জাতীয়

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পিসিপির নবীনবরণ ও বিদায় সংবর্ধনা-২০১৭ অনুষ্ঠিত

নিজস্ব সংবাদদাতাঃ গত ১৩ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে “জাতীয় মুক্তির সংগ্রামে আত্মকেন্দ্রীকতা নয়, আত্মত্যাগই হোক ছাত্র সমাজের দৃপ্ত অঙ্গীকার”- এ শ্লোগানকে সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার উদ্যোগে “নবীনবরণ ও প্রবীন বিদায়-২০১৭” চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়েছে। পিসিপি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক মনস্বী চাকমার সঞ্চালনায় ও সহ-সভাপতি রামভাই পাংখোয়ার সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ২৯৯ পার্বত্য রাংগামাটি আসনের সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি জুয়েল চাকমা, পালিবিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. জিনবোধি ভিক্ষু, আধুনিক ভাষা ও ভাষাবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক জেসী ডেইজি মারাক, ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আনন্দ বিকাশ চাকমা, প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ সাইদুল ইসলাম এবং প্রাণরসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক ড. কাঞ্চন চাকমা প্রমুখ।

আলোচনা সভার শুরুতে ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের কর্তৃক প্রকাশিত “স্মৃতিতে ২০১২-১৩” স্মরণিকার মোড়ক উন্মোচন করা হয়। এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে নবীনদের ফুল দিয়ে বরণ করেন ড. মোঃ সাইদুল ইসলাম এবং ফুল দিয়ে বিদায়ীদের সংবর্ধনা জানান উষাতন তালুকদার। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে উষাতন তালুকদার উপস্থিত ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে করে বলেন, মানব জীবন খুব অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হয়। এ বিশ্ববিদ্যালয় তথা ছাত্র জীবনটাও ছোট্ট জীবনের অংশ। এ ছাত্রজীবনে যে সময়টা সৎ ব্যবহার করবে, সে জীবনে ভালো কিছু করতে পারবে। ছাত্রজীবন শেষ হয়ে গেলেও বাস্তবতার নিরিখে তোমাদের পদক্ষেপ নিতে হবে। তিনি বর্তমান বিশ্বের চলমান পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গীবাদ ও অগণতান্ত্রিক শক্তি মাথা সাড়া দিয়ে উঠেছে। যেটা পার্বত্য চট্টগ্রামের বেলায় বেশি প্রযোজ্য। গত ১৩ অক্টোবরে রাংগামাটিতে অনুষ্ঠিত হয়ে যাওয়া হিল উইমেন্স ফেডারেশনের ৯ম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে সেনাবাহিনী ও পুলিশের বাধা দেওয়ার ঘটনার কথা উল্লেখ করে বলেন, একটা গণতান্ত্রিক দেশে মিটিং, মিছিল, সমাবেশ, সম্মেলন করার প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে। এখানে আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্ব করে দেওয়া হয়েছে। একটা স্বাধীন দেশে এমন অগণতান্ত্রিক আচরন কারোর জন্য সুফল বয়ে আনবে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ২০ বছরের মধ্যে চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলনে জনসংহতি সমিতি কখনো অসহযোগিতা ও সরকারের ক্ষতি হয় এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। কিন্তু সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে আন্তরিক নয় বলে দীর্ঘ ২০ বছরেও সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন করছে না। উল্টো চুক্তি বিরোধী নানা ষড়যন্ত্র যেমন ভূমি বেদখল থেকে শুরু করে সাম্প্রদায়িক হামলা, ধর্ষণ, হত্যা ইত্যাদি সরকারের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদে সংগঠিত হচ্ছে। বিভিন্ন দেশী-বিদেশী কোম্পানীর নামে লীজ দিয়ে, সেনা ক্যাম্প সম্প্রসারনের নামে, তথাকথিত উন্নয়নের নামে, বনায়নের নামে, পর্যটন শিল্প সম্প্রসারণের নামেভূমি বেদখল হচ্ছে বলে তিনি জানান।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি জুয়েল চাকমা বলেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান রচনার সময় এম এন লারমা শুধুমাত্র জুম্ম জনগণের কথা বলেননি, তিনি সমগ্র দেশের তথা সমগ্র পৃথিবীর নির্যাতিত, নিপীড়িত, নিষ্পেষিত ও খেটে খাওয়া মানুষদের কথা বলেছেন দৃঢ় চিত্তে। নবীন শিক্ষার্থীদের তাঁর জীবনী থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। নবীন এবং প্রবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, আপনারা যে প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা অর্জন করতে এসেছেন সে শিক্ষা কিসের জন্য, কাদের জন্য তা আগে উপলব্ধি করতে হবে। শুধুমাত্র নিজের বা নিজের পরিবারের জন্য একটা চাকরি নাকি পার্বত্য চট্টগ্রামের সমগ্র নিপীড়িত-নিষ্পেষিত, অধিকারহারা জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য আপনাদের এই শিক্ষা তা মীমাংসা করা দরকার। আপনারা বাঘাইছড়ির সাজেক, জুরাছড়ির বগাখালী, বান্দরবানের রেমাক্রি, থানচির দুর্গম অঞ্চলে যান, ঘুরে দেখলে বুঝবেন জুম পাহাড়ের মানুষগুলো কিভাবে অর্থনৈতিক, শিক্ষার দিক দিয়ে পিছিয়ে আছে এবং বান্দরবানে বহিরাগতদের জন্য ৫০,০০০ একর জমি লীজ দিয়ে সেখানকার ভূমিপুত্র মারমা, ত্রিপুরা, ¤্রােদের উচ্ছেদ করে দেওয়ার যে ষড়যন্ত্র, পার্বত্য চট্টগ্রামে ১৫টি পর্যটন স্পটের জন্য বরাদ্দকৃত শত শত একর জমি অধিগ্রহণ করার ষড়যন্ত্রের ফলে যেখানে হাজার বছর ধরে বসবাসকরা ভূমিপুত্ররা উচ্ছেদের হুমকিতে তা অনুধাবন করতে হবে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী ৫০০টির অধিক অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করার কথা থাকলেও গত ২০ বছরে মাত্র ৬৬টি ক্যাম্প তুলে নেওয়াহয়েছে। জনম দুঃখী জুম পাহাড়ের মানুষদের কান্না, আর্তনাদ, হাহাকার অন্তরের চোখ দিয়ে না দেখলে আপনারা দেখতে পাবেন না। সরকার ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি করে বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও দীর্ঘ ২০ বছর কালক্ষেপণ করেছে, বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং করেই চলেছে। তিনি ছাত্র-যুব সমাজকে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই সংগ্রামে ভোগ-বিলাস ও আত্মকেন্দ্রীকতা বাদ দিয়ে, আত্মত্যাগী হওয়ার আহবান জানান। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহ-সভাপতি রামভাই পাংখোয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বের সভা সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। এরপর বিকাল ৪:০০ ঘটিকার সময় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মুন চাকমা ও ধর্মরাজ তঞ্চঙ্গ্যার সঞ্চালনায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করা হয়।

Back to top button