অন্যান্য

ঢাকায় পাহাড়ি খাবারের স্বাদে মেজাঙ রেস্টুরেন্ট

শ্যাম সাগর মানকিন: বাংলাদেশ জাতি বৈচিত্রের দেশ। পার্বত্য অঞ্চল ও সমতল মিলিয়ে অনেকগুলো জাতিসত্তার বসবাস। বাঙালিদের পাশাপাশি বসবাসরত এ সব বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠির রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন রীতিনীতি, ভিন্ন আচারাদি, ভিন্ন খাদ্যাভ্যাস ও ভিন্ন সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য। আদিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বাঙালিদের কিছুটা নেতিবাচক ধারণা রয়েছে বাংলাদেশে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পালটে যাচ্ছে এমন ধারণা । বর্তমান সময়ে খোদ ঢাকা শহরের বুকে রয়েছে আদিবাসী খাবারের রেস্টুরেন্ট। সেখানে আদিবাসীদের পাশাপাশি ভীড় করছে শহুরে বাঙালি লোকজন। এমন এক আদিবাসী পাহাড়ি খাবারে স্বাদে “মেজাঙ রেস্টুরেন্ট” অন্যতম হয়ে উঠেছে রাজধানীর বুকে।

মেজাঙ রেস্টুরেন্ট ঢাকার মিরপুরে পূর্ব কাজীপাড়া এলাকায় অবস্থিত। একদম কাজীপাড়া ওভারব্রীজের কাছে রাস্তার ধারেই ৫৭১ নম্বর বিল্ডিং এর দু’তলায় এ রেস্টুরেন্টটি। খুব বেশি বড় নয় রেস্টুরেন্টটি, তবে ভেতরের খুব গুছানো ও পরিপাটি পরিবেশ । ভেতরের ইন্টেরিয়রে কাঠের কাজ অন্যরকম ভালো লাগা তৈরি করে। দেয়াল সাজানো হয়েছে আদিবাসী জীবন-যাপনের পেইন্টিংস, আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী নানান জিনিসপত্র দিয়ে। ভেতরে ঢুকার সাথে সাথে ভিন্নতর আমেজ পাওয়া যায়। এককথায় বলা যায় ছোটখাটো ছিমছাম নিবিড় শান্ত এক খাবারের রেস্টুরেন্ট হল মেজাঙ।

পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীরা অনেক আগে থেকেই শহরমুখী হয়েছেন। ঢাকার মিরপুরেও পার্বত্য অঞ্চলের অনেক আদিবাসীরা বসবাস করেন। সেখানে আদিবাসী স্কুল-কলেজ ও প্যাগোডা রয়েছে। এসব ঘিরেই মূলত সেখানে পার্বত্য অনেক আদিবাসী তাদের বাসা নিয়েছেন। কিন্তু সেখানে আদিবাসীদের জন্য খাবারের আলাদা কোন রেস্টুরেন্ট ছিলোনা। মিরপুর ও ঢাকাস্থ পাহাড়ি আদিবাসীর যাতে একসাথে এক জায়গায় তাদের ঐতিহ্যবাহী রান্না খেতে পারে সেই চিন্তা থেকেই পাঁচ বন্ধু টিটো চাকমা, উজ্জ্বল ত্রিপুরা, ত্রিদিব চাকমা, সুজন তালুকদার ও ঊষাতন তালুকদার মিলে পাহাড়ি আদিবাসীদের জন্য খাবারের রেস্টুরেন্ট খোলার কথা চিন্তা করেন। এরই ফল হিসেবে ২০১৭ সালে মেজাঙ রেস্টুরেন্ট তার পথচলা শুরু করে। টিটো চাকমা পেশায় একজন ইন্টেরিয়র ডিজাইনার। তিনিই মূলত রেস্টুরেন্টের দায়িত্বে থাকেন।

মেজাঙ রেস্টুরেন্টে পাওয়া যায় পার্বত্য অঞ্চলের আদিবাসীদের খাবারের স্বাদ। সেখানকার প্রত্যেকটা খাবারের উপাদান আসে পার্বত্য অঞ্চল রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবনের বিভিন্ন জায়গা হতে। বিশেষত পার্বত্য তিন জেলায় বসবাসরত বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন পদের খাবার পাওয়া যায় সেখানে। পার্বত্য তিন জেলায় যে ১১ জাতিগোষ্ঠীর বসবাস করে তাদের মধ্যে খাদ্যাভ্যাসে অনেকটাই মিল রয়েছে। একটা সাধারণ মিল যদি বলি, তাহলে বলা যায় এই অঞ্চলের আদিবাসীরা খাবারে অনেকটাই ঝাল ব্যবহার করে থাকেন।

