ বলে আলোচনাটাকে স্থবির না করে, নারীর প্রতি গড় মনোভাব দিয়ে বিষয়টা বললে মানানসই হয়। কারণ, প্রত্যেক ব্যক্তি এবং সমাজে এসব বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন ধরণ এবং মাত্রা খুঁজে পাব আমরা।
বাংলাদেশে এই সময়ে আদিবাসীদের স্বীকৃতি নেই। আদিবাসী নারীরা কেমন আছে, তা কেউ জানে না। তাদের জ্ঞান এবং দক্ষতার খোঁজ জানারও সুযোগ কম। তবে বাঙালি নারীর সমান জড়তা আদিবাসী নারীদের নেই। অনেক দিন আগে রবিন্স বার্লিং নামের একজন আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী ‘স্ট্রং উইমেন অফ মধুপুর’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। মান্দি নারীদের জীবনযাপন অনেক বলিষ্ঠ। এই বলিষ্ঠতা আমার ভালো লাগে।

আচ্চু জনিক নেই, কয়ন মৃ আছেন জ্ঞানকাণ্ড হয়ে। প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে। একবার মধুপুরের বনে একটা পূজার আয়োজন করা হয়েছিল। সেদিন কয়ন মৃ বন রক্ষার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিলেন, তা কোনো দিনই ভুলতে পারব না।
জঙ্গল বিনাশী উন্নয়ন-দর্শনের বিপরীতে জঙ্গলে বসবাসকারী মানুষের প্রতিবাদ জাতিসংঘের ঘোষণাপত্র যতই স্বীকৃতি দিক না কেন, মধুপুর উপজেলার পেগামারি গ্রামের কয়ন মৃর তা জানার কথা নয়। তিনি কথা বলেন তাঁর প্রাকৃত জ্ঞান দিয়ে। তাঁর আছে কাণ্ডজ্ঞান, যে জ্ঞান দিয়ে নিজের অধিকার বুঝতে পারেন এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার অপরিসীম সাহসও তাঁর সহজাত। তাই অবলীলায় বলতে পারেন, ‘আমা, আম্বির জমির জন্য আমরা জান দেব, তবু জমি দেব না।’
‘আমা’ শব্দের অর্থ মা। ‘আম্বি’ দাদি ও নানি দুই অর্থেই ব্যবহৃত হয়। কয়ন মৃর এ বাক্যে আম্বি শুধু নানি অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে। নানির জমি মা পান। মান্দি সমাজে মায়ের পরিচয়ে সন্তান পরিচিত হয়। কয়ন তাঁর মৃ পদবি পেয়েছেন মায়ের কাছ থেকে। মায়ের সম্পত্তিও পেয়েছেন তিনি। সন্তান মায়ের পদবী ব্যবহার করলে সুবিধা হলো, বংশগতির হিসাবটা মোটামুটি পরিষ্কারভাবে বোঝা যায়। খুব সহজেই চেনা যায় কে কোন মাহারির। আচিক ভাষার ‘মাহারি’ শব্দটির বাংলা অর্থ গোত্র। সন্তান যেহেতু মায়ের শরীর থেকে বের হয়, সে মায়ের পদবি নিলে আর বংশগতির হিসাব সহজে গুলিয়ে যাবে না। কারণ বিপরীত মাহারি ছাড়া বিয়ে করার নিয়ম নেই। দুটি প্রধান গোত্র বা মাহারি আছে মান্দি সমাজে। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, সন্তানের প্রথম পরিচয় মায়ের পরিচয়ে হওয়াই ভালো।

যে সমাজের নারীরা নিত্য আড্ডায় অংশ নেয়, পরিবারের প্রধান হয় সেখানেও নারী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয় কিন্তু। নারীরা কখনো খামাল বা পুরোহিত হতে পারে না। গ্রামপ্রধান বা নকমাও হতে পারে না। তবুও সেখানে নারী পরিবারপ্রধান তো বটে। সে সমাজেও নারী কখনো কখনো স্বামীর হাতে মার খায়। কখনো আবার তরুণী মেয়েরা সমাজের প্রবল প্রতাপে ঘর, পরিবার, সমাজ, সম্পত্তির অধিকার ছেড়ে পালিয়ে আসে নাগরিক ভিড়ে। কখনো জীবিকার তাগিদে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে তারা।
শহরের বিউটি পারলারগুলোতে মান্দি মেয়েদের একাধিপত্য রয়েছে। এর প্রথম কারণ হলো, মান্দি মেয়েরা বুঝে নেয় পরিবার প্রতিপালনের দায়িত্ব তারই। বন যদি না থাকে, খাবার সংগ্রহ হবে কেমন করে? পড়াশোনা তো সচরাচর অষ্টম শ্রেণি থেকে উচ্চমাধ্যমিকের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। তখন বাকি থাকে মান্দি জীবনের গভীর জ্ঞান, মনোযোগ আর পরিশ্রমের হাত দুটো। আর থাকে পরিবার পালনের দায়িত্ববোধ এবং আত্মবিশ্বাসী নারীহৃদয়। যে আত্মবিশ্বাস অধিকাংশ বাঙালি মেয়েদের ছোটবেলাতেই ভেঙে দেওয়া হয়। মগ্ন হাতগুলো খুব ভালোভাবে জানে, কোন মাত্রার প্রেষণ তার গ্রাহককে নিবিড় প্রশান্তি দেয়। বাংলাদেশে ম্যাসাজের জগতে মান্দি হাতের চেয়ে ভালো কিছু বোধ হয় নেই। মঙ্গোলীয় এই হাত ধ্যানের গভীরতা নিয়ে মানব শরীর স্পর্শ করে।
খাসি সমাজেও মান্দিদের মতো পুরুষেরা বিয়ে করে মেয়ের ঘরে আসে। তবে সেখানে গৃহিণীর মামা আর ভাইয়েরা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে ভূমিকা রাখে। খাসি নারীরা কিন্তু শহরে কাজ করতে এসেছে কেবল অফিসে। সংখ্যায় তারা বেশি নয়। তাঁদের পড়াশোনা প্রীতি, আভিজাত্য এবং সচ্ছলতা কিছুটা বেশি ছিল এত দিন। কিন্তু পান চাষ ক্ষুদ্রঋণের হাতে বন্দী হয়েছে। চা-বাগানমালিকেরাও এখন পানপুঞ্জির জমি দখলে নেমেছেন। নুডলি লামিনরা তাই নীরব দারিদ্র্যে ভেতরে-ভেতরে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। অগ্রসর চাকমা, ত্রিপুরা, লুসাই সমাজের নারীরা অনেকেই পৌঁছেছে বহুদূরে। তবু ম্রো নারীর কান ঝুলে আছে দুশ্চিন্তা আর ভারী মাকড়িতে। ম্রো সমাজে অল্প বয়সী ছেলেকে যুবতী নারীর সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয় ঘরের কাজ সামলানোর জন্য। কয়েকদিন আগে লাংকম পাড়া, জয় চন্দ্র পাড়া, রেং য়েন ম্রো পাড়ায় রাবার কোম্পানি পাড়াবাসীকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করল। উচ্ছেদকারীরাই আবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দলে যুক্ত হয়ে ত্রাণ দিতে গিয়েছিল। তখন তাদেরকে কেউ চিনতে না পারলেও চিনে ফেলে লাংকম ম্রো পাড়ার সংলেম ম্রো। তাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে সংলেম বলতে থাকেন, ‘এই মোহসিনরাই আমাদের জুম বাগানে আগুন দিয়েছে। যারা আমাদের জুমের জায়গায়, প্রাকৃতিক বনে, ফলদ বাগানে আগুন দিয়েছে, যারা আমাদেরকে বাপ-দাদা ভিটে মাটি থেকে উচ্ছেদ করে ভূমি কেড়ে নিতে চায়, তাদের কাছ থেকে কোন ত্রাণ নেব না।’ এই ম্রো নারীর পর্যবেক্ষণের অভিনিবেশ, তার প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্ত নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মেনে নিয়েছে। তাকে উপেক্ষা করেনি। লোভে পড়েনি কেউ।
বাংলাদেশে অবস্থানকারী কড়া জাতির লোক আছে শ’খানেক। সোনিয়া কড়া তার যোগ্যতাবলে সে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সাঁওতাল সমাজ পুরুষপ্রধান হলেও একজন বাসন্তী মুর্মু তার সংসারে এবং সমাজে সমান গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়ে।
কিন্তু তবুও মোটের ওপর দারিদ্রের চাপ যখন আসে, তা নারীকেই সবচেয়ে বেশি পিষ্ট করে। অভাবের দিনে কত নারীই তো বনের লতা কুড়ায় সে তো সন্তানদেরকে অভুক্ত দেখতে পারে না। আদিবাসী চাষাবাদে সবখানেই নারীর ভূমিকা রয়েছে। বরং যেকোনো সমাজ যত বেশি সুশীল হয়ে ওঠে, সেই সমাজের নারীরা তত বেশি পরাধীন হতে থাকে। অনেকে মনে করে, পাহাড়ের আদিবাসী পুরুষরা তো সহজেই নেংটি ছেড়েছে, তবে নারীকে কেন ঐতিহ্যবাহী পোশাক ধরে রাখতে হবে। সব সমাজেই ধরে রাখার দায় যেন নারীরই বেশি। আদিবাসী নারীদের বিষয়ে ক্ষমতাধর স্থানীয় পুরুষদের আগ্রহ বেশি থাকে। তাই তারা নিয়মিতই শারীরিক নিপীড়নের শিকার হয়। অন্যদিকে, নিজ সমাজের বাইরের কারোর প্রেমে জড়ালে সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে পড়ে তারা। সব সমাজেই পুরুষ নিজেকে রাখে মুক্ত, আর নারীকে দেখতে চায় শেকড় ছড়ানো শেকলপরা রূপে। নারীর শরীর, তার মমতা, তার আগলে রাখার গুণ তার শক্তি না হয়ে শেকল হয়ে দাঁড়ায়। দারিদ্র এবং সমাজে আদার হওয়ার বিড়ম্বনার সঙ্গে রয়েছে নারী হবার বিড়ম্বনা। তাই অল্প কিছু আদিবাসী নারীকে যেমন শক্তি নিয়ে বেরিয়ে পড়তে দেখি, বেশিরভাগকে দেখি সংসার এবং সমাজের দায় বহন করতে। সবমিলিয়ে তাদেরকে দেখি ক্ষমতা এবং সুবিধা থেকে বহু বহু দূরে কোথাও!
ফারহা তানজীম তিতিল,সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।