মেজাঙ রেস্টুরেন্টে দুপুর ও রাতের খাবারে ব্যবস্থা রয়েছে। দুপুর ও রাতের খাবারের তালিকায় রয়েছে সাদা ভাত, কালিজিরা-চিনিগুড়া চালের ভাত, ফ্রাইড রাইস ও চিকেন ফ্রাইড রাইস সহ পাহাড়ি বিভিন্ন সবজির রান্না। পাহাড়ি আদিবাসীদের বিশেষ ঐতিহ্যবাহী খাবার পাঁচমিশালী সবজির রান্না পাজন রয়েছে খাবারের তালিকায়। এছাড়া সবজির মধ্যে পাহাড়ের আদিবাসীদের খাবারে বাঁশ কোঁড়ল অন্যতম যা বাচ্ছুরি হিসেবে পরিচিত। মেজাঙ রেস্টুরেন্টে বাচ্ছুরির কয়েক পদ তরকারি পাওয়া যায়। রয়েছে শাক ও মরিচ ভর্তার সুস্বাদু পদ। তাছাড়া হলুদ ফুল ভর্তা, চালতা ভর্তা, কলার মোচা, বেগুন, আলুর ভর্তাসহ মাশরুমের তরকারি মেজাঙে পাওয়া যায়।

মাছের তরকারির মধ্যে চিংড়ি মাছ কারী, কেচকি মাছের কারী, ফ্রাই, ভর্তা, চাপিলা ফ্রাই ও কারী, রুই কারী, পাবদা মাছ ফ্রাই পাওয়া যায়। মাংসের পদের মধ্যে রয়েছে, দেশি মুরগির তরকারি, চিকেন রোস্ট, হাঁস ও খাসি মাংসের রান্না। পাহাড়ের আদিবাসীদের রান্নায় শুটকি অন্যতম । মেজাঙে লইট্যা শুটকি, শুরি শুটকি ও চিংড়ির শুটকির ফ্রাই, ভর্তা ও তরকারি পাওয়া যায়। এছাড়া কাকড়ার ভূনা, ভর্তাসহ হুরো ভর্তা(মুরগি) ও গুদেয়্যা সেখানে পাওয়া যায়। সব পদের রান্না হয় আদিবাসীদের নিজস্ব ধরনে। সে কারনে পরিচিত পদের খাবারে নতুন স্বাদ পাওয়া যায়।
মেজাঙ রেস্টুরেন্টে দুপুর ও রাতের খাবার ছাড়াও রয়েছে বিকেলের নাস্তার আয়োজন। বিকেলের নাস্তার তালিকায় রয়েছে চিকেন ও ভেজিটেবলের নুডলস, থাই ও কর্ণ স্যুপ, মাশরুম স্যুপ। রয়েছে চিকেন ফ্রাইসহ ফুচকা ও চটপটির আয়োজন।

খাবারের মান নিঃসন্দেহে ভালো। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশন ও আপ্যায়ন বিশেষ উল্লেখযোগ্য। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে খাবারের দাম কখনো কখনো অনেকের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। সেদিক থেকে মেজাঙ রেস্টুরেন্টে খাবারের দাম খুব বেশি নয়। শহরের আদিবাসী চাকরিজীবিদের কথা মাথায় রেখে খাবারের দাম রাখা হয়েছে একদম নাগালের মধ্যে। আদিবাসী খাবারে রেস্টুরেন্ট হলেও যারা ভোজন রসিক, নিতে চান খাবারের ভিন্ন স্বাদ তারাও মেজাঙ রেস্টুরেন্টে আসেন। ফলে মেজাঙ রেস্টুরেন্ট কেবল আদিবাসী নয় বরং শহুরে মানুষের ভিন্ন স্বাদের খাবারের শখ পুরণের অন্যতম রেস্টুরেন্টে পরিণত হচ্ছে দিনকে দিন।

মেজাঙ একটি চাকমা ভাষার শব্দ । এটি চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী ছোট ডাইনিং টেবিলকে বোঝায়। যারা শহরে বসে নিতে চান পাহাড়ি আদিবাসী খাবারের স্বাদ তাদের জন্য মেজাঙ সেই ছোট ডাইনিং টেবিল যেখানে আপনার সাধ আর সাধ্যের সাথে সমন্বয় করে রয়েছে নতুন কিছুর অভিজ্ঞতা নেয়ার সুযোগ। বন্ধু কিংবা পরিবার নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন মেজাঙ রেস্টুরেন্ট।

Back to top button